মেইন ম্যেনু

তসলিমা, তোমার দুঃখগুলো ছুঁয়ে তোমাকে স্পর্শ করি!

13339489_475150016008209_5655283712646611910_nপ্রিয় তনা,

আজ তোমাকে যেভাবে ব্যাগ্র হয়ে লিখতে বসেছি সেভাবে উনিশ বছরের এই জীবনে যাদের প্রেমপত্র লিখেছি তাদেরকেও এতো ঘটা করে কিছু লিখিনি। সেই কবে থেকে তোমাকে জ্বালাচ্ছি। যখন বললাম- একটা রিকুয়েস্ট পাঠাও, তুমি সাথে সাথেই জানালে আমাকে রিকুয়েস্ট দেওয়া যায় না। এতো মন খারাপ হল যে সাথে সাথে দুই তিনশ রিকুয়েস্ট মুছে দিলাম। তুমি সেবারও পাঠাতে পারলে না। আমার আবারো মন খারাপ হল। কি আর করা! আজ পণ করে বসেছিলাম যেসব মানুষকে জম্মেও দেখিনি সকলকে বলে দেবো তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। সেটি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। শেষ অব্দি ১৯৯৮টি ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের ডাক ফিরিয়ে দিয়ে তোমাকে একটি মেসেজ পাঠিয়ে শুতে গেলাম। গিয়েও দেখি ঘুম আসেনা। খানিক এপাশ ওপাশ করে এসে দেখি তুমি এসেছ! তোমার বন্ধুত্বের আবেদনটি এতো ভালো লাগলো!

আজকে সকালটায় প্রবেশ করলাম তোমাকে দিয়ে। বাইরে পাখি ডাকছে, পুবে সূর্য উঠছে, আম-জামের গাছের পাতায় স্পর্শ করছে সোনালি রোদ! আজ আমার দিনটা বিশেষ, কারণ উনিশ বছরের স্মৃতিতে জমানো মেয়েবেলাটুকু পুঁজি করে ‘উনিশ বসন্ত’ নামের যে আত্মচরিতটি লিখেছি সেটির প্রকাশক আজ টাকা পাঠাবেন রয়ালিটির। প্রথম এডিশনের টাকা। বইটি কাকে উৎসর্গ করা জানোতো? অভিজিৎ রায় দাদা আর প্রবাসী লেখক ফরিদ আহমেদকে। ফরিদ আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় অভিজিৎ দাদার মুক্তমনা আর ‘বিশ্বাস ও বিজ্ঞান’ নামের বইটির মাধ্যমে।

এদেশে শুধু তুমি নও, অভি দা’ও একরকম নিষিদ্ধ। শাহবাগের আজিজ মার্কেট আর গুটিকয়েক দোকান ছাড়া কেউ তাঁর বই রাখেনা। পাছে দোকানদারের কল্লাটিও নেমে যায়! এদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান। কারণ রাজশাহী নামের মফঃস্বলটিতে বসেও আমি তোমার লেখা পড়েছি এবং পড়ছি। অভি দা’র আর তোমার নিষিদ্ধ বইগুলোর প্রতিটির পিডিএফ ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেছি। প্রতিটির হার্ড কপি আমার কাছে আছে। তোমার লেখা ‘ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে’ বইটা পড়ে আমি পদ্মা নদীকে অনুভব করি। জানি তুমি টেমসের জল, সেইনের পাড় ধরে ঘুরে বেড়িয়েছ, পাড়ি দিয়েছ সাগর। তবুও কি ভুলতে পেরেছ ব্রহ্মপুত্রের জল বা হাওয়া? জানি পারোনি।

অনেকগুলো ছেলেমানুষি এরমাঝে ঘটে গেছে। তোমার বোন ইয়াসমীনকে ফেসবুকে অ্যাড করা, হেলাল হাফিজের সঙ্গে সেধে দেখা করে আসা ইত্যাদি! অবশ্য হেলাল হাফিজের সঙ্গে দেখাটা প্রথমে কাকতালীয়ই ছিল। সমকাল সাহিত্য পুরস্কারের আসরে দেখা। বললাম- একদিন আসবো কিন্তু! তিনি বললেন- এলে খুব খুশি হবো।

এর পরের সপ্তাহেই গেলাম। মনে হল তোমার স্মৃতিগুলো তোমার হয়ে আমিই ঝালিয়ে নিচ্ছি। তিনি কিন্তু সেই প্রেমিক পুরুষটিই আছেন। একটুও বদলাননি! আমাকে কল করেন মাঝে মধ্যে, বলেন- তোকে খুব ভালোবাসি! ‘ভালোবাসি’ শুনতে কার না ভালো লাগে বলো? আমি আমার তারুণ্য দিয়ে সেটুকু আগলে ধরি। তিনি তোমায় নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছিলেন জানি। ‘আমায় নিয়ে কিছু একটা লিখে দেবে যা আর কাউকে দেবেনা’ আবদারটি করার পর তিনি কি লিখেছেন জানো? দাঁড়াও শোনাচ্ছি! লিখেছেন: প্রীতি, তোমার বুকের ওড়না আমার প্রেমের জায়নামাজ।

ভাবতে পারো? এই লাইন আমি লিখলে আমাকে এদেশের ৫৭ ধারায় পড়তে হবে নির্ঘাত শুধু জায়নামাজ শব্দটির অপরাধে! তিনি কি পুরুষ হয়ে নাকি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়ে বেঁচে গেলেন তা আজও জানিনা! আমিও টুকটাক লিখি। প্রকাশক আর পাঠকের উৎসাহে সদ্য একটা উপন্যাস লেখা শেষ করেছি। নাম- ‘প্রেমিক!’

হ্যাঁ, ঠিক এটিই! তুমি লিখেছ ‘ফরাসি প্রেমিক’, আমি লিখলাম শুধু ‘প্রেমিক!’। আমার জীবনটি ছোটো হলেও সম্ভবত ঘটনাবহুল। সেটুকু পুঁজি করে সমস্ত প্রতিভা ব্যয় করে লিখেছি। এমনকি একদিন স্বপ্নেও দেখেছি- বইমেলায় তুমি আর আমি হাত ধরে ঘুরছি। এতো জীবন্ত ছিল সেটা! সেইদিন কি আদৌ আসবে?

কবি দাউদ হায়দার আর তোমার কথা ভাবলে খুব কষ্ট লাগে জানো! দাউদ হায়দারের সঙ্গে যখন জার্মানিতে আশ্রয় নেয়া ব্লগার বন্ধুরা ছবি দেয়, তখন খুব ইচ্ছে হয় মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখি। একই ব্যাপার তোমার ক্ষেত্রেও!

এদেশে আমি শংকামুক্ত নই। যারা আমাকে বিদেশে আশ্রয় নেবার আবেদন করতে বলে, ভয় পায় ধর্মান্ধরা কখন এসে একটি কোপ বসিয়ে দেয়, আমি গোঁয়ারের মতন আবেদনটি করিনা। আমি চীনে জোঁকের মতন মাটি কামড়ে ধরে অপেক্ষা করি দেয়ালে পিঠ থেকে যাওয়ার দিনটির জন্য। ইতু চলে গেছে। একদিন হয়তো আমাকেও যেতে হবে। আমি জানি- দেশ মানে ভূখণ্ড না, একখানা ঝুলিয়ে রাখা মানচিত্র না। তবুও এই ভূখণ্ডটির জন্য আমার বুক বড্ড টনটন করে। এখনো এই ভূখণ্ডের লোকেরা ১৯৭১ এর বীরাঙ্গনাকে ডাকে ‘পাঞ্জাবীর বউ’ বলে! ১৯৭১ এ মসজিদে ধর্ষণ হয়েছিল- এমন খবর জানালে এখনো এদের ধর্মানুভূতি খসে খসে পড়ে আর তোপের মুখে পড়তে হয় আমাকে!

তুমি দেশে নেই। আর আমি দেশে থেকেও অনেকের সাথে নেই। যে ডাক্তারটির হাতে আমার জন্ম হয়েছে সেও আমার সাথে কথা বলেনা, আমার আপন মামা সে। এমনই ধর্মান্ধ যে- আমি নাস্তিক বলে তিনি আমার সাথে কথা বলেন না। আমার বড়ভাইকে উপদেশ দেন- আমাকে যেন কালেমা পড়িয়ে ইসলামের পথে আনা হয়! আমি রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ধর্মের দোহাইকে বড় হয়ে উঠতে দেখি।

আমার অবস্থা হয়েছে গোয়ালের গরুর মতন। অনেকে যে মুখ দিয়ে পুরস্কার পেলে, ভালো রেজাল্ট করলে, টিভি শো হলে, পত্রিকায় ভালো ভালো কথা লিখে আমাকে নিয়ে ফিচার হলে প্রশংসার তুবড়ি ছুটিয়ে দেয়, তেমনি- আমি নাস্তিক, আমি নারীবাদী, আমি বেপরোয়া, বেহিসেবি, বেসামাল…হ্যান, ত্যান ইত্যাদি বলে দুর্নাম করতেও ছাড়ে না। এই লোকগুলো না থাকলে আমার জানা হতোনা- বাঙালি যে কাজ সবচেয়ে ভালো পারে তা হচ্ছে অন্যের কূটনামী। এসব কূটকথা ভেসে ভেসে বাড়ির লোকের কানেও আসে। তারা তখন বলতে শুরু করে- এটা লিখলে কেন? ওটা লিখলে কেন? এটা করলে কেন? ওখানে গেলে কেন?

তুমি যেমন দেশ থেকে দূরে নির্বাসিত জীবন কাটাও, তেমনি আমি আমার নিজের দেশে, নিজের পরিবারে, নিজ সমাজে একটি বন্দী জীবন কাটাই। আমরা কোথাও কেউ ভালো নেই। ওড়না সরে গেলেও রাস্তায় আজও মন্তব্য শুনতে হয়, যেমনটা তুমি যখন এখানে ছিলে তেমনই। বাসের হেল্পার থেকে শুরু করে ভিড়ের সুযোগ নেয়া হাতগুলো এখনো নারী শরীরকে বিকৃতভাবে ছুঁয়ে সুখ নেয়। ‘আমার মেয়েবেলা’র তুমি, ‘শোধ’এর তুমি, ‘নিমন্ত্রণ’এর তুমি…কোনো ‘তুমি’ থেকেই তাই দূরে থাকা হয়না। দুঃখগুলো ছুঁয়ে কেবল তোমাকে ছোঁয়া হয়। সেও এক প্রাপ্তি আমার জন্য। তুমি লিখেছিলে না? তুমি কেমন আছ প্রিয় দেশ? আমি বলছি- তোমার দেশটি ভালো নেই, আমরা ভালো নেই, আমি ভালো নেই! আমরা নির্বাসিত প্রতিদিন, প্রতিটিক্ষণ সত্য বলার অপরাধে, নারী হবার অপরাধে, মানুষ হতে চাইবার অপরাধে।

সূর্যটা বাইরে আলো ছড়িয়ে দিয়ে এসেছে জানালার ফাঁক গলে, তুমিও আজ সকালের এই সূর্যটার মতন। তোমাকে দেখি, তবু স্পর্শটুকু জমে থাকে! একদিন হয়তো ছোঁয়া হবে তোমার হাত, চুমু দেয়া হবে কপালে। একদিন হয়তো সেইদেশে দেখা হবে তোমার আমার, যেদেশে মানুষ মুখ্য, যেদেশে নারীরা স্বাধীন!

তোমার প্রীতি