মেইন ম্যেনু

তাইওয়ান-চায়নাঃ দূরত আর কতটুকু বাকি?

১৯৪৯ সালে চায়নার গৃহ যুদ্ধের মাধ্যমে তাইওয়ান এবং চায়নার মধ্যে যে তিক্ত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, গত শনিবার সিঙ্গাপরে এই দুই দেশের প্রেসিডেন্টেদের হাত মেলানোর মাধ্যমে কি সেই দূরত্ব একটুও কমেছে ?

চায়না তাইওয়ান আড়াআড়ি বৈঠক নিয়ে তো কম বাদানুবাদ হয়নি। বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া মাত্র দুই দেশে প্রতিবাদ সভা হয়েছে, মিটিং মিছিল হয়েছে। পক্ষে বিপক্ষে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। দুই দেশের মধ্যে অসমাপ্ত উত্তেজনা এবং অনুভূতি এতই বেশি যে এত দ্রুত সেটা সমাধা হওয়ার কোন সুযোগ নেই, তবে এই বহুকাঙ্খিত বৈঠক যে এই জটিল সমস্যা সমাধানে একটি সঠিক পদক্ষেপ সেটা বলা যেতে পারে।

কমিউনিস্ট পার্টি চায়নার ক্ষমতায় যাওয়ার পর চেং কাই-শেক এর ন্যাশনালিস্ট পার্টি চলে যায় তাইওয়ানে, সেখানে কায়েম করে গণতন্ত্র যদিও টাইটেল থেকে যায় ‘রিপাবলিক অফ চায়না’। তারপর থেকে এই দুই দেশের মধ্যের ইতিহাস শুধু হানাহানি আর রক্তপাতের। কেউ দাবী ছাড়তে নারাজ। এতে পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস আর ভয় এমনভাবে দানা বেঁধেছে যে উভয়ই কোন নতুন পদক্ষেপ নেয়ার আগে হাজারবার চিন্তা করে। কি করতে গিয়ে কি হয়ে যায় সেটা বলা দুষ্কর। হয়তো যেটুকু গণ্ডগোল লেগে আছে তার থেকে আরও বড় কোন গণ্ডগোল লেগে যাবে!

কাজেই চায়না তাইওয়ান উভয়পক্ষই অতিরিক্ত সাবধানী। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বৈঠক থেকে। চাইনিজ প্রেসিডেন্ট শিং জিনপিং এবং তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট মা উইং-জাও সাক্ষাত করেছেন তৃতীয় আরেকটি দেশ সিঙ্গাপুরে। শুধু তাই না, তার এমনকি পরস্পরকে প্রেসিডেন্ট
বলেও সম্বোধন করেননি। শুধু নামের আগে ‘মিঃ’ লাগিয়ে কাজ সেরেছেন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, বৈঠকের আগে গত বৃহস্পতিবার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট মা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, সিঙ্গাপুরে দুই দল তাদের হোটেলের বিল এবং খাওয়ার খরচও সমান ভাগে ভাগ করে দিবে।

নিঃসন্দেহে বৈঠকের পূর্ববর্তী অবস্থার কারনে হিসাবে এমন সামঞ্জস্য করা হয়েছে, যাতে কেউ না ভাবে যে সে ঠকে গেল! এই বৈঠকের পেছনে রয়েছে দুই দেশের রক্তাক্ত তিক্ত ইতিহাস এবং ভাগ হয়ে পড়া অসংখ্য মানুষের পারিবারিক এবং মানসিক অসন্তুস্তির চাপ। সবার একটাই প্রশ্ন-এই বৈঠক কি কোন ভাল ফল বয়ে আনবে?

সাধারণ মানুষের আলোচনা থেকে এ প্রশ্নের কোন সন্তুষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি। তাদের প্রতিক্রিয়াকে মিশ্র বলা যেতে পারে। কেউই আসলে নিশ্চিত করে বুঝতে পারছে না ঘটনা আসলে কোন দিকে যাবে। অনেকেই খুবই আশাবাদী। তারা মনে করেন এটা একটা নতুন অধ্যায়। এর
থেকে পুরনো ব্যাথা আর মানুষের কষ্টের অবসান হবে। শান্তি ফিরে আসবে। অনেকেই আবার এতটা আশাবাদী না। তাদের কথা হচ্ছে এত বন্ধুত্তের দরকার নেই শুধু শত্রুতা যেন একটু কমে। অর্থাৎ দুই দেশের যে আড়াআড়ি সম্পর্ক তাতে যেন একটা উইন-উইন অবস্থা থাকে। দুই
প্রেসিডেন্টকেই এই বৈঠকের কারনে তীব্র সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। বিরোধের মুখে এমনটাও মনে হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত হয়তো এই যুগান্তরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে না।

চায়নার দৃষ্টিতে তাইওয়ান হচ্ছে তাদের একটা বিশ্বাসঘাতক প্রদেশ কিন্তু চায়নার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাইওয়ানের জন্য অত্যন্ত অপমানকর। চায়না ইতিমধ্যে সতর্কতাজারি করে বলেছে, তাইওয়ান যদি আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় তাহলে সামরিক মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়বে।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, তাইওয়ানের দিকে মিসাইল তাক করে রাখা আছে। এই বিষয়ে বৈঠক চলা কালে তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট মা চীনা প্রেসিডেন্টকে তার এই উদ্বেগের কথা জানান। শিং অবশ্য মা’কে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে তাইওয়ানের দিকে কোন মিসাইল তাক করা নেই।

চীনা প্রেসিডেন্ট শিং শনিবারে যথারীতি আড়ম্বর দেখিয়ে বুঝিয়েছেন যে তাইওয়ান হচ্ছে চায়নার প্রদেশ। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট মা’কে বলেছেন যে, আমাদের মধ্যকার এই আড়াআড়ি সম্পর্কটা ঠিক দুই পৃথক দেশের মধ্যকার সম্পর্ক না। দুই দেশের মধ্যকার সীমানার অনেক অংশই এখনো চায়নার অন্তর্ভুক্ত এবং এটার কোন নড়চড় হবে না। যদিও তাইওয়ানের অনেকেই এই কথায় সায় দেবেনা।

প্রেসিডেন্ট মা সাংবাদিকদের খুব পেঁচিয়ে বলেছেন, আমার চায়নার ‘এক চায়না’ নীতির সাথে মত দিয়েছি কিন্তু আমরাও এই সংজ্ঞার সাথে ভিন্নমত পোষণ করে যাবো।

শত পার্থক্য এবং ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও উভয়পক্ষই পরস্পরের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়েছে গত সাত বছরে। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া এই আড়াআড়ি সম্পর্কের কারনে উভয়ই শান্তি এবং স্থিতিশীলতার প্রমাণ রেখেছে। এ বৈঠক থেকে নতুন কোন ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় নি।

দুই দেশের মাঝে দীর্ঘ ফাটল থাকা সত্ত্বেও ব্যাবসায়িক আদান প্রদানে চায়না হচ্ছে তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। প্রতি সপ্তাহে শত শত বিমান চলাচল করে দুই দেশের মাঝে, লেনদেন হয় টাঁকা পয়সার। কাজেই তারা যদি পরস্পরকে পুরোপুরি মেনে নিতে নাও পারে তবু যেন যে যার যারটা নিয়ে পাশাপাশি সহবস্থান করতে পারে এটাই সম্ভবত সবার আকাঙ্ক্ষা ছিল এবারের বৈঠক থেকে। সুদূরে চায়না তাইওয়ানের দূরত্ব কি আরও বেড়ে যাবে নাকি দুটো আবার একত্রিত হয়ে যাবে সেটার সম্বন্ধে এই বৈঠকে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি ঠিকই তবে কেউ যে কাউকে ছেঁড়ে কথা বলবে না সেটা পরিস্কার বোঝা যায়।