মেইন ম্যেনু

তারেকের উপেক্ষায় মবিনের অভিমান!

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। কী কারণে হঠাৎ করে দল থেকে পদত্যাগ করলেন তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। তার পদত্যাগে নেতাকর্মীমের মধ্যেও কিছুটা হতাশা বিরাজ করছে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন থেকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়াম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলে আসছে শমসের মবিন চৌধুরীর। তবে ওই দ্বন্দ্ব অনেকটা গোপনে থাকলেও ২০১৪ সালে প্রকাশ্যে আসে।

২০১৪ সালের শেষের দিকে শমসের মবিন চৌধুরীর অজ্ঞাতে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যান চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী প্রেসসচিব মুশফিকুল ফজল আনসারি ও সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল মালিকের ছেলে শিল্পপতি খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তারা দেখা করে আসার পরই সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়।

ওই বছর ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সিলেট জেলাতে সভাপতি পদে সাঈদ আহমদকে ও সাধারণ সম্পাদক পদে রাহাত চৌধুরী মুন্নাকে নির্বাচিত করা হয়। আর মহানগরের সভাপতি পদে নূরুল আলম সিদ্দিকী খালেদকে ও সাধারণ সম্পাদক পদে আবু সালেহ মো. লোকমান আহমদের নাম ঘোষণা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। কিন্তু ওই কমিটিতে শমসের মবিন চৌধুরী বলয়ের কোনো নেতাকর্মী স্থান পাননি। পরবর্তীতে তিনি সিলেট ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। মূলত, তখন থেকেই রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন শমসের মবিন।

কিন্তু একই বছর নভেম্বর মাসে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া শমসের মবিনকে খুশি করতে গিয়ে ডা. শাহরিয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক ও বদরুজ্জামান সেলিমকে সদস্য সচিব করে সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেন। পরবর্তীতে ওই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে ইলিয়াছ (বর্তমানে নিখোঁজ) অনুসারীরা। ইলিয়াস অনুসারীরা এখনো শমসের মবিন বলয়কে এড়িয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়াও বিগত উপজেলা নির্বাচনে তারেক রহমানের ইশারায় সিলেটে ২০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থীদের অবহেলা, সিলেট-১ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ, গত ৫ জানুয়ারি সরকার বিরোধী আন্দোলনে তারেক শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কথা শুনতে অপারগতা প্রকাশ করাও শমসের মবিনের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হতে পারে মনে করছেন অনেকেই। তবে ওই সব বিষয় নিয়ে কথা বলায় তারেক বলয় শমসের মবিনকে আওয়ামী লীগের দালাল বানিয়ে দেশবাসীর কাছে উপস্থাপন করারও পাঁয়তারা করেছেন একাধিকবার।

সূত্র জানায়, বিগত উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণেও তারেক রহমান প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। বিগত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ জোট। কিন্তু এ নিয়ে তারেক রহমান দলের শীর্ষ নেতাদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ২০ দলীয় জোট উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ওই নির্বাচনে প্রার্থী যাচাই-বাচাই নিয়ে শুরু হয় নতুন বিরোধ। ওই সময় কেন্দ্রীয় নেতারা যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একাধিক প্রার্থীকে তারেক রহমান ছাটাই করেন। এমনটি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনের আগের দিনও তারেক রহমানের নিদের্শনায় দলীয় প্রার্থী পরিবর্তন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওই উপজেলায় বিএনপি পরাজিত হয়েছিল। গোলাপগঞ্জ উপজেলায় শমসের মবিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি হওয়াতে ওই এলাকার মানুষের কাছে তিনি লজ্জিত হয়েছিলেন। শুধু ওই এলাকায় নয়, সিলেট সদর উপজেলা, দক্ষিণ সুরমা উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় একই অবস্থা হয়েছিল বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

শুধু উপজেলা নির্বাচনই নয়, গত ৫ জানুয়ারি সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন কর্মকৌশল নিয়ে শমসের মবিন চৌধুরীসহ দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তারেক। ওই সময় দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে দেন। এমনকি সেই সময় বিদেশি লবিং ম্যানেজ করতে ব্যর্থতার কারণে শমসের মবিনকে ভর্ৎসনাও করেন তিনি। এরপর তারেক রহমান ও শমসের মবিন চৌধুরীর কথোপকোথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এতেও শমসের মবিনকে হেয় করা হয়েছিল।

এছাড়া ৫ জানুয়ারি সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় শমসের মবিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় খালেদা জিয়া ও দলীয় নেতকর্মীরা শমসের মবিন ও তার পরিবারের কোনো খোঁজখবর নেয়নি। এমনকি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও দলীয়ভাবে তাকে কোনো মূল্যায়ন কর হয়নি।

গত মাসে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সময় শমসের মবিনের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেননি খালেদা জিয়া। লন্ডনে গিয়ে সেখানকার কোনো নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না তিনি। ছেলের কথামত সেখানে থাকছেন। এমনটি দেশেও কোনো খোঁজখবর দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

দেশে যেভাবে হেয় হচ্ছেন শমসের ঠিক তেমনিভাবে বিদেশেই তাকে হেয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, অতীতে খালেদা জিয়া বিদেশ সফরে গেলে শমসের মবিন চৌধুরীকে সফর সঙ্গী বানাতেন। কিন্তু এবার যুক্তরাজ্য সফরে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এবার বিএনপি চেয়ারপারসন চিকিৎসার অজুহাতে যুক্তরাজ্য গেছেন। কিন্তু ওই সফরকে কেন্দ্র করে তার সাবেক সহকারী প্রেসসচিব মুশফিকুল ফজল আনসারি ও সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল মালিকের ছেলে শিল্পপতি খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আগে থেকেই লন্ডনে অবস্থান নেন। সেখানে গিয়ে তারা তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে শমসের মবিনের যুক্তরাজ্য সফর বাতিল করেন। তাই শমসের মবিন মনক্ষুণ্ণ হন। এতে লন্ডন বিএনপির রাজনীতি থেকে শমসের বলয়ের শক্তিও কমে যাবে বলে ধারণা করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

এমতাবস্থায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে নির্বাচন নিয়ে শমসের মবিনের প্রার্থিতা নিয়েও রয়ে গেল শঙ্কা। ওই আসনে তারেক রহমানের স্ত্রী সিলেটী মেয়ে জুবায়দা রহমান আসতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। ওইসব বিষয় মাথায় নিয়েই বুধবার রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন বিএনপির কূটনৈতিক টিমের অন্যতম সদস্য শমসের মবিন চৌধুরী। দলের চেয়ারপারসন বরাবর পদত্যাগপত্র লিখে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে দিয়েছেন তিনি। পদত্যাগপত্রে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়েছেন।

এদিকে, শমসের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় সিলেট বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে হতাশা। তারা বলেছেন, শমসের মবিন দলের একজন শীর্ষ নেতা। তিনি হঠাৎ করে পদত্যাগ করা উচিৎ হয়নি। অত্যন্ত পক্ষে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে পদত্যাগ করলে ভালো হতো বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে শমসের মবিনের পদত্যাগ নিয়ে কথা বলতে নারাজ সিলেট বিএনপির নেতারা।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল হাসান কয়েছ লোদী বলেন, ‘শমসের মবিন দেশের একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবীদ। তিনি রাজনীতি থেকে এভাবে সরে যাওয়াটা কোনভাবেই মঙ্গল নয়।’ তবে পুনরায় তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিএনপির ওই নেতা।’

সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল গাফ্ফার বলেন,‘ শমসের মবিন চৌধুরী হঠাৎ করে দল থেকে পদত্যাগ করায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।’

হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দলীয় নেতার্কমীদের সঙ্গে আলাপ করে পদত্যাগ করলে ভালো হতো।’

কেন পদত্যাগ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি পদত্যাগ করেনি, সেহেতু পদত্যাগের ব্যাপারে কিছু বলেতে পারব না আমি।’

তারেক-মবিনের সেই কথপোকথন :