মেইন ম্যেনু

দাঁতের মাড়ি সরে যাওয়ার কারণ ও তার প্রতিকার

দাঁতের মাড়ি দূরে সরে যাওয়া মাড়ির রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। দাঁতকে ঘিরে মাড়ির যে টিস্যু থাকে তা ক্রমশ দূরে সরে যায় ফলে দাঁতের অনেক বেশি অংশ দেখা যায়। এমনকি দাঁতের মূল বা গোড়া পর্যন্ত দেখা যায়। এর ফলে মাড়িতে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে পড়ে এবং টিস্যু বা কলার ক্ষতি করা শুরু করে। এতে ব্যথা ও তীব্র সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের বিডিএস প্রথম ব্যাচের শেষ বর্ষের ছাত্রী ফারহানা দিলশাদ সুকি এর সাথে কথা বলে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়।

দাঁতের মাড়ি দূরে সরে যাওয়া কারণ :

· মাড়ির অসুখ বিশেষ করে পেরিওডন্টাল ডিজিজ অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যা মাড়ির টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

· মুখের স্বাস্থ্যবিধি সঠিক ভাবে না মানা অর্থাৎ ঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ না করা, ফ্লস ব্যবহার না করা, দাঁতে প্লাক জমা ইত্যাদি। এই প্লাক দীর্ঘদিন যাবত জমতে জমতে পাথর সৃষ্টি হয়। এই পাথর শক্ত এবং এর কারণেও দাঁতের মাড়ি দূরে সরে যেতে পারে।

· খুব বেশি জোর দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যায় এবং মাড়িও অপসৃত হতে শুরু করে।

· বংশানুক্রমের কারণেও দাঁতের মাড়ি দূরে সরে যাওয়ার সমস্যাটি হতে পারে।

· হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও দাঁতের মাড়ি দূরে সরে যাওয়ার সমস্যাটি হয়, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে হয়। হরমোনের পরিবর্তনের ফলে মাড়ি অনেক বেশি সংবেদনশীল ও অরক্ষণীয় হয়ে পড়ে।

· যারা নিয়মিত ধূমপান করেন তাদের দাঁতে আঠালো প্লাক জমে যা মাড়ি দূরে সরে যাওয়ার সমস্যাটি উৎপন্ন করে।

· কিছু খাওয়ার সময় দাঁতে খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করলে মাড়ি দূরে সরে যেতে পারে এবং সাধারণত যাদের বাঁকা দাঁত তাদের এই সমস্যাটি হতে পারে যেহেতু কামড় দেয়ার সময় সব দাঁত একসাথে কাজ করতে পারেনা।

· ঠোঁট বা জিহবা দিয়ে চাপ প্রয়োগের ফলেও মাড়ি দূরে সরে যেতে পারে।

· অনেকেরই দাঁত দিয়ে নখ কাটার ও কলম বা পেন্সিল কামড়ানোর অভ্যাস থাকে। এই বদভ্যাসের কারণেও মাড়ি সরে যেতে পারে।

চিকিৎসা :

দাঁতের মাড়ি দূরে সরে যাওয়া সমস্যাটি দেখা দিলে দন্ত চিকিৎসক স্কেলিং ও রুট প্ল্যানিং এর মাধ্যমে দাঁত পরিষ্কার করবেন, দাঁতের প্লাক ও টারটার বাহির করবেন। যদি সমস্যাটি শনাক্ত করতে দেরি হয়ে যায় তাহলে দন্ত চিকিৎসক সার্জারির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ মাড়ি ঠিক করবেন। আপনি যদি সার্জারি পর্যন্ত যেতে না চান তাহলে ঘরোয়াভাবে ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে মাড়ির দূরে সরে যাওয়ার সমস্যাটি কমাতে পারেন। কিন্তু যদি মাড়ির মধ্যে সংক্রমণ হয়েই যায় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ব্যাকটেরিয়ার ব্যপ্তি ও ক্ষতির পরিমাণ জেনে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া মাড়ি ক্ষয় রোধে মুখের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করাই পর্যাপ্ত।

দাঁতের মাড়ি নরম কলা দিয়ে গঠিত যা দাঁতের হাড়কে সুরক্ষিত রাখে ও সঠিক স্থানে থাকার জন্য সহযোগিতা করে। দাঁতের সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ ও ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে মাড়ির টিস্যুর পুনরায় বৃদ্ধি সম্ভব। আসুন তাহলে সেই ঘরোয়া প্রতিকারগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

১। গ্রিন টি

অ্যান্টি অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ গ্রিন টি স্বাস্থ্যের জন্য স্পর্শমণি হিসেবে কাজ করে। অন্যান্য বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার মত দাঁতের মাড়ির সমস্যাটির প্রতিকারেও গ্রিন টি চমৎকার কাজ করে। গ্রিন টি মাড়ির প্রদাহ কমায় ও মুখের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। সকালের এক কাপ গ্রিন টি দাঁত ও মাড়ি শক্ত করে।

২। তিলের তেল

দাঁতে প্লাক জমতে বাঁধা প্রদান করে ও দাঁতের ছিদ্রের ভেতর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বাহির করে দেয় তিলের তেল। প্লাক ও বিষাক্ত উপাদান মাড়ির ক্ষয় সৃষ্টির জন্য দায়ী। এক কাপের চার ভাগের এক ভাগ পরিমাণ তিলের তেল মাউথ ওয়াশ হিসেবে ব্যবহার করুন। দাঁত ব্রাশ করার ৩০ সেকেন্ড পূর্বে তিলের তেল মুখে নিয়ে দাঁতে ভালো করে লাগান। দাঁত ক্ষয় ও মাড়ি ক্ষয় রোধে তিলের তেল কিছুটা গরম করে ব্যবহার করলে ভালো।

৩। অ্যালোভেরা

অ্যান্টি ইনফ্লামেটোরি ও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান থাকায় মাড়ির ক্ষতি ও সংক্রমণ নিরাময়ে সাহায্য করে অ্যালোভেরা। অ্যালোভেরার পাতা থেকে অ্যালোভেরা জেল নিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন। প্রতিদিন সকালে ও খাওয়ার পরে অ্যালোভেরা জেল মাউথ ওয়াশের মতোই ব্যবহার করতে পারেন এতে আপনার দাঁত ও মাড়ির ক্ষয় রোধ হবে এবং মাড়ির সরে যাওয়া বন্ধ হবে।

৪। লবঙ্গ

ক্ষয়প্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ দাঁত এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকারিতার দিক দিয়ে লবঙ্গ প্রশংসার দাবীদার। লবঙ্গের তেল প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক, ব্যাকটেরিয়া নাশক ও ছত্রাক নাশক এবং ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুর মেরামত ও নতুন কোষ সৃষ্টিতে সাহায্য করে। লবঙ্গের শক্তিশালী জীবাণু নাশক ক্ষমতা আছে, তাই ঘন ঘন লবঙ্গ ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা বন্ধ হয়। ভালো ফল পাওয়ার জন্য দাঁতে প্রতিদিন একটি লবঙ্গ বা লবঙ্গের তেল মালিশ করুন।

কিছু টিপস :

· খুব জোরে জোরে ব্রাশ করা ঠিক নয়।

· হালকা ভাবে চাপ দিয়ে ও বৃত্তাকারে দাঁত ব্রাশ করুন।

· কখনো মাড়ির দিকে চেপে দাঁত ব্রাশ করবেন না। মাড়ি বরাবর ব্রাশ করুন।

· অনেক বড় টুথ ব্রাশ ব্যবহার না করাই ভালো। ব্রাশের মাথাটা ছোট ও নরম ব্রিসল যুক্ত ব্রাশ ব্যবহার করা ভালো।

· ফ্লস দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে ভুলবেন না।

· প্রতিবার খাওয়ার পরে কুল কুচি করে নেয়া ভালো।

· পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলে মুখ পরিষ্কার থাকে ও বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বাহির হয়ে যায়।

· নারিকেল তেল, অলিভ অয়েল ও লেবুর রস এর মিশ্রণ, টি ট্রি অয়েল ও দাঁতের মাড়ির সমসায় কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

· পুষ্টিকর খাদ্য বিশেষ করে ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ দাঁতের রোগ নিরাময় ও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।