মেইন ম্যেনু

দাঁড়িয়াল ড্রাগন লিজার্ডের বিস্ময়কর লিঙ্গবদল

চেনা প্রাণিগুলোর প্রকৃতি বদলে বিস্ময়করভাবে বদলে যাচ্ছে, রীতিমতো চমকে ওঠার মতো ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণ পরিবেশে সচরাচর দেখা মেলে ছোট্ট দাড়িওয়ালা ড্রাগন টিকটিকির, ইংরেজিতে যাকে বেয়ার্ডেড ড্রাগন লিজার্ড বলে ডাকা হয়। অবিশ্বাস্যভাবে তাদের লিঙ্গ বদলে যাচ্ছে, পুরুষরা নারীগুণবিশিষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বাচ্চা প্রসব করছে রীতিমতো। গবেষণায় বেরিয়ে এলো, এটা ঘটছে উত্তাপের কারণে, ভূপ্রকৃতিতে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে। তাপমাত্রা এ প্রজাতির যৌনজীবনের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে, কিন্তু লিঙ্গ বদলে যাওয়ার মতো ঘটনা ওদের মধ্যে ইতোপূর্বে ঘটে থাকলেও এবারই প্রথম বিজ্ঞানীদের তা নজরে এলো।

বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ বেয়ার্ডেড ড্রাগন লিজার্ড নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষক ক্ল্যারে হোলেলি, সেখানে তিনি এ প্রাণিগুলোর ওপর পরিচালিত তার গবেষণার প্রামান্য দলিল উপস্থাপন করেছেন। যাতে দেখা যাচ্ছে ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ড্রাগন লিজার্ডের পুরুষ থেকে নারী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে এবং ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কারও কারও ক্ষেত্রে সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে লিঙ্গান্তর। এ বিষয় সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য পাঠককে জানানো প্রয়োজন, তার পূর্বে উল্লেখ করা যাক, কুইন্সল্যান্ড প্রদেশে থেকে সংগৃহীত ১৩১টি বন্য ড্রাগন লিজার্ডকে গবেষণাগারে নিয়ে নিরীক্ষা চালালে ১১টির ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটে। তার মানে, আরও বিস্তৃত পরিবেশে আরও বেশি সংখ্যক ড্রাগন লিজার্ডের সমাজে এ ঘটনা মোটেও দুর্লভ কিছু নয়।

এবার খানিকটা বিজ্ঞানব্যাখ্যায় যাওয়া যাক, কথাগুলো মোটেও কঠিন কিছু নয়, বিজ্ঞান বিষয়ক ন্যূনতম জ্ঞান থাকলেও দারুণভাবে বুঝতে পারা যাবে। মানুষসহ মেরুদণ্ডী স্তন্যপায়ী প্রাণিদের লিঙ্গ সেক্স ক্রোমোজোম দ্বারা নির্ধারিত হলেও, স্তন্যপায়ী নয় এমন কিছু মেরুদণ্ডী প্রাণির ক্ষেত্রে তা ঘটে না। যেমন, পাখি, মৌমাছি, দাড়িওয়ালা টিকটিকি, কুমির ও কচ্ছপের কিছু প্রজাতি। এসব প্রাণি নারী হবে কী পুরুষ হবে তা নির্ভর করে ডিমে কুসুমিত থাকা অবস্থায় পরিবেশের তাপমাত্রা কেমন থাকে, তার ওপর। এটুকু আপাতত জানা থাকুক। আরও কিছু কথা বলার ওপর দুটো বিষয় যোগ করতে হবে।

bearded-dragon-lizardঅনেকেরই জানা আছে, মানুষের সেক্স ক্রোমোজোম দুই প্রকার; X, Y। যাদের সেক্স-ক্রোমোজোম বিন্যাস হয় XX তারা নারী হয়ে জন্ম নেয়, আর যাদের বিন্যাস হয় XY, তারা জন্ম নেয় পুরুষ হিসেবে। অর্থাৎ এক Y ক্রোমোজোমের কারণে মানবশিশু প্রকৃতিগতভাবে নারী হওয়ার পথে মোড় ঘুরে গিয়ে পুরুষ হয়ে যায়। এবার আসা যাক পাখি বা বেয়ার্ডেড ড্রাগন লিজার্ডের মতো সরীসৃপের ক্ষেত্রে কী ঘটে তার কথায়। প্রসঙ্গেক্রমে বলে রাখা যায়, ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকে পুষ্টি নিয়ে তার বন্ধু টমাস হেনলি হাক্সলি কিন্তু প্রমাণ করে দিয়েছেন যে পাখি এসেছে সরীসৃপ থেকেই, এখনও তার শরীরে যার বহু প্রমাণ বিদ্যমান। তো ঐ ডিমপাড়া প্রাণিগুলো ক্ষেত্রেও সেক্স-ক্রোমোজোম দুই প্রকার; তবে তা X,Y নয়, বরং Z,W। তাদের শরীরে সেক্স-ক্রোমোজোমের বিন্যাস ZZ হলে তারা জন্মে পুরুষ হিসেবে, আর ZW বিন্যাস নিয়ে জন্মে নারী। অর্থাৎ এক W ক্রোমোজোমের কারণে প্রকৃতিগত পুরুষ মোড় ঘুরে হয়ে পড়ে নারী. মানুষের ক্ষেত্রে যা ঘটে তার উল্টো। আর এ বদলটা ঘটে তাপমাত্রাভেদে। তাপমাত্রা বেশি হলে, প্রতিকূল প্রকৃতিতে বেশি টিকে যাওয়ার সম্ভাবনাধারী নারীর জন্ম হয়।

এবার একটা সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। অস্ট্রেলিয়ায় পরিবেশ ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় উন্নীত হওয়া মাত্রই ড্রাগন লিজার্ডের শরীরে তাপমাত্রাকেন্দ্রিক আচরণকারী জিন সাড়া দিতে শুরু করলো। তবে সবার ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটলো না, যাদের শরীর তুলনামূলক ‘অনুকূল ছিল’ তাদের শরীরেই এটা ঘটলো। পুরুষরা নারী হয়ে গেল। পুরুষ মানুষের শরীরে যেমন নারী চিহ্ন বিদ্যমান, পুরুষ লিজার্ডের শরীরেও তাই। তাপমাত্রা জিনের আচরণ বদেল যাওয়ার সঙ্গে ঐ অঙ্গ-উপাঙ্গগুলোর গুণও বদলে যেতে শুরু করে যা পুরুষ লিজার্ডকে গর্ভধারণের ক্ষমতা পর্যন্ত প্রদান করতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে ‘পুরুষটি’ প্রকৃত নারী লিজার্ডের চেয়ে বেশি ডিম দিতে পারে। এ তথ্য যোগ করেছেন প্রফেসর ক্ল্যারে হোলেলির সহ-গবেষক অপর প্রফেরর আর্থার জর্জেস; যিনি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এ বিষয়ক নিবন্ধটির সহ-লেখকও বটে। যাহোক, প্রাকৃতিকভাবে লিঙ্গান্তরের এমন অভিনব ঘটনা মানুষের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে কিনা, এ প্রশ্নের জবাবে সম্ভাবনাটিকে আপাতত নাকচ করে দেন হোলেলি।