মেইন ম্যেনু

দিদিকে ঘিরে দড়ি টানাটানি দিল্লি দরবারে

বিপুল ভোটে জয়লাভের পর দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে এ বার অনেক দিন পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখোমুখি একান্ত বৈঠকে বসতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তাঁর দিল্লি আসার প্রত্যক্ষ লক্ষ্য আন্তঃরাজ্য পরিষদের বৈঠকে সশরীর উপস্থিত থাকা। এবং রাজ্যের স্বাধিকার নিয়ে জোরালো অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা ভারতীয় প্রোটোকল অনুসারে রাজনৈতিক সৌজন্য। ইতিমধ্যে জয়ললিতা সেটি
সেরে ফেলেছেন।

মমতার সঙ্গে এই একান্ত বৈঠকটিতে বিশেষ ভাবে আগ্রহী মোদী নিজেও। তিনি তথা বিজেপি নেতৃত্ব বুঝতে পারছেন, ২৮২টি আসন নিয়ে আসার পর দু’বছর অতিবাহিত। দু’বছরেই গোটা দেশে মানুষের মোহভঙ্গের প্রক্রিয়া জোরদার। উত্তরপ্রদেশের ভোটে এ বার ফলাফল ভাল না হওয়ার শঙ্কা আছে। এবং ফলাফল অখিলেশ অথবা মায়াবতী, যে দিকেই যাক না কেন, ক্রমশ মোদী-বিরোধী একটা সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ দানা বাঁধার সম্ভাবনা প্রবল। মমতার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যে ভাবে নীতীশ, লালু, কেজরীবাল, ফারুক আবদুল্লা প্রমুখ নেতারা হাজির হন, তাতে আগামী দিনে ওই সর্বভারতীয় মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন।

আবার নরেন্দ্র মোদী জানেন, আঞ্চলিক দলগুলির আসন সংখ্যায় যতই বৃদ্ধি হোক না কেন, কংগ্রেস ছাড়া কেন্দ্রে বিকল্প অসম্ভব। মমতার সঙ্গে কংগ্রেসের মতাদর্শগত কোনও বিরোধও নেই। সিপিএম এবং কংগ্রেস এক থাকলে মমতার পক্ষে সেই জোটে যোগ দেওয়া অসম্ভব বটে, কিন্তু সেই জোট ভবিষ্যতে কতটা টিকবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর রণকৌশল যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যুক্তি দেখিয়ে মমতা সরকারের সঙ্গে যতটা সম্ভব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা। মোদী-অমিত শাহ জানেন যে, মমতা আগের মতো আর কখনওই এনডিএ-তে যোগ দেবেন না। শতকরা ত্রিশ ভাগ সংখ্যালঘু ভোট এ বারের নির্বাচনেও মমতা যে ভাবে অটুট রেখেছেন, তাতে গোধরা-কলঙ্কিত মোদী যুগে সেটি যে সম্ভব নয়, সঙ্ঘ পরিবারও তা জানে। কিন্তু সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিভিন্ন বিল এবং নীতির প্রশ্নে মমতার ‘বিষয়ভিত্তিক’ সমর্থন নেওয়া, মমতাকে সংসদে এবং বাইরে গাঁধী পরিবারের দুর্নীতি তথা রাহুল গাঁধীর বিরোধিতার দিকে কিছুটা ঠেলে দিতে চাইবে বিজেপি। আর এই হিসেব মাথায় রেখেই মমতার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান রাজ্য বিজেপি বয়কট করলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অরুণ জেটলি সেখানে গিয়েছিলেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী, পীযূষ গয়াল, স্মৃতি ইরানি, ধর্মেন্দ্র প্রধান, বেঙ্কাইয়া নায়ডু, অনন্ত কুমার, এমনকী বাবুল সুপ্রিয়ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে উন্নয়নের প্রশ্নে মমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, মমতার রণকৌশলটি কী?

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ নিয়ে মমতার সাহায্য চান। তার সঙ্গে সঙ্গে, যাতে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ বিপন্ন না করেও তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত করা যায়, সে বিষয়েও তাঁর সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। এবং সেটা তৃণমূল নেত্রী খুব ভাল করেই জানেন। এ বারের বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে তিনি আলোচনা করতেও প্রস্তুত। বাংলাদেশ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে উগ্র জঙ্গি তৎপরতার চেষ্টা থেকে শুরু করে আধার কার্ডের কঠোরতা কমানো— এই সবই আলোচ্যসূচিতে থাকবে। রাজ্যের প্রতি আর্থিক বঞ্চনা বন্ধ করা, রাজ্যের উন্নয়নের জন্য সমুদ্র-বন্দর এবং অন্ডাল বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ার ভূমিকার বিরোধিতা— এ সবই আলোচনায় উঠে আসতে পারে। আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর একটি লিখিত আলোচ্যসূচিও তৈরি করছে। আবার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিব ভাস্কর খুলবে রাজ্যের কোন কোন বিষয় মমতা তুলতে পারেন, সেগুলি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হোমওয়ার্ক করে রাখছেন। আফ্রিকা থেকে প্রধানমন্ত্রী ফিরছেন সোমবার, ১১ জুলাই। তার পর তিনি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে অফিসারদের সঙ্গেও একটি ব্রিফিং বৈঠক করবেন।

মোদীর সঙ্গে মমতার এ বারের বৈঠকে সারদা বা নারদার মতো বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সম্ভাবনা কম। সারদা কেলেঙ্কারি আদালতের বিচারাধীন, আর নারদা নিয়ে লালকৃষ্ণ আডবাণীর নেতৃত্বে গঠিত এথিক্স কমিটি যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে কোনও তদন্ত চালানো প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে না। এ বারের সংসদীয় অধিবেশনের সময় সে কথা জানিয়েও দেওয়া হবে সংসদকে।

প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পাশাপাশি অরুণ জেটলি, অরবিন্দ কেজরীবাল প্রমুখের সঙ্গেও বৈঠক করতে পারেন মমতা। মুকুল রায়, ডেরেক ও’ব্রায়েনের মতো নেতারা তাঁকে পরামর্শ দিচ্ছেন, সংসদ শুরু হচ্ছে আগামী সোমবার, ১৮ জুলাই। আরও কয়েকটি দিন দিল্লিতে থেকে সংসদের সেন্ট্রাল হলেও সব দলের নেতাদের সঙ্গে তিনি দেখা করতে পারেন।

ইতিমধ্যেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে সংসদের দুই কক্ষেই মূল্যবৃদ্ধিতে মোদী সরকারের ভূমিকার প্রতিবাদে নোটিস দেওয়া হয়েছে। জিএসটি নিয়ে মমতা সমর্থন করলেও সংসদে সব বিষয়ে সরকারের পাশে থাকবে না তৃণমূল। বরং সিপিএমের পক্ষ থেকে মোদী ভাই-দিদিভাই বন্ধুত্বের প্রচারে জল ঢেলে দিতে মোদী সরকারকে আক্রমণও করবে মমতার দল। বিরোধী দলের পরিসরটি সিপিএম যাতে ব্যবহার না করতে পারে, থাকবে সেই চেষ্টাও। তাই এ বারের মোদী-মমতার দিল্লিতে বৈঠক সম্পর্কে বিজেপিরই এক শীর্ষ নেতা মন্তব্য করেছেন, এ হল সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।