মেইন ম্যেনু

দিনাজপুরের ২ ইউপি সদস্যসহ ৫জনকে পিটিয়েছে চেয়ারম্যান বাহিনী

ভিজিএফ’র চাউল বিতরণে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় দিনাজপুরের বিরল উপজেলার পলাশবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে এলোপাথারী পিটিয়েছে ২ ইউপি সদস্যসহ ৫জনকে। আহতদের ভর্তি করা হয়েছে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে। এদের মধ্যে ইউপি সদস্য আজাহার আলী’র অবস্থা আশংকাজনক বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা।

এ ঘটনাটি প্রকাশ্যে ঘটেছে,আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় বিরল উপজেলার ১১ নং পলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে।

এলাকাবাসী অভিযোগে জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে সরকারের বরাদ্দ ভিজিএফ’র চাল গত দু’দিন বিতরণ করেছে পলাশবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। তবে বুধবার বিকেলে অনেকে চাউলের প্রাপ্ত কার্ড নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে চাউল নিতে আসলেও চাউল বিতরণ শেষ এবং আর চাউল নেই এই বলে চেয়ারম্যানের লোকজন দুঃস্থ-দরিদ্র লোকজনদের তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু রাত ৮টায় চেয়ারম্যান পরিষদের ২জন দাফাদার ও তার ৬/৭ জন লোককে ইউনিয়ন পরিষদে দু’টি নসিমনসহ পাঠিয়ে দেয় চালের বস্তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু স্থানীয় জনতা তা আটক করে ফেলে। এ সময় পলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল হোসেন.ইউপি সদস্য আজাহার আলী,আবুল হোনেস,মোকাররম হোসেন,মহিলা সংরক্ষিত ইউপি সদস্য আঞ্জুয়ারা বেগমসহ এলাকার অনেকেই উপস্থিত হয়। এবং ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের রক্ষিত ১৯ বস্তা চাউল অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধা দেয়। বিষয়টি তারা তাৎক্ষনিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও),থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি),দূর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে মোবাইল ফোনে জানায়। ইউএনও সকালে বিষয়টি নিজেই হস্তক্ষেপ করবেন এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভিজিএফ চাউল বিতরণে দূর্নীতির অভিযোগের প্রমান পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন বলে তাদের আশ্বাস দেন।

ধূরন্ধর চেয়ারম্যান মিজানুর নিজের বিপদ অনুমান করতে পেরে গভীর রাত থেকে ভোর ও সকালে নিজের (ধনী-গরিব সকল) লোকজনদের বাড়ি বাড়ি দিয়ে ভিজিএফ’র কার্ড পৌঁছে দেয় আজ(বৃহস্পতিবার) সকালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাউল উত্তোলন করার জন্য। সকালে চেয়ারম্যানের লোকজন চাউল উত্তোলন করতে আসলে পরিষদের সদস্য বাবুল হোসেন.ইউপি সদস্য আজাহার আলী,আবুল হোনেস,মোকাররম হোসেন,মহিলা সংরক্ষিত ইউপি সদস্য আঞ্জুয়ারা বেগমসহ এলাকার লোকজন তাদের বাধা দেয়। এবং জানায়, ইউএনও সাহেব লোক পাঠানোর পর সুষ্ঠুভাবে প্রকৃত লোকজন চাউল পাবে।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান এবং তার ভাগিনা সন্ত্রাসী বাহিনী এনে এলোপাথারীভাবে লাঠি পেটা করে ইউপি সদস্য আজাহার আলী,ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনসহ ৫ জনকে। পিতা আজাহার আলীকে বাঁচাতে গেলে, তার ছেলে আলামিন ও আতরকেও মারধর করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিরল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাপস চন্দ্র পন্ডিত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। বলেছেন,পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে ।

উল্লেখ্য, এর আগে চেয়ারম্যান মিজানুরের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতি’র অভিযোগ এনে ইউপি’র ৫ সদস্য ও ইউনিয়নের অধিকাংশ ওয়ার্ড এর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সম্পাদক স্থানীয় সংসদ সদস্য, দুর্নীতি দমন কামিশন,জেলা প্রশাসন,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা দপ্তরে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

এছাড়াও প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তারা। অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে,দিনাজপুর বিরল উপজেলার ১১নং পলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমানের ব্যাপক অনিয়ম, দূর্নীতি, আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এলাকার রাস্তা-ঘাট, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ, চাল-গম, ভিজিএফ কার্ডের চাল-গম আত্মসাৎ ছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন আয় খাতের টাকা এবং রাস্তার দু’ধারের গাছ কেটে বিক্রি করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান আইনের প্রতি কোন শ্রদ্ধাশীল না হয়ে একের পর এক অনিয়ম, দূর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি করে আসছেন। যেমন ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্স আদায়ের আনুমানিক সাড়ে ৩ লাখ টাকার মধ্যে সামান্য কিছু টাকা ইউনিয়ন পরিষদের ফান্ডে জমা দিলেও বাকী টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ৫টি খোয়াড় ডাকের টাকা আদায়ের পর পরিষদের ফান্ডে জমা না করে নিজেই পকেটস্থ করেছেন। অত্র ইউনিয়নের দক্ষিন বাড়ী মৌজা হতে বুজরুখ বসন্তপুর হাট পর্যন্ত রাস্তার দু’পার্শ্বে দেড় শতাধিক মূল্যবান গাছ (কড়াই, শিশু, ইউক্যালেক্টারস) তার দূর্নীতির সহযোগী আইনুল চৌকিদার এবং লোকজন দিয়ে কেটে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে এবং কিছু গাছ বসন্তপুর হাটে জমা রাখে। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান মিজানুর তার দূর্নীতির সহযোগী চৌকিদার আইনুলকে দিয়ে এক গাছ ব্যবসায়ীকে ডেকে এনে গাছ আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অন্যদিকে পলাশবাড়ী মুন্সির মোড় হতে মন্ডলপাড়া মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে মূল্যবান গাছ, গাছ ব্যবসায়ীদের কাছে মাত্র ২ লাখ টাকায় বিক্রি করে ৬০ হাজার টাকা কমিশন নিয়েছেন চেয়ারম্যান।

চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের অনিয়ম আর দূর্নীতি শেষ নেই। চলতি ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে ৩টি কাবিখা প্রকল্পের কাজ নিয়ম মাফিক বরাদ্দ বা কাজ সমাপ্ত করেন নাই। গত মে এবং জুন মাসে ৩টি কাবিখা প্রকল্পে একই ভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। ১নং বুধবাড়িয়া হাট হতে মোলানিয়া মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের কাজে ৯ মেট্রিক টন চাল এবং গম বরাদ্দ দেয়া হয়। ২নং সারাঙ্গাই খানকা ঘরের রাস্তা হতে দপ্তপাড়া পাকা রাস্তার মোড় পর্যন্ত বিশেষ বরাদ্দ ৯ মেট্রিক টন গম ও চাল, ৩নং বৌদ্ধনাথপুর মোড় হতে বঙ্গবন্ধু মাদ্রাসা পর্যন্ত মাটি কাটা প্রকল্পের বিশেষ বরাদ্দ ৯ মেট্রিক টন গম ও চাল সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছে চেয়ারম্যান। ৩টি প্রকল্পের ২৭ মেট্রিক টন চাল ও গম বরাদ্দ থাকলেও ওই প্রকল্প ৩টির কোন কাজই হয় নাই এবং ৩টি প্রকল্পের সভাপতি বা সম্পাদক কে তাও কেউ জানে না। ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্প (টি.আর, কাবিখা, থোক বরাদ্দ, সৃজনশীল) সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড গুলোতে এক তৃতীয়াংশ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদেরকে অর্পন করার কথা থাকলেও চেয়ারম্যান মিজানুর তা না করে নিজের পছন্দশীল ব্যক্তিদের প্রকল্পের চেয়ারম্যান দেখিয়ে তা অধিকাংশ বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অত্র ইউনিয়নে ৪০ দিনের কর্মসূচির মাটি কাটার কাজ বাদ দিয়ে ওই মাটি কাটা শ্রমিকদের নিয়ে চেয়ারম্যান মিজানুর তার নিজের জমির বোরো ধান কাটিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্য তহবিলের প্রাপ্যতা সাপেক্ষে ইউনিয়ন তহবিল হতে ১০৫০ টাকা হারে ত্রৈমাসিক সম্মানি ভাতা উত্তোলনের ক্ষমতা থাকলেও অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রায় ৩ বছর যাবৎ ইউপি সদস্য বা সংরক্ষিত মহিলা সদস্যাদের কোন সম্মানি ভাতা নিয়মিতভাবে না দিয়ে যৎ সামান্য টাকা প্রদান করেছেন। অত্র ইউনিয়নের উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে তা

ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্য বা সংরক্ষিত মহিলা সদস্যারা কেউ জানেন না। জানতে চাইলেও তাদের না জানিয়ে চেয়ারম্যান মিজানুর উল্টো বিভিন্ন অশ্লীল ভাষায় তাদের গালাগাল করেন। কেউ প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসী, মাস্তানদের দিয়ে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্চিত ও ভয়-ভীতির প্রদর্শন করেন।

চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তার ১১নং পলাশবাড়ী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। আওয়ামী লীগের ভাল পদে থাকলেও তিনি অধিকাংশ সময় জামাত-শিবিরের নেতা কর্মীদের সাথে উঠা বসা করেন। তাদের সাথেই তার কথা ও চলাফেরা বেশি। অনেক সময় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী এবং জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান সম্পর্কেও কটুউক্তি করেন তিনি। এ কারণেই চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্রে অত্র ইউনিয়নের অধিকাংশ ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ স্বাক্ষর করেছেন। যা বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, দিনাজপুর জেলা প্রশাসক ও রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।

শুধু অনিয়ন ও দুর্নীতি করেই ক্ষান্ত নয় চেয়ারম্যান মিজানুর। পলাশবাড়ী ইউনিয়ন সীমান্ত বেষ্টিত হওয়ায় অত্র ইউনিয়নের সাধারণ জনগণকে তিনি বিভিন্ন সময় চোরাচালান ও মাদক পাচার মামলায় জড়িত থাকার হুমকি প্রদর্শন করে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। কেউ তার কথায় সারা না দিলে চেয়ারম্যান মিজানুর থানা পুলিশকে দিয়ে মিথ্যা অভিযোগে ওই সব ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিয়ে জেল হাজাত খাটান। এমন অসংখ্য প্রমান রয়েছে এলাকায়।