মেইন ম্যেনু

দিনে চাকরিজীবী রাতে রিকশাচালক

ভর দুপুরে তেজগাঁও এলাকার একটি বেসরকারি বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যালস্ কোম্পানির অফিস কম্পাউন্ডের বাইরে বটগাছ তলায় দাঁড়িয়ে এক স্বপ্নবাজ তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বয়স খুব হলে একুশ হবে। ছিপছিপে শারীরিক গড়ন। চোখে চশমা, পরনে জিন্সপ্যান্ট, ধুসর বর্ণের শার্ট ও পাম্প স্যু। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টানা অফিস ডিউটি করেন তিনি।

নাম তার হাবিবুল্লাহ মির্জা। সিরাজগঞ্জ সদরের এক নম্বর রতনকান্দি ইউনিয়নের নারান্দিয়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক হায়দার আলীর দুই ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি।

বিকেল পর্যন্ত হাবিবুল্লাহ চাকরিজীবী থাকলেও সন্ধ্যা ৭টার পর বেশভূষা ও পেশা বদলে যায় তার। অফিসের অদূরে করিমের গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়া নিয়ে রিকশাচালক পরিচয়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়।

তেজগাঁও, মহাখালী, গুলশান, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারে রাত ১০টা পর্যন্ত রিকশার প্যাডেলে দ্রুত পা চালিয়ে এই রিকশাচালক যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন।

ঘর্মাক্ত দেহ নিয়ে মেসবাড়িতে ফিরে ঘুম দেন। আবার সকালে উঠে কর্মস্থলে ছুটে চলেন। এভাবেই নিত্যদিন কাটছে শিক্ষিত, সংগ্রামী ও স্বপ্নবাজ এই তরুণের।

টানা নয় ঘণ্টা অফিস করার পর কেন তিনি রিকশা চালানোর মতো হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ করছেন এমন প্রশ্নে দুচোখ জলে টলমল হয়ে ওঠে হাবিবুল্লাহ মির্জার। যদিও জল চশমার আড়ালে লুকাতে চেষ্টা করেন তিনি।

একটু সময় নিয়ে বলেন, ‘চাকরি করে যে কয়েক হাজার টাকা বেতন পাই তা দিয়ে নিজের চলতেই কষ্ট হয়। গ্রামে গরীব বাবা-মা। তাছাড়াও ডিগ্রিতে পড়াশুনার খরচও মেটাতে হয়। তাই রাতে রিকশা চালিয়ে অতিরিক্ত আয় করে অভাব ঘোচাতেই রিকশা চালাই।’

হাবিবুল্লাহ মির্জা জানান, বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ সদরের আবদুল্লাহ আল মামুন ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। স্থানীয় সরাইতুল স্কুল থেকে এসএসসিতে সিজিপিএ ৩ দশমিক ৯৪ ও আবদুল্লাহ আল মামুন ডিগ্রি কলেজ থেকে ২ দশমিক ১ সিজিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন।

দরিদ্র বাবার একার আয়ে সংসার চালানোই দায়। তার উপর পড়াশুনা করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা দেখে বাবা কষ্ট করে পড়াশুনার খরচ চালাতেন। কিন্তু বাবার কষ্ট লাঘব করতে কলেজে পড়ার সময় থেকেই কলেজ বন্ধ পেলে ঢাকায় চলে আসতেন হাবিবুল্লাহ।

তিনি জানান, কারওয়ানবাজার এলাকাতে মিনতির কাজ, পত্রিকার হকার ও রিকশা চালাতেন। ২০১৫ সালের ৬ জুন ইনসেপটা ফার্মাসিউট্যিালস্ কোম্পানিতে স্টোর অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগদান করেন। মাসিক বেতন ৬ হাজার ১৩৬ টাকা। পূর্ব নাখালপাড়ার একটি মেসে মাসিক ১ হাজার ৫০ টাকা সিট ভাড়া ও ২ হাজার টাকা মিল (খাবার), যাতায়াত ও ব্যক্তিগত খরচ মেটাতে বেতনের বড় অংশ চলে যেতো।

বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাতেই বিকল্প পেশা খুঁজতে শুরু করেন। চা খেতে গিয়ে অফিসের অদূরে করিমের গ্যারেজে রিকশা ভাড়া নিয়ে চালাতে শুরু করেন। রিকশা চালাতে গিয়ে যেন অসুস্থ হয়ে না পড়েন সেজন্য সপ্তাহে ৩/৪ দিন রিকশা চালান।

অফিস সহকর্মীরা কেউ তার রিকশা চালানোর কথা জানেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে হাবিবুল্লাহ ঘাড় নাড়িয়ে নেতিবাচক উত্তর দিয়ে বলেন, আমার দুঃখ-কষ্ট আমারই থাকুক। নিজের কষ্ট নিজের কাছেই রেখেছি।

কেউ জানলে সমস্যা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘জানলে কী সমস্যা হবে, আমি তো আর চুরি করছি না।’

অভাব অনটনে থাকলেও তার দৃঢ় মনোবল একদিন তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবেন। তার ইচ্ছের কথা জানতে চাইলে প্রথমে কিছু না বলে চুপচাপ থাকেন। পীড়াপীড়ি করলে তিনি জানান, কারো কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নয়, স্বপ্ন দেখেন যোগ্যতা অনুযায়ী হাজার বিশেক টাকা বেতনের চাকরি হবে। ২০ হাজার টাকা বেতন পেলে ৫ হাজার টাকা নিজের খরচ, গ্রামে বাবা-মাকে ১০ হাজার টাকা পাঠানো ও গ্রামে তার মতো দরিদ্র তরুণদের স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ করে দিতে হাজার পাঁচেক টাকা দেবেন বলে জানান।

ফিরে যাওয়ার সময় হাবিবুল্লাহ মির্জার প্রশ্ন, ‘আপনের কাছে সব কথা কইলাম, আমার চাকরির অসুবিধা হইবো না তো?’