মেইন ম্যেনু

দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না কেন ?

মুহাম্মদ আবদুল কাহ্হার :
আজকাল মানুষকে হত্যা করা যেন খুবই সহজ হয়ে গেছে। মানুষের জীবনের যেন কোনই মূল্য নেই? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু, দুর্বৃত্তদের হাতে সাধারণ মানুষ গুম, খুনসহ তথাকথিত জঙ্গিদের হাতে ব্লগার ও প্রকাশক খুন হওয়ার ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। টিভিতে মোটা দাগের লাল লেখাগুলো দেখা মাত্রই প্রাণ আঁতকে ওঠে। আবার যেন কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেল!

চলতি (২০১৫) বছরের সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর ফয়সল আরেফিন দীপন, ৭ আগস্ট নীলাদ্রি চ্যাটার্জি ওরফে নিলয় নীল, ১২ মে অনন্ত বিজয় দাশ, ৩০ মার্চ ওয়াশিকুর রহমান, ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিত রায় এবং ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজীব হায়দার নৃশংসভাবে খুন হন। পত্রিকার পাতাজুড়ে খবরগুলো যেন লাল রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। আপনজনের আহাজারিতে স্তব্ধ হয়ে আছে পরিবেশ। অভিজিৎ রায় হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের টিম এসে পুলিশের কাছ থেকে মামলার ১১ ধরনের আলামত সংগ্রহ করলেও সেই পরীক্ষার ফলাফল এখনও পাওয়া যায়নি। এবারও দীপন হত্যার পর ১৪ ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো পরীক্ষার ফলাফল আলোর মুখ দেখবে কি না তা-ও জানি না। দীপনকে খুনের পর ওই দিনই রাত ৯টায় দায় স্বীকার করে বার্তা পাঠিয়েছে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস) সংগঠন ‘আনসার আল-ইসলাম’। অভিজিৎ খুন হওয়ার পরেও একইভাবে টুইট করে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করা হয়েছিল। যারা খুব সতর্কতার সাথে খুন করে পালিয়ে যায় তারাই কেন আবার দায় স্বীকার করে বার্তা পাঠাবেন সে প্রশ্নেরও উত্তর মিলছে না।

এখন প্রশ্ন হলো, আনসার আল-ইসলাম সংগঠনটি এতই প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী যে, সারাদেশই তাদের নখদর্পণে? আর তারা দেশের মধ্যে থেকে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে খুঁজে বের করতে পারছে না এটাও মেনে নিতে হচ্ছে! অপরদিকে ওলামা লীগের একাংশের নেতারা অপর অংশকে ‘আনসার আল-ইসলাম’ সংগঠনের সদস্য বলেও দাবি করছেন। এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কি অসম্ভব?

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীতে চেকপোস্টে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৩ অক্টোবর তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলায় এক শিশু নিহত হওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকাশকদের ওপর হামলা করা হলো। ফয়সল আরেফিন দীপনের পিতা ঢাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি পুত্রের জন্য অধিক শোকে পাথর হয়ে আছেন। দেশে যখন দিন দিন মানুষ খুন হচ্ছে আর সরকার তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তখন রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলে হত্যার বিচার দরকার নেই।” এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, “সরকার বিচার করতে পারে। আমি দুর্বল মানুষ, একলা মানুষ। আমার কোনো দল নেই। আমার একটা মত আছে, তা প্রকাশ করার সুযোগ পাই না। মিডিয়া নেই, পত্রিকা নেই। আমার তেমন টাকাও নেই। বিচার চাইতে কেমনে যাব?” তার এ কথা খুবই যুক্তিসঙ্গত। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ২০১২ সারের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি বাসার বেডরুমে খুন হন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন হত্যাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেও ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে ৩ বছর ৮ মাস তবুও তার বেঁধে দেয়া ৪৮ ঘণ্টা আর শেষ হলো না!

দেশে সুশাসন যে কতটা আছে তা সহজেই অনুমেয়। এ কারণেই অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ব্যথিত হয়ে বলেছেন, আমার ছেলে হত্যার বিচার দরকার নেই। একজন আদর্শ বাবার কথা এমনই হয়। এটা অসাধারণ এক মন্তব্য। সরকারের জন্য এটি একটি ম্যাসেজ; যদি তারা অর্থ বুঝে থাকেন। যদিও এ ব্যাপারে মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, দীপনের বাবা হত্যাকারীদের ‘মতাদর্শে’ বিশ্বাসী বলে তিনি তার পুত্র হত্যার দাবি করছেন না। তার এ উদ্ভট মন্তব্যে নিহতের পরিবার ও সাধারণ মানুষ মিডিয়ার মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার কয়েক ঘণ্টা পরই নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন সরকারদলীয় এই নেতা।

ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া কোন গুপ্ত হত্যারই বিচার হয়নি। কেননা, সরকারের নীতিনির্ধারকদের চোখে এসব শুধুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সুষ্ঠু তদন্ত ও রায় ঘোষণার আগেই নানারকম বক্তব্য দিয়ে ন্যায়বিচারকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। এটি সত্যিই লজ্জার ও উদ্বেগজনক।

ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমরা ধারণা করছি আনসারুল্লাহ বাংলাটিম বা তার কোন অঙ্গ সংগঠন এ হামলার সাথে জড়িত থাকতে পারে। এখনই কিছু বলা যাবে না। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোন অবনতি ঘটেনি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই এসব ঘটানো হচ্ছে। আনসারুল্লাহ, জেএমবি, আইএস যারাই এটা করুক তারা জামায়াত-শিবিরের লোক। প্রধানমন্ত্রীও একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন।

অপরাধ সংঘটিত হলেই দায় চাপানো হয় বিএনপি-জামায়াতের ওপর। এটি এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সরকারের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে বা ঘটতে পারে সব কিছুই যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতেই করা হচ্ছে। আর বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরই এর সাথে জড়িত। আমরা জানি দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎকে ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের ৮ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। যদিও এই ঘটনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম.খা. আলমগীর দাবি করে বলেছিলেন এর সাথে ছাত্রলীগ জড়িত নয়। এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরকে দোষারোপ আর অস্বীকারের রাজনীতির কারণে নতুন প্রজন্ম প্রচলিত ধারার রাজনীতিকে বাঁকা চোখে দেখে।

২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকি হত্যা মামলায় কয়েকজন ইসলামী স্কলার ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে জড়ানোর অপচেষ্টা হয়েছে। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল আশুলিয়ার ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দু’জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আশুলিয়া ব্যাংক ডাকাতিকে জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পিত কাজ বলে প্রচার করছিল কেউ কেউ। গত ৫ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে এক ধর্মযাজক ফাদার লুক সরকারকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ওবায়দুল ইসলাম নামের একজনকে শিবিরকর্মী বলে প্রচার করা হচ্ছে। পরবর্তীতে পুলিশ জেএমবির ৫ সদস্যকে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করে। এভাবে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীবকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে শিবিরকে দায়ী করে প্রচারণা চালানো হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করলেও তারা কেউ শিবিরের নয়। অভিজিত, নিলয় নীল, তাবেলা সিজার হত্যাসহ এমন প্রায় সব ঘটনার সাথেই বিএনপি-জামায়াত, শিবির কিংবা সরকার সমর্থিত সংগঠনের সাথে জড়িত নন এমন সবাইকে মিথ্যা মামলার মাধ্যমে হয়রানি করার এক প্রবণতা চালু হয়েছে। কিন্তু নিজ দলের নেতাকর্মীদের অপরাধকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা লালন করলে তার দ্বারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এই মুহূর্তে (২ নভেম্বর, ’১৫) গণমাধ্যমে সর্বশেষ সংবাদ হলো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপে সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত ৩০, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা। এই যদি হয় সরকার দলের ছাত্র সংগঠনের অবস্থা তাহলে কী করে বলা যায় যে, দেশ ভালো চলছে? এ ব্যাপারেও কি তারা বলবেন এটা বিরোধী দলের চক্রান্ত?

সরকারের দাবি তারা প্রত্যেকটি ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পেরেছেন। তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- অপরাধী শনাক্ত হলে অপরাধ কমছে না কেন? সরকার যদি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে পারতেন তাহলে দেশে সব ধরনের অপরাধ কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অপরাধ কমছে না বরং বাড়ছে। এতে করে বুঝা যায়, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাছাড়া সরকার যদি সত্য উদঘাটনে আন্তরিক ও স্বচ্ছতার আশ্রয় নিত তাহলে একই ঘটনা বারবার ঘটতে পারত না। সরকার চায় না বলেই হয়তো আমরা সত্যটা জানতে পারছি না। জনগণের চোখে সরকারের সফলতা ও ব্যর্থতা দু’টোই দৃশ্যমান। কিন্তু সরকার দেখে শুধুই তার সফলতা। অজ্ঞাত স্থান থেকে তারা শুধুই জয়ের ধ্বনি শুনতে পায় কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন ও ভিন্ন।
MUHAMMD ABDUL KAHHAR.

 

 

 

 

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]