মেইন ম্যেনু

“দেশি পর্ণ সাইট গুলো হ্যাক করে দিতাম যদি সেখানে কোনো মেয়ের ছবি থাকতো”

জাস্টিস ফর ওমেন, বাংলাদেশ ফেসবুকের সক্রিয় গ্রুপের মধ্যে একটি। নারীদের বিভিন্ন আইনি ও অন্যান্য সমস্যার তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা দেবার উদ্দেশেই এই গ্রুপের সৃষ্টি। চলতি বছরে, এই গ্রুপের সহায়তায় একজন ফেসবুক যৌন নিপীড়কের এক বছর হাজতবাস হয়। জাস্টিস ফর ওমেনের এই সমস্ত কাজ এবং নারীদের সেবাদানের ক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে এ গ্রুপের অ্যাডমিন কুঞ্জ আপুর সঙ্গে ফেমিনিজমবাংলার এই আড্ডা।

কুঞ্জ আপি, জাস্টিস ফর ওমেনের কার্যক্রম কয় বছরের ? মোট কয়টি কেস এই পর্যন্ত নিয়েছেন?

জাস্টিস ফর ওম্যান, বাংলাদেশের কার্যক্রম এই বছরের জানুয়ারির ছাব্বিশ তারিখ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। ছোট বড়, মাঝারি সব ধরনের কেস মিলিয়ে গত ১১ মাসে আমরা ৩০০রও বেশি কেস নিয়েছি। দিনে গড়ে পাঁচটা করে কম্পলেইন আমাদের হাতে আসে

জাস্টিস ফর ওমেন গ্রুপটি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ঠিক কার আইডিয়া থেকে এই গ্রুপের প্ল্যান আসে ? আপনারা সংগঠিত হলেন কীভাবে ?

এই গ্রুপটা সম্পুর্ণ হুজুগের মাথায় খুলি আমি, ২০১২ সালে এইচ এস সি পরীক্ষার পর থেকে আমি বিভিন্ন রকমের সমাজসেবামূলক কাজে ব্যস্ত হুয়ে উঠি, এরপর মেডিক্যালে পড়ার জন্য ময়মনসিংহ চলে আসি, এইখানে বিভিন্ন অনাথাশ্রম আর বৃদ্ধাশ্রম এ ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতাম।তাছাড়া ফেসবুকে বিভিন্ন পুলিশের সাথে যোগাযোগ ছিলো, ঢাকা ও সিলেটের বেশ কয়েকটা কেস সলভ করি আনঅফিশিয়াল ভাবে। তাদের কাছে ভিক্টিম পাঠাতাম। যেমন একটা ঘটনা বলি, ২০১৪ এর ডিসেম্বরের, DSD নামক গ্রুপে একটা ছেলে পোস্ট করে তার বোনকে ইভ টিজাররা অনেক ত্যক্ত বিরক্ত করছে, ঘটনা মেরাদিয়া বাজারের। ব্যাপারটা নানা ভাবে শুধু মোবাইল ব্যবহার করে ইনভেস্টিগেশন করে দেখলাম মেরাদিয়া বাজারে দুর্বৃত্তদের দৌড় অনেক বেশি, স্থানীয় পুলিশও ওদের হাতে বন্দী। ব্যাপারটা জানাই ডিবির পাবলিক রিলেশনের একজন পুলিশ অফিসারকে, পরে উনি যথাযত ব্যবস্থা নেয়ার পর আসামী ধরা পড়ে ডিবির হাতে, পরে দেখা যায় কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। ইভ টিজাররা মাদক চোরাচালানকারী চক্রের সদস্য ছিলো।

যাই হোক, এই বছরের জানুয়ারি মাসে মেহেদিয়া আফরিন তানিয়া নামের এক আপু, যিনি মজিলা বাংলাদেশের এম্বাসেডর, তিনি একটা কেসের বিষয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে আসেন। তিনি বললেন যে তিনি একটা গ্রুপ খুলতে চান যেইখানে অনলাইন হ্যারেসমেন্টের ভিক্টিমদের সাহায্য করা হবে। আমি দ্বিমত পোষন করে বললাম, না, আমরা শুধু সাইবার ক্রাইমের ভিক্টিমদের সাহায্য করবো না, আমরা সকল ধরনের নারী নির্যাতনে হেল্প করবো। এবং যেহেতু আমার সাথে আগে থেকেই পুলিশদের যোগাযোগ ছিলো, বেশ কয়েকজন লয়্যারের আগে থেকেই আমার সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো, তারা সকলেই আমার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং আমি ২০১৫ এর জানুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ ফেসবুকে Justice For Women, Bangladesh (JFWB) নামক গ্রুপটা খুলি। পরে আমার সাথে কো – এডমিন হিসেবে ফাহিমুল ইসলাম ভাই যোগদান করেন, যার ফায়ার সার্ভিসের সাথে ভলান্টিয়ার হওয়ার এক্সপেরিয়েন্স ছিলো এবং যিনি একজন স্কাউট সদস্য।আমরা এইভাবে গ্রুপে স্বেচ্ছাসেবক আহবান করতে লাগলাম, সারা দেশ থেকে অনেক স্বেচ্ছাসেবক আমাদের সাথে যোগদান করেন।

কীভাবে কেস নেন, এবং কীভাবে পুরো ব্যাপারটা পর্যালোচনা করেন আপনারা ?

আমরা কেস নিই অনেক গুলো প্রসেসে, হয় ভিক্টিম সরাসরি গ্রুপে পোস্ট দেয়, বা এডমিন কাউকে ইনবক্সে এসে নক করেন
কেস আসার পর পর আমাদের এডমিন প্যানেল ও কেস ইন্সট্রাকটর প্যানেলে সবাই মিলে কেস নিয়ে আলোচনা করি, এই আলোচনায় এক দুইজন পুলিশকেও রাখি।যদি বুঝতে পারি যে আসামীর সাথে কথ বলে কেস সলভ হবে তখন আমরা সরাসরি আসামীর সাথে যোগাযোগ করি।
কিন্তু যখন দেখি যে শান্তিপূর্ণ ভাবে আপোষ কখনই সম্ভব না তখন একজন ফিল্ড ওয়ার্কার ভলান্টিয়ার কে পাঠাই ভিক্টিমের কাছে, সে ভিক্টিমকে নিয়ে যায় থানায়য় বা কোর্টে কেস করার জন্য।এইদিকে পুলিশের কাজের দায়িত্বটা ডিবি সবসময়েইই নিজ কাঁধে তুলে নেন। গ্রেফতারী পরোয়ানা আসার পর যখন আসামী গ্রেফতার হয় তখন আমরা বিনামূল্যে বা খুব সামান্য মূল্যে (১০০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকা সর্বোচ্চ) কেসটা একটা লয়্যারের কাছে পাঠাই। পরবর্তী কাজ লয়্যারই সম্পন্ন করেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত, জাস্টিস ফর ওমেনের সহয়ায়তায় এক ফেসবুক যৌন নিপীড়কের এক বছরের হাজতবাস হয়, ঘটনাটি একটু ডিটেইলসে শুনতে চাই

বেশ কিছুদিন আগে আমাদের একটা কেস আসে, এক মেয়েকে তার সাবেক প্রেমিক তার আপত্তিকর ছবি দিয়ে তাকে ব্ল্যাক মেইল করছে। বিষয়টা আমাদের চোখে আনেন Desperately Seeking Explicit (DSE) এর এডমিন ইমন খান। কেস হাতে পাওয়ার পর পরই জাপানে প্রেষনে অধ্যয়নরত এ এস পি মাশরুফ হোসাইনের সাথে বিষয়টা আলোচনা করি।উনি বুদ্ধি দিলেন কেস সরাসরি ডিবির হেডকোয়ার্টারে গিয়ে করতে। অতঃপর ডিবির সাইবার ক্রাইমের হেড নাজমুল সুমন ভাই পুরোটা কেস নিজের কাঁধে তুলে নেন।
এদিকে আসামী সেই রকম চালাক, সে কোনোভাবেই ধরা দেয় না পুলিশের হাতে। পরে এই কেসের একজন কেস ইন্সট্রাকটর লিসা ফারজানা নিজে অত্যন্ত সাহসী হয়ে একাই আসামী আদিব কে ধরেন এবং উনি তাকে ডিবির হাতে সোপর্দ করেন। বিষয়টা মোবাইল কোর্টে উঠে এবং পরেরদিনই ম্যাজিস্ট্রেট আসামীকে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
অনেক মেয়েরাই আইনি লড়াই লড়তে ভয় পায় , লড়াই শুরু করে পিছপা হয়! এতে আপনাদের কর্মকাণ্ড কি বিঘ্ন হয় ?

যা এই ক্ষেত্রে আমাদের প্রচন্ড সমস্যা হয়, যেইটা বলার মত না।
কথা প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি আমাদের কাছে একটা মেয়ে কম্পলেইন করে, তার শ্বশুরবাড়ি এবং তার স্বামী তাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতন করে, যেইটা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। মারতে মারতে তাকে মেরেই ফেলে এরকমম অবস্থা…. আমরা কাহিনী শুনে মোটামুটি হতভম্ব. ABPN এর এসপি জাহেদ পারভেজ চৌধুরী ভাইককে জানানোর পর উনি তাড়াহুড়ো করে মেয়েটার লোকেশনের সব পুলিশকে জানান বিষয়টা, মেয়ের স্বামীকে ফোন দেন । পরে আমাদের একজন সাবেক ফিল্ড ওয়ার্কার ও কেস ইন্সট্রাকটর মোমিন হোসেন শুভ মেয়েটার বাবার বাড়ির সবার সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাদের কনভিন্স করেন যে থানায় অন্তত একটা জিডি করতে, জিডি করলেই পুলিশ মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পারবে।
এই ঘটনা মেয়েটার স্বামী টের পাওয়ার পর সে তার স্ত্রীয়ের হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চায়। এবং এই ঘটনার পর মেয়েটার পরিবারও পিছিয়ে আসে কেস করা থেকে।
এখন আমার প্রশ্ন „ সেইদিন আমরা পাঁচটা মানুষ না খেয়ে না ঘুমিয়ে ওই মেয়েটার জন্য এত খাটুনি করলাম, এত দৌড়ঝাঁপ করলাম, আমাদের কষ্ট হয় নাই???
ভিক্টিম যখন কেস করা থেকে পিছিয়ে আসে তখনই আমরা ডিমোরালাইজড হয়ে পড়ি, ব্যাপারটা আমাদের জন্য বেশ কষ্টদায়ক। আমরা কয়েকজন স্টুডেন্ট নিজেদের পকেটমানির টাকায় এই গ্রুপটা চালাই। আমাদের বেশ কষ্ট হয় এইভাবে অনর্থক মোবাইলের খরচ করতে।

এখন মেয়েরা সবচেয়ে বেশি সাইবার হয়রানির স্বীকার হচ্ছে, JFWB তাদের কীভাবে আইনি সহায়তা দেয় ?

সাইবার হয়রানীর শিকার মেয়েদের সবার আগে যেটা করা লাগতো অতীতে, সেটা হলো থানায় অন্তত একটা জিডি করা, কারন জিডি না করা হলে পুলিশ আইনী ভাবে আগাতে পারবে না।
আমাদের গ্রুপটা আগে কোনো সরকারি ভাবে রেজিস্ট্রি করা সংস্থা ছিলো না, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আমরা আমাদের রেজিস্ট্রি এর কাজ গত মাসেই শেষ করে ফেলেছি। এখন বেশ কিছু চমক অপেক্ষা করছে এই গ্রুপ সম্পর্কে যারা যারা জানেন তাদের জন্য।
আমরা ফেক আইডির কেস গুলোতে আইডি অফ করায় দেই কম্পলেইন করে। দেশি পর্ণ সাইট গুলো হ্যাক করে ডাউন করে দিতাম যদি দেখতাম কোনো মেয়ের ছবি বা মোবাইল নম্বর দিয়ে দিয়েছে সেখানে। আর অনলাইন হ্যারেজমেন্ট হইলে উপরে যে কেসের কথা বললাম, ওই কেসের মত প্রবলেম সলভ করি।
কিন্তু এই কিছুদিন আমাদের সাইবার হ্যারেজম্যেন্ট এর কার্যক্রম আমরা বন্ধ রেখেছি কারন আমাদের গ্রুপে নতুন হ্যাকার রিক্রুট করা হচ্ছে, বাংলাদেশের অন্যান্য হ্যাকারদের মত উনারা কোনো সাইবার ওয়ার করেন না যেহেতু প্রত্যেকেই বাস্তব জীবনে এক একটা প্রতিষ্ঠানে আইটি স্পেশালিষ্ট। উনাদের কাজ শুধুই সাইবার জগৎটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা

আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই ?

আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশাল। আমরা শুধু নারী নির্যাতন নিয়েই আটকে থাকবো না। আমরা এইটাকে একটা ফাউন্ডেশন এ পরিনত করেছি, ফাউন্ডেশন এর নাম আপাতত একটু গোপনই থাক, একটা বড় সারপ্রাইজ এর মাধ্যমে এই নাম প্রকাশ করা হবে। এই ফাউন্ডেশনটটা বাংলাদেশ এর সবচেয়ে বড় ফাউন্ডেশন হতে যাচ্ছে যেইখানে আমরা মোট ৩২ টা প্রজেক্টে কাজ করব। আর আইনী সহায়তা দেয়ার জন্য আমরা বাংলাদেশ পুলিশের সাথে অফিশিয়ালি একাত্মতা ঘোষনা করবো যাতে কেসগুলো সলভ করা আরো সোজা হয়।

যেসব মেয়ে আইনি লড়াই লড়তে ভয় পায় বা লড়তে চায় না তাদের জন্য জাস্টিস ফর ওমেনের পক্ষ থেকে কিছু বলতে চান ?

যেইসব মেয়েরা আইনী লড়াইয়ে যেতে ভয় পান তাদের জন্য বলছি, মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারলে জগতে কেউই টিকে থাকতে পারে না।

সূত্র: ফেমিনিজমবাংলা