মেইন ম্যেনু

দেশের জার্সিতে মাশরাফির ১৫ বছর

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। ১৮ বছরের টগবগে এক তরুণ বাংলাদেশ দলে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের নেতৃত্বাধীন দলটিতে একইদিন টেস্ট অভিষেক হয়েছে আরও একজনের। জাতীয় দলে তিনি অবশ্য অনেক সিনিয়র, খালেদ মাহমুদ সুজন। টগবগে তরুণটির নাম মাশরাফি বিন মর্তুজা কৌশিক।

অভিষেকের আগেই কিছুটা নাম কুড়িয়ে নিয়েছিল ছেলেটি। বয়সভিত্তিক দলে খেলার সময় তুলেছিল গতির ঝড়। এরপর ‘এ’ দলে। তারপর সরাসরি জাতীয় দলে। ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম শ্রেণির কোন ম্যাচ খেলা ছাড়াই সরাসরি জাতীয় দলে এবং টেস্ট অভিষেক।

বাংলাদেশে পেস বোলারদের পথপ্রদর্শক হিসেবে সেদিন থেকেই পথচলা শুরু তরুণ এই পেস বোলারের। এরপর নিরন্তর পথচলা শুরু মাশরাফি বিন মর্তুজার। মঙ্গলবার সেই পথচলার পূর্ণ হবে ১৫ বছর। দেড় দশক পূর্ণ হওয়ার দিনও মাঠে নামবেন মাশরাফি। যদিও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নয়, ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট, বিপিএলের দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের জার্সি গায়ে।

তখনকার জিম্বাবুয়ে অনেক শক্তিশালী একটি দল। ব্রায়ান মারফির নেতৃত্বে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, হেনরি ওলোঙ্গাদের মত ক্রিকেটাররা ছিলেন ওই টেস্টে। অভিষেক ইনিংসেই তুললেন গতির ঝড়। সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন নিজের আগমনী বার্তা। কারলিসলি, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক আর ব্রায়ান মারফিসহ নিলেন মোট ৪ উইকেট।

বৃষ্টির কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে আর বল করা হয়নি মাশরাফির। টেস্ট ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল ড্র। কিন্তু ১৮ বছরের তরুণটি সেদিন যে বার্তা দিয়েছিল, তার অনুরণন বইছে আজও এ দেশের ক্রিকেটে। মাশরাফিই সর্বপ্রথম ক্রিকেটার, যিনি টানা ১৫ বছর খেলে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে টেস্ট অভিষেক হওয়া খালেদ মাহমুদ সুজন এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক, জাতীয় দলের ম্যানেজার এবং প্রিমিয়ার লিগে ঢাকা আবাহনী ও বিপিএলে ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ।

অভিষেকে ঝড় তুলেছিলেন সত্য; কিন্তু ক্যারিয়ারটা নিঃসংকোচে এগিয়ে যেতে পারেনি। সর্বনাশা ইনজুরি ছায়ার মতই লেগে রয়েছে মাশরাফির। একেবারে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে। ইনজুরির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মাশরাফির হাঁটু। দুই হাঁটুতে অন্তত ৭টি বড় অপারেশন করতে হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে আরও বেশ কয়েকটি। অথ্যাৎ সব মিলিয়ে ১০টিরও বেশি।

ইনজুরির কারণে ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়েছে মাঠের বাইরে। তার মত একজন পারফরমারের সার্ভিসটা এ কারণেই ভালোভাবে পায়নি বাংলাদেশ। সম্পূর্ণ সুস্থ মাশরাফি যদি এই ১৫ বছর বাংলাদেশকে সার্ভিস দিয়ে যেতে পারতেন, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে যেতে পারতো আরও অনেক দুর।

যে ফরম্যাটে অভিষেক হয়েছিল মাশরাফির, সেই ফরম্যাটকে আপাতত বিদায় জানাতে হয়েছিল আজ থেকে আরও ৭ বছর আগে। ২০০৯ সালে কেনসিংটন ওভালে স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলেছিলেন সর্বশেষ টেস্ট। ওই সিরিজে মাশরাফিই ছিলেন অধিনায়ক। কিন্তু ম্যাচ চলাকালীনই ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল টাইগার অধিনায়ককে। টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি সেখানেই।

এরপর ইনজুরি আর মাশরাফিকে লংগার ভার্সনের ক্রিকেট খেলতে দেয়নি। টেস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ও বলেননি। তবে এখনও তিনি স্বপ্ন দেখেন সাদা জার্সি গায়ে মাঠে নামছেন, তুখোড় বোলিং করে নাভিশ্বাস তুলে ফেলছেন প্রতিপক্ষের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের; কিন্তু দুই হাঁটু যে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে! তবুও আশা জিইয়ে রেখেছেন নড়াইল এক্সপ্রেস। এর কারণ, তিনি অদম্য, কোন কিছুতে হার মানতে নারাজ এবং ক্রিকেটে চীরন্তন এক যোদ্ধা।

একটা ইনজুরি যেখানে একজন ক্রিকেটারের পুরো ক্যারিয়ারই ধ্বংস করে দেয়, সেই মাশরাফি এখনও টিকে আছেন। কঠিন কঠিন সব ইনজুরির ধকল কাটিয়েও টিকে আছেন। শুধু টিকে থাকাই নয়, একজন সেরা পারফরমার হয়েই টিকে রয়েছেন তিনি।

আর সর্বশেষ দুই বছর তো তার নেতৃত্বেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। টাইগারদের সোনালী সাফল্য এসেছে তার হাত ধরেই। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যে বাংলাদেশ এক অপ্রতিরোধ্য দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা কেবল মাশরাফির তুখোড় নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মুশফিকের কাছ থেকে রঙ্গিন জার্সির নেতৃত্ব তুলে দেয়া হয় মাশরাফির ঘাড়ে। এরপর থেকেই সাফল্য এসে লুটোপুটি খাচ্ছে বাংলাদেশের পদতলে। জিম্বাবুয়েকে ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে শুরু। এরপর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়, জিম্বাবুয়েকে আরও এক দফা ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার পর সাফল্যের ধারাবাহিকতা ছিল এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতেও। ফাইনাল পর্যন্ত চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভালো ফল না আসলেও, বড়দের কাছে সমীহ জাগানিয়া একটি দলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। তা কেবল মাশরাফির তুখোড় নেতৃত্বগুণেই সম্ভব হয়েছ।

বাংলাদেশের পতাকাবাহক এখনও মাশরাফি। আগামী দিনে তার নেতৃত্বে আরও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, এটাই সবার প্রত্যাশা।

৮ নভেম্বর টেস্ট অভিষেকের পর একই মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই হয়েছে ওয়ানডে অভিষেক। ২০০৬ সালে হয়েছে টি-টোয়েন্টি অভিষেক। কাকতালীয় বিষয় হলো, মাশরাফির তিন ফরম্যাটের অভিষেকই হয়েছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

ইনজুরিতে পড়ে টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগে তিনি ম্যাচ খেলেছেন ৩৬টি। উইকেট পেয়েছেন ৭৮টি। গড় ৪১.৫২, ইকনোমি রেট ৩.২৪ করে। ৫ উইকেট নেই, ৪ উইকেট নিয়েছেন ৪বার করে। রান করেছেন ৭৯৭টি। সর্বোচ্চ ইনিংস ৭৯। ওয়ানডে খেলেছেন ১৬৬টি। উইকেট নিয়েছেন ২১৬টি। ওয়ানডেতে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকও তিনি। সেরা বোলিং ফিগার ২৬ রানে ৬ উইকেট। রান করেছেন ১৪৯৫। সর্বোচ্চ রান অপরাজিত ৫১। টি-টোয়েন্টিতে ৪৯ ম্যাচে উইকেট নিয়েছেন ৩৮টি।