মেইন ম্যেনু

দেশের পাটে তৈরি হচ্ছে জিন্স, ফিরছে সোনালি স্বপ্ন

বিশ্ববাজারে পাটের দাম কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। অতীত গৌরব হারাতে বসেছে এ সেক্টর। কিন্তু সরকার পাটের আভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তাই এ সেক্টর দেখছে সোনালি স্বপ্ন। তৈরি করা হবে পরিবেশবান্ধব পাটের গ্রিন ব্যাগ। তুলনামূলক কম দামেই তা সরবরাহ করা হবে জনগণকে। এছাড়া পাট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কাপড়।

পাটে সোনালি স্বপ্ন দেখিয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, ‘আমাদের এখানেই ৩০ শতাংশ পাট এবং ৭০ শতাংশ সুতা দিয়ে জিন্সের কাপড় তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আর শুধু পাট দিয়েই ভিসকস তৈরি করা হচ্ছে। যা দিয়ে সুতা তৈরি করা হবে।’

‘জিও টেক্সটাইলের (প্রধানত সড়কে ব্যবহার করা হয়) মাধ্যমে ৮শ কোটি টাকার পাট দেশেই ব্যবহার করতে পারি’ জানিয়ে মির্জা আজম বলেন, ‘পাট হয়ে আছে আমাদের জন্য মূল্যবান জিনিস। পাট গাছের শিকর দিয়ে মূল্যবান ওষুধও তৈরি সম্ভব। এখানেই শেষ নয়, পাটখড়ি দিয়ে চারকল তৈরি করা হচ্ছে। এখান থেকেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসছে।’

মির্জা আজম জানান, উল্লেখিত সম্ভাবনা, পদক্ষেপ ও পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০ বাস্তবায়ন করতে পারলেই পাটের সোনালি অতীত ফিরে আসবে। বাংলার মানুষ পাটের মাধ্যমে সমৃদ্ধির সোনালি স্বপ্ন দেখবে। এছাড়া গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ফলে পাটের চাহিদা বাড়বে। আর চাহিদা বাড়লে বাড়বে দামও। কৃষক পাটের উৎপাদনে উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি কৃষকের প্রতি সরকারের সব ধরনের সহযোগিতাও অব্যাহত থাকবে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন করতে বছরে প্রায় ৭০ কোটি পাটের বস্তা প্রয়োজন। সে হিসাবে প্রতি মাসে ৫ কোটি ২৫ লাখ ব্যাগ লাগবে। ইতোমধ্যে দুই মাসের প্রয়োজনীয় বস্তা (৭০০ গ্রাম) মজুদ রাখা হয়েছে। আর ৭০০ গ্রাম ওজনের ৭০ কোটি বস্তা তৈরি করতে বছরে ২০ থেকে ২২ লাখ বেল কাঁচাপাটের প্রয়োজন। এছাড়া শুধুমাত্র কাঁচাপাট কিনতে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনকে (বিজেএমসি) ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে গত ৩ ডিসেম্বর পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এর কারণ অ্যান্তরীণ চাহিদা, বিশেষ করে বস্তা তৈরি করতে ২০ লাখ বেল পাটের প্রয়োজন। যদি কাঁচাপাট রপ্তানি করা হয় তাহলে আভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না। তবে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখতে সীমিত আকারে কাঁচাপাট রপ্তানি করা যাবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

গত ৩০ নভেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার এবং চিনি এসব পণ্যে বাধ্যতামূলক পাটের মোড়ক ব্যবহারের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত মোট ৮৩৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। ১ হাজার ৮৮৫ মামলা হয়েছে। ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ১৫০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আর দু’জনকে কারদাণ্ডও দেয়া হয়েছে।

2015_12_17_15_45_48_HiZy2KN2DzaRsfKfgNLGLlWBgUllgc_original
প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম

এ সম্পর্কে মির্জা আাজম বলেন, ‘সাঁড়াশি অভিযান বলা হলেও এটা তা নয়। দোকানদার, চাতাল ও মিল মালিকরা এমনিতেই সাড়া দিয়েছেন পলি বা প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার না করার জন্য। সবারই মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে বলেছেন- ঘোষণার পর থেকেই আর পলিব্যাগ ব্যবহার করছেন না।’

আর এসব কারণে আগামী মৌসুমে ৫০ শতাংশ পাট বেশি উৎপাদন হবে। দামও ভালো পাবে কৃষক বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।

ভারতে কাঁচাপাটের ব্যাপক চাহিদা
জানা গেছে, ভারতে ৮৪টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টিরও বেশি পাট কল রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ করার পর ভারত বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়েছে। তারা অনুরোধ জানিয়েছে, কাঁচাপাট রপ্তানি অব্যাহত রাখার জন্য। তা না হলে দেশটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই পরিষ্কার ভারতেও বাংলাদেশের পাটের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক।

পাটের শত্রু পলিব্যাগ কারখানা
এদিকে বাংলাদেশে কতটি পলিথিন কারখানা আছে তার সঠিক পরিসংখ্যানও নেই মন্ত্রণালয়ের কাছে। বিনিয়োগ বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৩৪টি আবার পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বলা হচ্ছে ১০০টির কাছাকাছি। তবে সংখ্যা যাই হোক পাট শিল্প বাঁচাতে এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য পলিব্যাগ কারখানা বন্ধ করা হবে। শুধু রপ্তানির জন্য যতটুকু লাগবে সেটুকুই উৎপাদন করা হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, জানালেন প্রতিমন্ত্রী আজম।

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ। কাঁচাপাট ও পাটপণ্য রপ্তানিতেও এ দেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে। প্রতিবছর দেশে প্রায় ৭.১৫ হেক্টর (১৬ থেকে ১৭ লাখ একর) জামিতে পাট চাষ হয়। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়। যা ১৪ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের সমপরিমান।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাঁচাপাট উৎপাদন হয় ৭৫.৭২ লাখ বেল, রপ্তানি হয় ২০.৫৫ লাখ বেল, কাঁচাপাট থেকে রপ্তানি আয় ১ হাজার ৪৩৬.৪৬ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কাঁচাপাট উৎপাদন হয় ৬৭.৮৫ লাখ বেল, রপ্তানি হয় ৯.৮৪ লাখ বেল পাট, আর রপ্তানি আয় ৭০৬.০৫ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাঁচাপাট উৎপাদন হয় ৭৫.০১ লাখ বেল, এখন থেকে ১০.০১ লাখ বেল রপ্তানি হয়, রপ্তানি আয় ৮১৬.৭৪ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৭৫.৫৮ লাখ বেল কাঁচাপাট।

এদিকে পাটজাত দ্রব্য থেকে ২০১২-১৩ সালে রপ্তানি আয় হয় ৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ সালে ৫ হাজার ২২৪ কোটি, ২০১৪-১৫ সালে ৫ হাজার ৬০২ কেটি এবং ২০১৫-১৬ সালে এখন পর্যন্ত আয় হয়েছে ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা।

কাঁচাপাটের আভ্যন্তরীণ ব্যবহার ২০১২-১৩ সালে ৫৮.৭৩ লাখ বেল, ২০১৩-১৪ সালে ৫৯.০৬ লাখ, ২০১৪-১৫ সালে ৫১.৯৩ এবং ২০১৫-১৬ সালে ২০.৩৯ লাখ বেল হয়।

উল্লেখ্য, পাট ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক এবং ব্যবহারকারীদের কাছে বর্তমানে ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৯১ লাখ বেল পাট মজুদ আছে। আর কৃষক পর্যায়ে আছে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ শতাংশ।