মেইন ম্যেনু

দেশে দেশে গৃহকর্মী নির্যাতন

‘প্রথম যেদিন সে আমাকে আঘাত করেছিল সেদিনটি ছিল আমার বেতন পাওয়ার দিন। সে আমাকে একটি কাগজ দিয়ে সেখানে স্বাক্ষর করতে বলেছিল, কিন্তু আমি যখন তাকে প্রশ্ন করি টাকা না পেয়ে আমি কেন এখানে স্বাক্ষর দেব, এরপরই আমার উপর শুরু হলো অমানবিক নির্যাতন’। যার কথা বলছিলাম তিনি হলেন ইন্দোনেশিয়ার একজন গৃহকর্মী। ৩০ বছরের সুসি এভাবেই বর্ণনা করলেন তার জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। যা গত একবছর যাবৎ তিনি সহ্য করে আসছিলেন। একবছরের কর্মজীবনে তাকে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতে হয়েছে হংকংয়ের গৃহপরিচারিকা ল ওয়ান-তং’র হাতে। হংকংয়ের আইন অনুযায়ী পরবর্তীতে ওই গৃহপরিচালিকাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।

গৃহকর্মী সুসির ভাষ্যমতে ‘সে আমাকে শুধুমাত্র সকাল ছয়টা থেকে সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমাতে দিত। প্রতিদিন আমি চার ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে পারতাম। আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও কাজ থেকে বিরতি দেয়া হতো না। আমার কোন ছুটির দিনও ছিল না’। অপর এক ইন্দোনেশিয় গৃহকর্মী যিনি কাজ করতেন এক মালয়েশিয় গৃহপরিচারিকার বাসায় এবং বয়সেও তিনি প্রবীন। সেখানেও তার উপর চালানো হতো পাশবিক অত্যাচার। অত্যাচারের মাত্রা এতো ভয়াবহ ছিল যে, গৃহপরিচালিকা তার উপর ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। এতে করে তার পা এবং পিছনের বেশ কিছু অংশ ঝলসে যায়। এমনি আর একজন হলেন তাইওয়ানের শ্রীতক। তিনিও একইরকম পাশবিক অত্যাচারের শিকার। গরম কাটাচামচ দিয়ে তার গায়েও বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতবিক্ষত করা হয়।

গৃহপরিচারিকার বিরুদ্ধে জোর গলায় কথা বলারও সাধ্য নেই কারও। কাজ ছাড়ার কথা বললে তাদের পরিবারকে মেরে ফেলারও হুমকিও দেয়া হয়। সুসির ভাষ্যমতে ‘যদি তুমি আমাদের কথা কাউকে বলো বা এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করো তাহলে আমি তোমরা পরিবারকে মেরে ফেলবো। আর এটাই ছিল আমার কাছে সবচেয় বড় ভয়। আমি তার প্রহার সহ্য করতাম কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতাম সে যেন মারতে মারতে আমাকে মেরে না ফেলে, কারণ আমার ছোট একটি সন্তান আছে।’ একপর্যায়ে সুসি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হলেও এরকম হাজারো গৃহকর্মী আছে যারা এখনও প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর এরকম চিত্র শুধু মালেশিয়া আর হংকংএ হচ্ছে তা কিন্তু নয় বাংলাদেশেও আছে এরকম চিত্র। বাংলাদেশের হ্যাপি হচ্ছে তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। সমাজের শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষেরাই বেশিরভাগ সময় সমাজের নিকৃষ্ট কাজগুলো করে থাকে। এদের মধ্যে অনেকে আবার পালিয়ে বাঁচতে পারলেও অনেকে আবার নির্যাতনের যাতাকলে নিয়মিত শোষিত হচ্ছে।

আর এসকল নারীদের উদাহরণ হলো সেই সকল গৃহকর্মীদের জন্য দৃষ্টান্ত যারা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। হংকংয়ের বিদেশি সংবাদদাতাদের একটি সংস্থা এই বিষয়ের উপর একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধিই এই প্রদর্শনীর অন্যতম মূল উদ্দেশ্য ছিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার(আইএলও) পরিসংখ্যান অনুসারে সারা পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৫২ মিলিয়ন গৃহকর্মী কাজ করে। কিন্তু এর মধ্যে নির্যাতিত মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক এশিয়াতে। কিন্তু এই বিষয়ে নেই কোন কঠোর পদক্ষেপ। কোন কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না গৃহকর্মী নিয়োগের নামে এই অনিয়ন্ত্রিত শোষণ।



« (পূর্বের সংবাদ)