মেইন ম্যেনু

দেশ রক্ষা ও প্রতিশোধ : রুশ তরুণীর অদম্য স্নাইপার হয়ে ওঠার গল্প

কলেজ পাস করে সদ্য কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা হয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে বাজছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। ১৯৪১র পর পর লেলিনগ্রাদ দখলের যুদ্ধে নিহত হলেন তার ভাই। এরপর আরো দুই ভাই-বোন হারানোর পর শিক্ষিকা বই-কলম ফেলে দিলেন। স্বজন হারানোর প্রতিশোধ এবং দেশমাতৃকা রক্ষার তাগিদ নিয়ে ১৯৪২ সালে রোজা শানিনা যোগ দিলেন সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে। সোভিয়েত বাহিনীতে একজন স্নাইপার হিসেবে নাম লেখালেন।

‘ওয়ার্ল্ড ওয়ার ২ প্লাস ৭৫ : দ্য রোড টু ওয়ার’ বইয়ের লেখক ডেভিড এইচ লিপম্যান বলেন, সোভিয়েতের প্রত্যেক স্নাইপারের মধ্যে মাতৃভূমি রক্ষার বিষয়টি নৈতিক দায়িত্বের গভীরে প্রোথিত ছিল। এই সাধারণ কর্মীরাই অসাধারণ বীরত্বগাঁথার জন্ম দিয়েছিলেন।

সেন্ট্রাল ফিমেল স্নাইপার একাডেমি থেকে ট্রেনিং নেওয়ার পর প্রস্তুত হলেন শানিনা। তবে কর্তৃপক্ষ আপাতত তাকে সম্মুখ যুদ্ধে পাঠালেন না। কারণ সেখানকার চিত্র শানিনার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবে। তাই বলে সোভিয়েতের ২৪৮৪ জন নারী স্নাইপারের দক্ষতাকে খাটো করে দেখতেন না কেউ। বরং প্রশিক্ষকরা মনে করতেন, নারীদের দৈহিক স্থিতিস্থাপকতা, অসীম ধৈর্য এবং যন্ত্রণা সহ্যের ক্ষমতা তাদের অদম্য স্নাইপারে পরিণত করে। অনেক পুরুষ স্নাইপারের চেয়েও তারা ভালো কাজ দেখিয়েছিলেন।

কিন্তু আর দেরি সহ্য হলো না শানিনার। দেশ রক্ষার মহান ব্রত আর স্বজন হারানোর ক্ষত নিয়ে স্নাইপিং রাইফেল কাঁধে নিয়ে শত্রু বধে এগোলেন তিনি। ১৯৪৪ সালের এপ্রিলে ভাইটবিস্কের কাছে শানিনা জীবনের প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটালেন। তার ভাই-বোনের হত্যাকারী নাৎসি সৈন্যকে একটি বুলেটে ফেলে দিলেন। পরের এক মাসের মধ্যে তার রাইফেল ১৭ জন শত্রুর প্রাণ নিলো। যুদ্ধের ময়দানে একটি বাস্তবতাই উপলব্ধি করেছিলেন সকল যোদ্ধা, হয় মারো নয় মরো।

একপর্যায়ে হেভি আর্টিলারি ফায়ার অংশে তার কমান্ডার শানিনাকে ক্ষান্ত দিতে বললেন। নির্দেশ পুরোপুরি অগ্রাহ্য করলেন তিনি। তিনি অ্যাডভান্সিং ইনফ্যানট্রি কলাম-কে সাহায্য করে যেতে লাগলেন। তিনি শুধু নাৎসি বধেই মেতে ওঠেননি, বহু জার্মান সৈন্যকে ধরে এনেছিলেন। আহত হয়েছেন বহুবার। যুদ্ধে তার কার্যক্রম এবং দক্ষতার গল্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একবার এক সম্মুখ যুদ্ধে ৭৮ জন সৈন্য ছিলেন সোভিয়েতের পক্ষে। তার মধ্যে ৭২ জনই নিহত হলেন। সেখানে বেঁচে গেলেন শানিনা।

১৯৪৫ সালে শানিনার বুক চিরে বেরিয়ে যায় বিস্ফোরিত আর্টিলারির একটি বিচ্ছিন্ন অংশ। মাত্র ২০ বছর বয়সে যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ হারান তিনি। মৃত্যুর আগে ৫৪ জন শত্রুকে ঘায়েল করেন তিনি। অনেকের মতে, শানিনার রাইফেলে নিহত হন ৫৯ জন জার্মান সৈন্য। এ কাজে সময় নিয়েছিলেন মাত্র ১ বছর।

যুদ্ধ যখন শেষ হলো, শানিনার অবদানের কথা ইতিহাসে স্থান পেল। ইতিহাসের অন্যান্য সেরা স্নাইপারদের সঙ্গে জায়গা দেওয়া হলো শানিনাকে। এমনই খ্যাতিমান স্নাইপারদের মধ্যে ছিলেন ইউএস আর্মির স্টাফ সার্জেন্ট অ্যাডেলবার্ট ওয়ালড্রোন। তিনি দুই বছরে ১০৯ জন শত্রু বধ করেছিলেন। আরো আছেন নেভি সিলের ক্রিস কাইলি। টানা ১০ বছরের সার্ভিসে তিনি হত্যা করেছিলেন ২৫৫ জন শত্রুকে। কিন্তু সবচেয়ে কম সময়ে শানিনা রাইফেলে যতজন শত্রু নিহত হয়, তা বিশেষজ্ঞদের চোখে আজও বিস্ময়।

এসব তথ্য একজন সৈন্যের হত্যাযজ্ঞের কথা বলছে। কাজেই সবচেয়ে বড় খুনি হিসাবে শানিনাকে কেউ যদি দেখেন, তবে এও বুঝতে হবে যে দেশের জন্যে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি এ কাজ করেছিলেন। ওই যুদ্ধে নারী স্নাইপাররা মোট ১১ হাজার ২৮০ জন জার্মান সৈন্য হত্যা করেছিলেন।

হিস্ট্রি চ্যানেলের টেকনিক্যাল অ্যাভাইজর এম জি সেফটাল লিখেছেন, শানিনার যুদ্ধ করার তাগাদা এতটাই বেশি ছিল যে, তিনি তার বসদের নির্দেশ অমান্য করেছিলেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে স্ট্যালিনের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্নাইপার হিসাবে বেঁচে থাকবেন।
সূত্র : ওজি