মেইন ম্যেনু

দেহটা আমার, ধর্মের না

যে ধর্ম মেয়েদের সম্পূর্ণ গ্রহণ করতে পারে না, মেয়েদেরও সেই ধর্মকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। ঋতুমতী হলে যদি মেয়েরা অশুচি হয়, তবে ধর্মের পায়ে পড়ার চেয়ে দাপটে সেই অশুচিতা উদ্‌যাপন করা উচিত। (সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়)

শে ষে ফের বিজ্ঞানেরই কাঁধে দায় বর্তাল মেয়েদের ওপর নজরদারি করার। অন্তত প্রয়ার গোপালকৃষ্ণন তা-ই বলছেন। তিনি কেরলে সবরিমালা মন্দিরের দেখভাল ও নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে। সেই মন্দিরে মেয়েদের ঢোকা নিষেধ। আসলে ঋতুমতী মেয়েদের। কিন্তু এক জন মেয়ে যে ঋতুমতী নন, এবং তিনি যে মিথ্যে বলে মন্দিরে ঢুকে দেবতা ও মন্দিরকে ‘অপবিত্র’ করছেন না, তার গ্যারান্টি কী? তাই ছয় থেকে ষাট বছর পর্যন্ত মেয়েদের লট কে লট ওই মন্দিরে ঢোকা নিষেধ। না ঢুকবে মেয়েরা, না থাকবে মন্দির অপবিত্র হওয়ার ঝামেলা। গোপালকৃষ্ণন বলেছেন, যদি কোনও দিন এমন কোনও স্ক্যানার আবিষ্কৃত হয় যাতে একটি মেয়ে ঋতুমতী কি না ধরা যাবে, তা হলে এই মন্দিরে মেয়েদের ঢোকার অনুমতি দেওয়া যাবে— অর্থাৎ স্ক্যানার-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই সীতারা দেবতার কাছে গিয়ে পুজো দিতে পারবেন।

এই ভাবনার বিরুদ্ধে মেয়েরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছেন। ক্যাম্পেন করছেন: ‘#হ্যাপি টু ব্লিড’। এবং মেয়েরা অনেক দিন যে যে দাবি করে আসছেন, সেই দাবিই এ ব্যাপারেও তোলা হচ্ছে— রজঃস্বলা হওয়া কোনও অন্যায় নয়, এটা নিতান্তই একটা স্বাভাবিক জৈব প্রক্রিয়া, এবং রজঃস্বলা অবস্থায় মেয়েরা কোথায় যাবে, তা মেয়েরা স্থির করবে, পুরুষরা নয়। এই তর্ক চলবে আজীবন। যত দিন আমরা পিতৃতন্ত্রের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে না পারব বা পিতৃতন্ত্রকে যথেষ্ট বদলাতে পারব, তত দিন মেয়েদের নিজেদের অধিকার আর সম্মানের জন্য অনেক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই লড়াইটাও তার মধ্যে একটা।

আর এই লড়ার যুক্তি তো ধর্মই মেয়েদের দেয়। কী ভাবে? ধর্ম কথাটার অর্থ, যে ধারণ করে। ধারণ করা মানে নিশ্চয়ই আংশিক নয়, সম্পূর্ণ ধারণ। অথচ, ধর্ম মেয়েদের সম্পূর্ণ ধারণ করতে রাজি নয়। সে ঋতুমতী হওয়ামাত্র ধর্ম তার মুখের ওপর প্রবেশ নিষেধ লেখা বোর্ড টাঙিয়ে দিচ্ছে। এবং এতদ্দ্বারা ধর্মই ধর্মচ্যুত হচ্ছে, ভ্রষ্ট হচ্ছে তার ‘ধারণ’-এর ধর্ম থেকে। এই সত্যটাই মেয়েরা তাকে স্মরণ করিয়ে দিক। সেটাই তাদের লড়াইয়ের যুক্তি।

কেন এই নিষেধাজ্ঞা? ঋতুমতী হলেই এ দেশে মেয়েদের কেন জোটে অশুচিতার তকমা? যে দেহটা তার, সেই দেহ থেকে নিঃসৃত রক্তের জন্যই অন্যের কাছে অশুচিতার দায় তাকে কেন বইতে হয়? সবরিমালা মন্দিরের নিয়মটাই একটু খতিয়ে দেখা যাক। এই মন্দিরে ছ’বছর বয়সের নীচে আর ষাট বছর বয়সের ঊর্ধ্বে মেয়েদের মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকার আছে। কেন? কারণ সেই সময় তাদের প্রজননের সামর্থ্যের উদয় হয় না অথবা অস্তাচলে যায়। সুতরাং তারা পুরুষজাতির পক্ষে নিরাপদ। কথিত আছে, ছয় থেকে ষাট-এর মধ্যবর্তী মেয়েদের দেখলে দেবতা যদি তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, তা হলে দেবতার সংযম নষ্ট হবে, সেই কারণেই এই বয়সের মেয়েদের মন্দিরে প্রবেশ বারণ। অর্থাৎ যত ক্ষণ মেয়েরা প্রজননে সমর্থ, তত ক্ষণ সে ধর্মের পক্ষে, পুরুষের পক্ষে, দেবতার পক্ষে বিপজ্জনক। মানে, ধর্ম তত ক্ষণই মেয়েদের ধারণ করবে, যত ক্ষণ না পিতৃতন্ত্রের গায়ে আঁচ লাগছে।

দেবতাদের অসংযম তো তাঁদের চরিত্রে গ্রথিত। নারী এসে সেই অসংযমকে উসকে দিলে দেবতার অপমান, উচ্চকোটি থেকে পদস্খলন। কিন্তু এই দেবতাকে কে বানিয়েছে? পুরুষই বানিয়েছে তার পরম বা চরম রূপ হিসেবে। সেই দেবতার পদস্খলন মানে পিতৃতন্ত্রের হাত থেকে চূড়ান্ত লাগামটি আলগা হওয়া। তার মানে সমাজে তার কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা। আসলে প্রশ্ন ওঠার ভয়। লাগাম হাতছাড়া হওয়ার ভয়। তাই কর্তৃত্ব আর সংযমের মধ্যে অনবরত চলে একটা চাপা টেনশন। আর তার থেকেই সঞ্জাত হয় চুড়ান্ত ভয়— এই বুঝি পুরুষের সংযম গেল, পুরুষ বেসামাল হয়ে পড়ল, আর এই বুঝি কর্তৃত্বের রাশটা হারালাম। তার চেয়ে বরং মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ থাকুক। ধর্মের এই খেলাটা তো চলছে সেই আদি থেকেই।

কেউ বলতে পারেন, আগেকার কালে ঋতুমতী হওয়ার সময় মেয়েদের ‘অপবিত্র’ বলে সব কাজ থেকে সরিয়ে রেখে দেওয়া হত, তার আসল উদ্দেশ্য ছিল, যাতে মেয়েরা মাসের ওই ক’টা দিন খাটনি থেকে রেহাই পায়। সত্যিই এমন মহৎ উদ্দেশ্যে এই ‘তফাত যাও’ বিধান আবিষ্কার করা হয়েছিল কি না, সে ব্যাপারে ঘোর সন্দেহ আছে। কিন্তু যদি তা মেনেও নিই, তা হলেও বলতে হবে, এটা তো ২০১৫ সাল। এ কালে ঋতুমতী মেয়েরা যদি ঘরের কাজ করতে পারে, অফিস যেতে পারে, মোট বইতে পারে, সাঁতার কাটতে পারে, তা হলে মন্দিরের সিঁড়িই বা ভাঙতে পারবে না কেন, আর পুজোই বা করতে পারবে না কেন?

তাই বলি, এ বার মেয়েদেরও কি একটু ভেবে দেখা দরকার নয় যে, ধর্ম যদি এক জন মানুষকে তার মতো করে সম্পূর্ণ রূপে গ্রহণ করতে না-ই পারে, তা হলে সেই ধর্মে তাদেরই বা কাজ কী? মেয়েদের এই ‘অশুচিতা’ তো তাদের অস্তিত্বের একটা স্বাভাবিক অঙ্গ। এটা না থাকলে তো মেয়েরা সন্তান ধারণ করতে পারত না, তা হলে তো মানুষই থাকত না, মানুষ না থাকলে পুরুষ আর তার দেবতা কার ওপর কর্তৃত্ব ফলাত? তা হলে মেয়েদের এ রকম দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে, ধর্মে অর্ধেক অধিকার দিয়ে, অর্ধেক অস্তিত্ব বহাল রাখা হবে কেন? কোন যুক্তিতে? মেয়েরা তো কোনও খাবার নয়, যে যতটা প্রয়োজন নিলাম আর বাকিটা উচ্ছিষ্ট হিসেবে ফেলে দিলাম! এই বাকিটা নিয়ে মেয়েরা কোথায় যাবে? ঘরে বন্ধ থাকবে, নিজেকে সংকুচিত করে রাখবে আর ভাববে যে এই ‘অশুচিতার’ দায় তার?

আর, মেয়েদের ঢের লড়াই তো এখনও বাকি আছে। শিক্ষার জন্য, স্বাস্থ্যের জন্য, গর্ভপাতের অধিকারের জন্য, উত্তরাধিকারের জন্য, বাড়িতে শৌচালয় তৈরি করানোর জন্য, লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার জন্য, ‘না’ বলতে পারার যৌন স্বাধীনতার জন্য— এ রকম হাজারো ছোট-বড় অধিকারের জন্য তাদের প্রতিনিয়ত প্রতি পদে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। ধর্মের জন্য লড়াইটা বরং এখন থাক। তার চেয়ে মেয়েরা ধর্ম, ঠাকুর, দেবতা— সব না-হয় আপাতত বয়কট করুক। সেটাই হবে ধর্মকে তাদের মোক্ষম জবাব। তারা কেবল ধর্মের জন্য উপোস করবে, খেটে মরবে, পুজোর জোগাড় করবে, আর সবার ওপরে পুরুষরা বসে বাকি জরুরি সিদ্ধান্ত, নীতি তৈরি করবে— সে রকম ধর্মের ধারপাশ দিয়ে না হাঁটাই ভাল। বরং ধর্মের অধিকারের লড়াইয়ের জন্য যে সময়টা খরচ গত, সেই সময়টা অন্যান্য লড়াইয়ে খরচ করা যাক। মেয়েদেরই উন্নতি হবে।

আর তত দিন ধর্ম বরং ভাবুক, সে কতটা উন্নীত হলে মেয়েদের সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারে। সেই সাধনায় মন দিক সে। নিজেকে উন্নত, যোগ্য করে তুলুক। যে দিন ধর্ম মেয়েদের পুরোপুরি মেয়ে হিসেবে ধারণ করতে পারবে, সেই দিন বরং মেয়েরা ধার্মিক হওয়ার কথা ভেবে দেখবে।আনন্দ বাজার