মেইন ম্যেনু

দয়া করে আমাকে চোর বলবেন না

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত : গত সপ্তাহে জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী পশ্চিমবঙ্গে এসে বেশ কয়েক দফা মিটিং করে আশ্বস্ত করে গেছেন কংগ্রেস-সিপিএমের এই জোট ক্ষণস্থায়ী নয়, চিরস্থায়ী। সোনিয়া আর একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ২০১৯ সালে লোকসভায় মোদি-মমতা আঁতাত হঠাতে বামপন্থি নয়, বিভিন্ন রাজ্যের অবিজেপি দলগুলোকে নিয়ে এক প্লাটফর্মে নেমে মোদিকে হঠানোর চেষ্টা করা হবে।

দেশকে সাম্প্রদায়িক শক্তি থেকে বাঁচানোই কংগ্রেসের মূল উদ্দেশ্য। পার্ক সার্কাস ময়দানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পাশে বসিয়ে রাহুল গান্ধী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন ২০১১ সালে মমতার সঙ্গে জোট করাটা ঐতিহাসিক ভুল হয়েছে। কংগ্রেস ভারতের প্রাচীনতম দল। জন্মলগ্ন থেকেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীকে বলিদান দিতে হয়েছে। আর নয়, আমরা ২০১১-তে ভুল করেছি, তার মাশুল পাঁচ বছর ধরে দিতে হয়েছে।

মমতা যে উন্নয়নের কথা বলে প্রচার করছেন, তার ‘উ’ শব্দটাও তিনি বোঝেন না। তিনি বলেন, রাজ্যে রাজ্যে উন্নয়নের যাবতীয় কর্মসূচি ইউপিএ আমলে নেওয়া হয়েছিল। কয়েক হাজার কোটি টাকা মুখ্যমন্ত্রী ক্লাবগুলোর মধ্যে বণ্টন করেছেন। রাজ্যের সাধারণ মানুষ কোনো উপকার পাননি। বলেছিলেন বেকারদের চাকরি দেবেন। কটা চাকরি দিয়েছেন তার হিসাব দিতে হবে। আর তার দাদা নরেন্দ্র মোদি দিল্লিতে বলেছিলেন বছরে এক কোটি লোককে চাকরি দেবেন। দুই বছরে একজনকেও তিনি চাকরি দিতে পারেননি। বৃহস্পতিবারই ছিল ষষ্ঠ দফা ভোটের শেষ প্রচার। ভোট হবে শনিবার। সপ্তম দফার ভোট ৫ মে সীমান্ত জেলা কুচবিহারে। এবারই

প্রথম ছিটমহল থেকে আসা ১৬ হাজার ভোটার ভারতে ভোট দেওয়ার অধিকার পেল। সে জন্য সেখানে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

কংগ্রেস থেকে অভিযোগ করা হয়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ২০১২ সালে ঢাকা সফরে গিয়েছিলেন, তখন মমতার বাধা দেওয়ার ফলেই ঢাকা-নতুন দিল্লির মধ্যে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি হয়নি। ২০১৫ সালে মোদির সঙ্গে মমতা ঢাকায় গিয়ে মোদি-হাসিনা চুক্তির সময় উপস্থিত ছিলেন। মমতা নিজেই বলেছেন বিজেপি তার স্বাভাবিক বন্ধু। এদিকে আজ শনিবারের নির্বাচনে মমতার ভাগ্য পরীক্ষা হবে কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে। তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর স্ত্রী দীপা দাশমুন্সী।

ভবানীপুর থেকে কে জিতবেন এই প্রশ্নে এখন গোটা দেশ তোলপাড়। বামপন্থি দলগুলো দীপার পাশে থেকে প্রচার তুঙ্গে নিয়ে গেছেন। আর মমতার ভয়ে ঘুষকাণ্ডের স্টিং অপারেশনে আরও তিন নেতা-মন্ত্রী পাশাপাশি কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়েছেন। তাই উদ্বিগ্ন মমতা হাতজোড় করে বলছেন, আমার দুই গালে দুটো থাপ্পড় মারুন। দয়া করে আমাকে চোর বলবেন না। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, তার দলের অন্যরা চোর হলেও তিনি নিষ্কলঙ্ক। এদিকে রাজ্যের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জির অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে তার দলের আসন সংখ্যা ১৮০-এরও নিচে নেমে যেতে পারে। ৫ মে পর্যন্ত আগামী দুই দফায় যে ৭৮টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে তাতে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের অঘটন। ভোট হয়ে যাওয়া ২১৬টি আসনেও তার আভাস পাওয়া গেছে। জোট চলে যেতে পারে ১৮০-১৮৫-১৯০ পর্যন্ত। বিরোধী দলনেতা যে ২০০ আসনে পৌঁছে যাওয়ার কথা বলছেন তা অমূলক নয়। সূর্যকান্ত বাবু বলেছেন, ভোট বানচাল করার জন্য বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বুথ দখলের শেষ চেষ্টা করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের সচেতন মানুষই সে চেষ্টা বানচাল করে দিয়েছে।

নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেই হেরে যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই তিনি পাঁচ বছর যে পুলিশকে দিয়ে রাজ্য তছনছ করছিলেন, সেই পুলিশকেও আক্রমণ করতে শুরু করেছেন। গোটা দেশ তাকিয়ে আছে ১৯ মের দিকে। (যেদিন ফল প্রকাশ হবে) ফলাফল কোন দিকে যাবে সেটাই বড় প্রশ্ন। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী যেসব মন্তব্য করছেন তা ছাপার অক্ষরে লেখা যায় না।

অপরদিকে প্রবীণ সাংবাদিক, আনন্দবাজার গোষ্ঠী ও এপিপি চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক অভীক সরকার মনে করেন, ১৯ মের পর মমতাকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেই ঘরে ঢুকে যেতে হবে। তারই টেলিগ্রাফ পত্রিকার সিনিয়র এডিটর তরুণ গাঙ্গুলী বলেন, অনেক নির্বাচন দেখেছি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে রায় দেবেন মানুষ, তা শাসক দলের বিপক্ষে যাবে।

মমতা এবং তার মা-মাটি মানুষের সরকার মনে করে, তারাই আবার গদিতে ফিরে আসবেন। ভাবী মুখ্যমন্ত্রী সূর্যকান্ত মিত্র বলেছেন, ভারতীয় সময় দুপুরের পরই মমতাকে ‘প্রাক্তন’ হয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যেই মানুষ তাদের রায় দিয়েছেন দুর্নীতি, অপশাসন আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। আগামী শনিবার মমতা নিজেই হেরে যাবেন।

পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষ হতাশা কাটিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠন করত বদ্ধপরিকর। ইতিমধ্যে তার বহু প্রমাণ মিলেছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা মনে করেন— মানুষই চুপসে দিল মা-মাটি মানুষ। মমতা কাটিয়ে বঙ্গবাসীর সূর্যযাত্রা শুরু হচ্ছে। -বিডি প্রতিদিন

লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক।