মেইন ম্যেনু

ধর্ষণের আতঙ্কের থেকেও বড় জীবন বাঁচানো, শুনুন এক ধর্ষিতার আত্মকথা…

প্রতি ২২ মিনিটে দেশে একজন করে মহিলা ধর্ষণের শিকার হন। এঁদের মধ্যে অনেককে ধর্ষণের পর প্রাণও খোয়াতে হয়। এমনই এক ঘটনার শিকার এক মহিলা। ৩০ বছর আগের ধর্ষণের আতঙ্ক তাঁর মনের মধ্যে গেঁথে থাকলেও আজও তিনি ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেন বেঁচে থাকার জন্য।

নাম সোহাইলা আবদুলালি। ৩৬ বছর আগে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এই মহিলা। বর্তমানে লেখালেখির কাজ করেন সোহাইলা আবদুলালি। বেশ কয়েকটি উপন্যাসও লিখেছেন। ছোটদের জন্য তাঁর লেখা গল্পের বইও যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু, আজও চোখ বুজলে সেদিনের ঘটনা তাঁকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে। ধর্ষণের শিকার হয়েও মাথা ঠান্ডা রেখে যে ভাবে নিজের ও বন্ধুর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন তাতে আজও ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানান তিনি। কিন্তু, বিচার চাইতে গিয়ে যেভাবে চরম হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল তা তাঁর কাছে আরও বেশি আতঙ্কের বলে মনে করেন সোহাইলা আবদুলালি।

তাঁর মতে, যাঁরা কুমারিত্ব রক্ষা করাটা জীবনের অন্যতম পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করেন তাঁরা তাঁর বক্তব্যে সহমত নাও হতে পারেন। তবে, কুমারিত্ব রক্ষার থেকেও তাঁর কাছে বড় জীবন। সেই কারণেই তিনি আজ বেঁচে আছেন বলে মনে করেন সোহাইলা।

কী হয়েছিল ১৯৮০ সালের এক বিকেলে? মুম্বইয়ের চেম্বুরের বাড়ি থেকে বন্ধু রশিদের সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন সোহাইলা। আচমকাই নির্জন রাস্তায় তাঁদের উপর চড়াও হয় ৪ সশস্ত্র দুষ্কৃতী। ঠেলতে ঠেলতে সোহাইলা এবং রশিদকে নিয়ে যাওয়া হয় এক টিলার উপরে। ২ ঘণ্টা ধরে আটকে রেখে চলে লোহার রড আর শিকল দিয়ে মারধর। সন্ধ্যা নামতেই সোহাইলাকে গণধর্ষণ করে তারা।

ধর্ষণের আগে সোহাইলা প্রথমে গায়ের জোর খাটিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। কাজ না হওয়ায় গালি-গালাজ। এতেও নিস্তার না মেলায় এবার মানবতার পাঠ দিয়েছিলেন দুষ্কৃতীদের। বলেছিলেন মনুষ্যত্বের কথা। এমনকী, এমনও প্রস্তাব দেন, যে তাঁকে এবং তাঁর বন্ধু রশিদকে ছেড়ে দিলে তিনি দুষ্কৃতীদের কাছে ফিরে আসবেন তাঁদের শরীরের খিদে মেটাতে।

মানবতার কথায় কাজ দিয়েছিল। দু’জন সোহাইলাকে ধর্ষণ করা থেকে পিছিয়ে যায়। এরপর দুষ্কৃতীরা সোহাইলা এবং তাঁর বন্ধু রশিদকে ছেড়ে দেয়। বাড়ি ফিরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন সোহাইলা। জ্ঞান ফিরতেই বাবাকে পুলিশে খবর দিতে বলেন। সোহাইলাকে তখন পাগলের মতো তাড়া করছে ধর্ষণের স্মৃতি। অন্তত ১০ বার তাঁকে ধর্ষণ করেছিল দুষ্কৃতীরা। কিন্তু, পুলিশ এসে এমন অবান্তর প্রশ্ন করতে থাকে যে সোহাইলা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

কেন একা একা রশিদের সঙ্গে নির্জন রাস্তায় হাঁটছিলেন সেই নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতে শুরু করে পুলিশ। কেন ধর্ষণকারীদের তিনি বাধা দেননি— সেই প্রশ্নও করে। কিন্তু, সোহাইলা সাফ জানান, বেশি জোর করলে রশিদ এবং তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারত। জুভেনাইল বোর্ডের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সোহাইলা। তাঁদের সদস্যরা এসে সোহাইলাকে উল্টে প্রশ্ন করে বসেন, রশিদের সঙ্গে তাঁর প্রেম ছিল কি না? কী মনে করে তাঁরা নির্জন রাস্তায় হাঁটছিলেন? রশিদের শরীরে বাইরে থেকে কেন মারধরের চিহ্ন নেই? সোহাইলা জানিয়েছিলেন, রশিদকে চেন দিয়ে তলপেটে এবং পাকস্থলীতে মারা হয়েছিল।

এতে ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছিল। রশিদ দুষ্কৃতীদের সঙ্গে মারপিট করতে গেলে তাঁদের প্রাণ খোয়াতে হত বলেও জানান সোহাইল। কিন্তু, জুভেনাইল বোর্ড বা পুলিশ কেউই সোহাইলাদের বয়ানে খুশি হয়নি। শেষমেশ দুষ্কৃতীদের খোঁজা ছেড়ে দিয়ে পুলিশ একটি জেনারেল ডায়রি নেয়। তাতে লেখা হয়, এক কিশোর এবং কিশোরী বেড়াতে বেরিয়ে কিছু সময় নিখোঁজ ছিলেন। অভিযোগ করা হয়েছে ধর্ষণের।

অভিযুক্তরা কিন্তু ধরা পড়েনি। আজও রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আতঙ্কে থাকেন সোহাইলা। কিন্তু, ভাগ্যকে একটাই কারণ‌ে ধন্যবাদ দেন যে, সেদিন উপস্থিত বুদ্ধি না খাটালে তিনি এবং তাঁর বন্ধু হয়তো আজ বেঁচে থাকতেন না। সোহাইলা এখনও বলেন, ধর্ষণের থেকেও ভয়ঙ্কর দেশের আইন। যেখানে মহিলাদের সহজে সাহায্য মেলে না।