মেইন ম্যেনু

ধর্ষণ: নারী-শিশুর জন্য স্বজনরাই বেশি ভয়ঙ্কর!

বাংলাদেশে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই সংঘটিত হচ্ছে প্রতিবেশী ও স্বজনদের মাধ্যমে। এরপরের অবস্থানে সমাজ কিংবা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তৃতীয় অবস্থানে আছে সরকারি চাকরিজীবী। জাতীয় নারী পরিষদের সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

অন্যদিকে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘অধিকার’ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত ৮ বছর ৪ মাসে (২০০৭ জানুয়ারি থেকে ২০১৫ এপ্রিল) দেশে ৫ হাজার ৮২ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৭৩৬ জন। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর থেকেও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সব ধর্ষণের ঘটনায় থানায় অভিযোগ হয় না। কিংবা গণমাধ্যমেও আসে না।

পৃথিবীর প্রাচীনতম অপরাধগুলোর মধ্যে ধর্ষণ একটি। বর্তমানেও দেশে আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে ধর্ষণের ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে খোদ রাজধানীতে বেশ কয়েকটি গণধর্ষণের ঘটনা জনমনে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বাড্ডায় মাইক্রোবাসে গাড়ো তরুণীকে গণধর্ষণের পরপরই গেল ঈদের পরদিন পুরান ঢাকার লালবাগে প্রমিকের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর উত্তরায় সহকর্মীরা গণধর্ষণ করে এক বিক্রয়কর্মীকে।

গত ২৮ জুলাই রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় পাঁচ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। আর ধর্ষক ছিল ওই শিশুরই চাচাতো ভাই বাসিরুল ইসলাম। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় যশোরে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে প্রতিবেশী মারফুল শেখ জোরপূর্বক বাঁশবাগানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। পরে ভিকটিমের চাচা সুজন ও প্রতিবেশী জুয়েল, সুমন, মুকুলসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করে ও মারফুলকে আটক করে।

এদিকে জাতীয় নারী পরিষদের উদ্যোগে সর্বশেষ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মধ্যে ৪৯ শতাংশই ঘটে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে, ৩০ শতাংশ হচ্ছে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে, ১১ শতাংশ ধর্ষণকারী সরকারি চাকরিজীবী আর অভিভাবকদের মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে ১০ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা।

জাতীয় নারী পরিষদের গবেষণা প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, ধর্ষিতাদের মধ্যে ৩১ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এরপরই রয়েছে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সের মেয়েরা।

‘অধিকার’র দেয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৮২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিবছর ৬০৫ জন, প্রতি মাসে ৫০ জন এবং দৈনিক একজনেরও বেশি নারী কিংবা শিশু দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

গণধর্ষণ সম্পর্কিত ‘অধিকার’র দেয়া আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত ৮ বছর ৪ মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৭৩৬ জন নারী/শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই হিসাবে বছরে ২০৭ জন, মাসে ১৭ জন এবং প্রতি দু’দিনে একজন (দৈনিক হিসাবে ০.৫৭ জন) নারী কিংবা শিশু গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

পরিসংখ্যান থেকে আরো জানা যায়, ধর্ষিতাদের মধ্যে নারী ২ হাজার ৬২ জন, শিশু ২ হাজার ৯১৩। আর বয়স জানা যায়নি ১০৭ জনের। এই সময়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৪৫ জন নারী ও ৭৪০ জন শিশু। বয়স জানা যায়নি ৫১ জনের। ওই একই সমেয় (৮ বছর ৪ মাস) ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৮৭ জন নারী ও শিশুকে। আর ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ৬৮ জন নারী ও শিশু।

অ্যাডভোকেট এলিনা খান এ প্রসঙ্গে জানান, বেশিরভাগ ধর্ষণের ঘটনায় অসামিদের শাস্তি না হওয়ার কারণেই মূলত দেশে ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার মতে ধর্ষণের মামলাগুলোর তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা, আসামি ধরার পরও এবং সব ধরনের আলামত ও তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও দেখা যায় পুলিশ চার্জশিট দিতে কালক্ষেপণ করে। রহস্যজনক কারণে ধর্ষণের মামলাগুলোর তদন্তে তদন্তকারী সংস্থাগুলো খুব বেশি আগ্রহ না দেখানোর কারণেই শাস্তির বাইরে থেকে যায় অপরাধীরা। এক সময় জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো অপরাধিরা একই ঘটনা ঘটায়।