মেইন ম্যেনু

ধারাবাহিক হামলায় পুলিশ পরিবারে ‘দুশ্চিন্তা’

পুলিশ সদস্যের পর তাদের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনায় এই বাহিনীর সদস্য-কর্মকর্তারা এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাদের ধারণা, সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে পুলিশের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, তাদের পরিবারের সদস্যরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। কারণ বিভিন্ন সময় পুলিশকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়। তাই তারা কর্মক্ষেত্র থেকে যতক্ষণ বাসায় না ফেরেন, ততক্ষণ পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার মধ্যেই সময় কাটে। পুলিশ সদস্যদের পর তাদের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনায় তাদের এই দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের দেওয়া এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরে (২০১৫) দুর্বৃত্ত ও জঙ্গিদের হামলায় ৪ পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। নিহতরা সবাই মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্য। তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে।

অন্য একটি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১৫-তে সন্ত্রাসী হামলাসহ বিভিন্নভাবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ৫৭ পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। এর আগের বছরেও মারা যান ১০৭ জন পুলিশ সদস্য। সার্বিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গিদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারে সদস্যরা। যারা নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেন, তারাই এখন অনিরাপদ হওয়ায় অস্বস্তিতে পড়েছে খোদ পুলিশ বাহিনী। তবে এসব ঘটনায় পুলিশের মনোবলের কোনও চিড় ধরছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সদর দফতরের কর্মকর্তারা।

রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রামে বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানমকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছেন দুর্বৃত্তরা। ছেলেকে স্কুলের বাসে তুলে দেওয়ার জন্য তিনি জিইসি মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত তাকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে পালিয়ে যান।

রমজানকে সামনে রেখে যখন সারাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার করা হয়েছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রামে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন দুর্বৃত্তরা।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘জঙ্গিরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অধিকতর তদন্ত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

চট্টগ্রামে এসপি বাবুলের স্ত্রীকে হত্যার পর রাজধানীতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল ও চেকপোস্ট।

টহলে দায়িত্বরত পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মধ্যে যতটা না দুশ্চিন্তা ভর করেছে, তারও বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর মৎস্য ভবন মোড়ে পুলিশ বহনকারী একটি বাসে বোমা হামলা চালান দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় কনস্টেবল শামীমসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। ১৯ দিন স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৫ ফেব্রুয়ারি কনস্টেবল শামীমের মৃত্যু হয়।

একই বছরের ৪ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদী থানাধীন পাকশী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত এএসআই মো. সুজাউল ইসলামকে মোবাইলফোনে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত করেন দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকালে সুজার লাশ উদ্ধার করা হয়।

ওই বছরে ২২ অক্টোবর গাবতলীর দারুসসালাম থানাধীন পর্বত সিনেমা হলের সামনে চেকপোস্টে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ইব্রাহিম মোল্লা।

গত বছরের ৪ নভেম্বর সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আশুলিয়ার বাড়ৈপাড়া এলাকায় নন্দনপার্কের ঠিক উল্টোপাশে চেকপোস্টে প্রস্তুতিকালে দুর্বৃত্তদের চাপাতি কোপে নিহত হন কনস্টেবল মুকুল হোসেন)। এ সময় কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা করা হয় আরেক কনস্টেবল নুরে আলমকে।

ঘটনার ১০ গজ দূরে পুলিশের আরও ৩ সদস্য অস্ত্র নিয়ে থাকলেও এগিয়ে এসে সহকর্মীকে রক্ষা না করে উল্টো পেছনে শালবনের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

এসব হত্যাকাণ্ডের পর কোনও কোনওটির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করে।

গত বছরের ১০ নভেম্বর ঢাকায় মিলিটারি পুলিশের ওপর হামলা হয়। এ সময় একজন মিলিটারি পুলিশ আহত হয়। ঢাকা সেনানিবাসের প্রবেশ মুখে চেকপোস্টে দায়িত্বপালনকারী মিলিটারি পুলিশের সদস্য ল্যান্স করপোরাল সামিদুল ইসলামকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কুপিয়ে জখম করেন এক দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় হামলাকারী জামিরুল ইসলাম মানিককে গ্রেফতার করা হয়। গতবছর জুড়েই ছিল পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর আসাদগেটে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) জানান, ঝুঁকি জেনেই এই পেশায় এসেছি। নিজেরা যত চিন্তা করি, তারও বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন পরিবারের সদস্যরা।

ঢাকা মহানগরীতে জঙ্গি প্রতিরোধে কাজ করে গোয়েন্দা পুলিশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী কমিশনার বলেন, ‘জঙ্গি নিয়ে কাজ করা ঝুঁকি। কারণ এটা দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। নানামুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। জঙ্গিরা সব সময় মরণ কামড় দিতে চান। তারা টার্গেট করে মানুষ হত্যা করেন। তাদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সবচেয়ে বেশি কাজ করে যাচ্ছে। তাই জঙ্গিদের ক্ষোভ পুলিশের ওপর।’

এদিকে, চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী খুন হওয়ার পর সারাদেশের পুলিশ সদস্যদের যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। যেসব পুলিশ সদস্য জঙ্গিবিরোধী অভিযানে কাজ করেন, তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (ক্রাইম) মো. হুমায়ুন কবির বরেন, ‘আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে জনগণকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’বাংলা ট্রিবিউন