মেইন ম্যেনু

নগর পিতা ট্রেড লাইসেন্সের দূর্ণীতি কমান, ৫শ’ টাকার ট্রেড লাইসেন্স ৫ হাজার টাকায়

ডা. শোভন দাশ : প্রিয় নগরপিতা, ৬০ লাখ জনঅধ্যুষিত চট্টগ্রাম নগরীতে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল আপনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ৬ মে ঢাকায় শপথ গ্রহণ এবং ২৬ জুলাই চসিক মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তথা নগর পিতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সেই থেকে আপনি আ জ ম নাছির উদ্দীন চট্টলাবাসীর অভিভাবক হিসেবেই আখ্যায়িত হয়েছেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনি দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা দিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনের শততম দিবস ৩০ নভেম্বরও সংবাদ সম্মেলনে আপনার কণ্ঠে ছিল সেই ঘোষণায় অবিচল থাকার প্রত্যয়। একজন নগরপিতা হিসেবে ৪১টি ওয়ার্ডের জনগণের অভিভাবক আপনি। জনগণের আশা-ভরসার প্রধান ঠিকানাও আপনি। তাই আপনার কাছে চাওয়া-পাওয়া একটু বেশিই থাকবে জনগণের।

বৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স করা বাধ্যতামূলক। বিগত দুইজন সাবেক মেয়রের আমলে এই ট্রেড লাইসেন্সের ফি বাড়ানো হয়নি। কিন্তু বর্তমান সময়ে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু এবং নবায়ন ফি অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। ফলে বিশেষ করে খুচরা ওষুধ ব্যবসায়ী, হোমিও চিকিৎসক যারা অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করছেন, তাদের মাথায় এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বিগত বছরের মার্চে কোম্পানী, ব্যাংক, বীমা থেকে শুরু করে সব ধরণের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ফি বাড়ানোর সময় আদর্শ কর তফসিল ২০১৫ জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বেশিরভাগ লোকই ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করে থাকেন। ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি প্রতি বছর জমিদারদের ভাড়া বাড়ানোর যন্ত্রণা, বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি চাপ, ওষুধ আমদানিকারক, মজুদদার, পাইকারী ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্রতিযোগিতায় পড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।

একজন হোমিও চিকিৎসক ওষুধের দামসহ ফি হিসেবে বিশ-পঞ্চাশ টাকা নেন রোগীদের কাছ থেকে। আবার অনেক চিকিৎসক রয়েছেন যারা বিনামূল্যেও এই হোমিও চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন দুঃস্থ-অনাথ-গরীব রোগীদের। এর বিনিময়ে তাঁরা সামাজিক-রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান না। এলোপ্যাথি চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় গরীব-দুঃস্থ রোগীদের ভরসা স্থল হোমিও চিকিৎসা। এলোপ্যাথি চিকিৎসায় ল্যাব টেস্ট, চিকিৎসকের ফি, ওষুধের দাম মেটাতেই রোগীদের হিমসিম খেতে হয়। অথচ হোমিও চিকিৎসার উন্নয়নে তেমন সরকারি পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। হোমিও চিকিৎসা পেশায় যারা আসেন তাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এই পেশায় এসে ট্রেড লাইসেন্স তৈরী এবং এটি নবায়নের অনৈতিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একজন হোমিও চিকিৎসক ও খুচরা ওষুধ ব্যবসায়ীকে প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে বিড়ম্বনা। এতে অনেকে এই পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

১৯৮৬ সালের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন বিধিমালার ৪৪ (১) বিধি অনুসারে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতে অবশ্যই ট্রেড লাইসেন্সে নিতে হবে। সিটি কর্পোরেশন এর মতো পৌরসভা, উপজেলা-জেলা-ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করা যায়। তিন-সাত কর্মদিবসের মধ্যে লাইসেন্স প্রদানের কথা বলা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছোট হলে ‘আই’ ফরম, আর বড় হলে ‘কে’ ফরম। প্রতিটা ফরমের দাম দশ টাকা। সাধারণত লাইসেন্স ফি সর্বনিম্ন ২শ’ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৬ হাজার টাকার মতো প্রায়। সাইনবোর্ডের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে। এক বছর মেয়াদে প্রতিটা লাইসেন্স দেওয়া হয় এবং প্রতি বছর নবায়ন করতে হয় মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে। পূর্বে ট্রেড লাইসেন্সের ১৩৩টি শ্রেণি নির্ধারিত ছিল, বর্তমানে এর ক্যাটাগরির সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯৯টি করা হয়েছে। এর উপশ্রেণিও বাড়ানো হয়েছে। গত ২০১০ সালের জুন থেকে এনবিআর এর জারি করা প্রজ্ঞাপনে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এই ট্রেড লাইসেন্স বাংলাদেশ সরকারের সিটি কর্পোরেশন কর বিধান ১৯৮২ (City Corporation Taxation Rules, ১৯৮২) এর অধিনে ইস্যু করা হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অধ্যাদেশ ১৯৮২ইং এর ৬৮নং বিধির প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার প্রণীত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আদর্শ কর তফসিল ২০০৪-এর ৬নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পেশা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবিকা বৃত্তির উপর কর আদায়ের লক্ষ্যে ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। ফরম ‘ও’ তে ১৪টি শর্তাবলি রয়েছে প্রতিপালনীয় ট্রেড লাইসেন্স গ্রহীতার জন্য।

সাধারণত ট্রেড লাইসেন্সের জন্য ভাড়ার রশিদ বা চুক্তিপত্রের সত্যায়িত কপি, হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের কপি, শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস, পরিবেশ সংক্রান্ত অনাপত্তি পত্র, প্রতিষ্ঠানের মানচিত্র, অগ্নিনির্বাপণ প্রস্তুতি সংক্রান্ত প্রত্যয়ন পত্র, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিসিসি’র নিয়মাবলি মেনে চলা হবে-এ শর্তে ১৫০টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারপত্র, এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন, ছাপাখানা ও আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি, রিক্রুটিং এজেন্সির ক্ষেত্রে মানবসম্পদ রপ্তানি ব্যুরো কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্স, অস্ত্র ও গোলাবারুদের ক্ষেত্রে অস্ত্রের লাইসেন্স, ওষুধ ও মাদকদ্রব্যের ক্ষেত্রে ড্রাগ লাইসেন্সের কপি, ট্রাভেলিং এজেন্সির জন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং হোমিও ফার্মেসীর ক্ষেত্রে ড্রাগ লাইসেন্স এর কপি, ঘর ভাড়ার রশিদ অথবা জায়গার দলিল, জাতীয় পরিচয় পত্রের কপি, পাসপোর্ট ছবি, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে টিন সার্টিফিকেট, মেমোরেন্ডাম অব  আর্টিকেলস এবং শুধুমাত্র চিকিৎসক হলে ডিএইচএমএস এবং রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট কপির প্রয়োজন হয়।

একজন হোমিও চিকিৎসকের এক বছরের ফি ৫শ’ টাকা, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়নের উপর ৫২ ‘কে’ ধারায় উৎসে অগ্রিম আয়কর ট্রেজারী চালান ‘এ’ কোড ১-১১৪১-০০৪৫-০১১১ এবং এর উপর ১৫% হারে মূল্য সংযোজন কর ৭৫ টাকা টেজারী চালান কোড ১-১১৩৩-০০২৫-০৩১১ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ/সোনালী ব্যাংক শাখায় জমা দেওয়া যায়। কিন্তু এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ৫৭৫ টাকা ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ফি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসারের চাহিদা অনুযায়ী বাড়তি আরো পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ঠিক থাকার পরও বাড়তি তিন হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত এ টাকা না দিলে টেক্স অফিসাররা লাইসেন্স গ্রহীতাদেরকে বিভিন্ন রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যেতে হবে, আর্টিকেল অব মেমোরেন্ডাম জমা দিতে হবে-ইত্যাকার বিভিন্ন প্রকার তদন্তে যাওয়ার নামে করা হচ্ছে হয়রানী। উপরন্তু টেক্স অফিসারের চাহিদা মোতাবেক বাড়তি টাকা দিলে সহজেই মিলবে লাইসেন্স। ফলে ৫শ’ টাকার ট্রেড লাইসেন্স নিতে একজন হোমিও চিকিৎসককে গুণতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা চালানো হলেও ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তিকে ঘিরে যে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির মহোৎসব চলছে, তা রোধে একমাত্র কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। আপনিই পারেন এই যন্ত্রণা থেকে সেবা গ্রহীতাদের রেহাই দিতে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও চিকিৎসক
[email protected]


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি এবং আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)