মেইন ম্যেনু

নগ্ন থাকে, মৃতদেহ খায় তারপরও হিন্দুরা কেন এদের পূজা করে জানলে অবাক হবেন…

ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গে অঘোরী সম্প্রদায় মোটেও পরিত্যাজ্য নয়। উল্টে বিরল সম্মান পেয়ে থাকেন অঘোরীরা। এখানেই প্রশ্ন জাগে— ঠিক কী কাজ করছে এই সম্ভ্রমের পিছনে?

‘অঘোরী’ শব্দটি শুনলেই অনেকে আঁতকে ওঠেন। কালো পোশাকে আচ্ছাদিত, জটাজুটধারী এই সন্ন্যাসীরা এমন কিছু আচারে বিশ্বাসী, যা শুনলে তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজের সদস্যরা শিউরে উঠতে বাধ্য। প্রথমত তাঁরা শ্মশানচারী, তার উপরে তাঁরা সর্বাঙ্গে চিতাভস্ম মেখে থাকেন। প্রায়শই নগ্ন অঘোরী সাধুদের দর্শন পাওয়া যায়। সর্বোপরি তাঁদের খাদ্যাখাদ্যভেদ একেবারেই নেই। এমনকী অঘোরীরা মৃতদেহ খেতেও অভ্যস্ত। এই ভয়াবহ বর্ণনা স্বাভাবিকভাবেই গৃহীজীবনে শঙ্কার হিল্লোল তোলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গে অঘোরী সম্প্রদায় মোটেও পরিত্যাজ্য নয়। উল্টে বিরল সম্মান পেয়ে থাকেন অঘোরীরা। এখানেই প্রশ্ন জাগে— ঠিক কী কাজ করছে এই সম্ভ্রমের পিছনে?

উত্তর খুঁজতে গেলে প্রবেশ করতে হবে এমন কিছু প্রসঙ্গে, যা সাধারণত আলোচনাবৃত্তে আসে না।

• প্রথমেই ভাবতে হয় ‘অঘোরী’ শব্দটিকে নিয়ে। এই শব্দের উৎসে রয়েছে ‘অঘোর’ শব্দটি। এর অর্থ অন্ধকারের বিলয়। আবার এই শব্দটি ভয়হীনতাকেও বোঝায়।

• কিন্তু মজার ব্যাপার এই— অঘোরীদের বেশিরভাগ আচারই সাধারণ মানুষের ভীতি উদ্রেককারী। অঘোরীরা বিশ্বাস করেন শিবের বৈনাশিক রূপে। এক তীব্র শৈব ভাবনা থেকে তাঁরা শিবানুসারী জীবনযাপনে উদ্যোগী হন। শ্মশানবাস তার মধ্যে প্রধান।

• নরকপাল সঙ্গে রাখা, চিতাভস্ম গায়ে মাখা, পচা, নোংরা খাবারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা বস্তুতপক্ষে ইন্দ্রিয়জয়েরই একটি দিক।

• অঘোরী সাধুরা মৃতদেহ ভক্ষণ, মূত্রপান ইত্যাদি অভ্যাস করেন। ১৭ শতকের সন্ন্যাসী বাবা কিনারামের সূত্রেই এই আচারগুলি অঘোরীদের কাল্টে প্রবেশ করেছে বলে জানা যায়।

• এর বাইরে অঘোরীরা নিয়মিত শবসাধনা করে থাকেন। মৃতদেহ থেকে হাড় ছাড়িয়ে তা নিজেদের শরীরে ধারণ করেন, সঙ্গে রাখেন।

• নরকপাল তাঁদের কাছে একান্ত প্রয়োজনীয় এক সামগ্রী। এটিকে অনেক সময়েই তাঁরা পানপাত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

• অঘোরীদের এই আচারগুলির পিছনে সবথেকে বড় যুক্তিটি হল, কত কম উপকরণে জীবনধারণ করা যায়, তার অভ্যাস রাখা। এই যুক্তিতে তাঁরা প্রায়শই নগ্ন থাকেন। নগ্নতার সপক্ষে আর একটি যুক্তি হল এই— প্রকৃতি থেকে দূরে সরতে রাজি নন তাঁরা।

• মদ্যপান, গঞ্জিকা সেবন ইত্যাদিকে অঘোরীরা সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করেন।

• অঘোরীদের এই অদ্ভুত আচরণ তাঁদের সম্পর্কে বিস্তর কিংবন্তির জন্ম দিয়েছে। অনেকেরই বিশ্বাস, অঘোরীরা কালো জাদুতে পারদর্শী। অথবা তাঁদের অতিলৌকিক ক্ষমতা বর্তমান।

• আসলে কোনও অতিলৌকিকতা প্রদর্শন অঘোরীদের লক্ষ্য নয়। তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য মোক্ষলাভ, অর্থাৎ জীবন ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিলাভ। বলাই বাহুল্য, এই লক্ষ্য ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গের সকলেরই। এইখানেই অঘোরীরা ভারতীয় সন্ন্যাস পরম্পরার সঙ্গে একাত্ম। কোনও তর্ক কখনওই ওঠে না অঘোরীদের সাধন-উদ্দেশ্য নিয়ে।

• মধ্যযুগীয় কাশ্মীরী কাপালিকতন্ত্র থেকেই অঘোরীদের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। এঁদের প্রাচীন নাম ‘কালমুখ’। তাছাড়া কিনারামের ঐতিহ্যের কথা সব অঘোরীই স্বীকার করেন।

• একহিসেবে দেখলে অঘোরীরা শক্তি আরাধক। কালী বা তারার উপাসনাই তাঁরা করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের আদর্শ শিবত্ব। এই জায়গায় মূলধারার শাক্ত তান্ত্রিকদের সঙ্গে তাঁরা সহমত। তাঁদের আরাধ্য পুরুষ দেবতাদের মধ্যে শিব ছাড়াও কালভৈরব, মহাকাল, বীরভদ্র প্রমুখ রয়েছেন।

• এমনিতে অঘোরীরা মুক্তপুরুষ। কোনও বন্ধনেই তাঁরা আবদ্ধ নন। কোনও ভেদ-দর্শনে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। এমনকী পবিত্রতা-অপবিত্রতার ভেদরেখাও তাঁরা মানেন না।

• যে কোনও বস্তুতেই ঈশ্বর রয়েছেন— এটা অঘোরীদের নিশ্চিত বিশ্বাস। এই সর্বেশ্বরবাদ তাঁদের মধ্যে অনুপম মাধুর্যের জন্ম দেয়।

• সাধারণ মানুষের সঙ্গে অঘোরীরা কখনওই খারাপ ব্যবহার করেন না। তাঁদের দূরে সরিয়েও রাখেন না। কাশীতে তাঁদের মূল সাধনক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত সদাশয়। বহুপ্রকার ভেজ ও জৈব ওষুধের জ্ঞান তাঁদের করায়ত্ত। বিপন্ন মানুষকে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে তাঁরা দ্বিধাবোধ করেন না। সর্বোপরি, অঘোরীরা একান্তভাবেই নির্বিরোধী এক সম্প্রদায়। তাই আপাত-বীভৎসতাগুলিকে মাথায় রাখেন না সাধারণ মানুষ। অঘোরীরা পূজিত হন সর্বত্রই।