মেইন ম্যেনু

নতুন নেতৃত্বে নতুন নামে সক্রিয় আনসারুল্লাহ

আল-কায়েদার বাংলাদেশ শাখা দাবি করে ব্লগার হত্যার দায় স্বীকারকারী ‘আনসার আল ইসলাম’ হচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমেরই নতুন নাম। নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয়ে এই জঙ্গি সংগঠন আবার সক্রিয় হয়েছে।

শুধু ব্লগার হত্যা নয়, তারা চাকরিচ্যুত ও পলাতক একজন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে নাশকতার পরিকল্পনাও করছে। সম্প্রতি ঢাকায় সংগঠনটির তিনটি আস্তানা থেকে উদ্ধার করা বিপুল বিস্ফোরক ও বিভিন্ন ধরনের বোমা এবং তাদের কাগজপত্র থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন আলামত পেয়েছে। এর আগে কখনো এই গোষ্ঠীর কাছে বোমা-বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।

২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এত দিন এ দেশে আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসারীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছিল। শুরুতে এই গোষ্ঠীটি পাঠচক্র ও ইন্টারনেটে প্রচারে যুক্ত ছিল। ২০১৩ সাল থেকে সংগঠনটি ব্লগার হত্যায় নামে। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্লবীতে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ গোষ্ঠীটি প্রথম আলোচনায় আসে। পরে তারা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে (স্লিপার সেল) সক্রিয় হয়। এবং এ পর্যন্ত নয়জন ব্লগার, প্রকাশক ও ছাত্র-শিক্ষককে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। গত বছরের ২৫ মে আনসারুল্লাহকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।

সংগঠনটির ওপর নজরদারি এবং এর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আনসারুল্লাহ শুরু থেকেই আল-কায়েদার নীতি-কৌশলকে অনুসরণ করে আসছে। শুরুতে আল-কায়েদা আরব উপদ্বীপের প্রয়াত নেতা ইয়েমেনের আনোয়ার আওলাকিকে আধ্যাত্মিক নেতা মানত। গত বছর আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কনটিনেন্ট বা একিউআইএসের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে আধ্যাত্মিক নেতা মানছে আয়মান-আল জাওয়াহিরিকে।

শুরুতে সংগঠনটির প্রধান ও তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানী। ২০১৩ সালে ৪০ সহযোগীসহ বরগুনায় গ্রেপ্তার হন তিনি।

এরপর আসনারুল্লাহর পরিচালনায় যুক্ত হন এজাজ হোসেন ওরফে সাজ্জাদ ওরফে কারগিল। তিনি আগে জামাআতুল মুসলেমিনের নেতা ছিলেন। তাঁর বাসা ঢাকার কলাবাগানে। দেশে জঙ্গিবিরোধী ধরপাকড়ের পর তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তানে থেকে আনসারুল্লাহকে ইন্টারনেটভিত্তিক নানা সহযোগিতা দেন। তিনি একই সঙ্গে আল-কায়েদার একিউআইএসে যুক্ত হন।

বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কারও কারও ধারণা, এজাজের মাধ্যমে একিউআইএসের সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পরে আনসারুল্লাহ আল-কায়েদার শাখা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এর খবর অনুযায়ী, গত বছরের ৯ জানুয়ারি করাচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে এক বন্দুকযুদ্ধে এজাজসহ আল-কায়েদার চার জঙ্গি নিহত হয়। ওই খবরে এজাজ ওরফে সাজ্জাদকে একিউআইএসের কমান্ডার বলে উল্লেখ করা হয়।

* ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে পেয়েছে আল-কায়েদায় স্বীকৃতি * সামরিক শাখার প্রধান পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তা

পরে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত গোয়েন্দারা এজাজ নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত হন। এজাজের মৃত্যুর পরে আনসারুল্লাহ নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয়। জসীমুদ্দিন রাহমানীর স্থলে তাত্ত্বিক নেতা হন পুরান ঢাকার ফরিদাবাদের এক মাদ্রাসা শিক্ষক। আর সামরিক শাখার নেতৃত্বে আসেন মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক। তিনি ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানে প্ররোচনা চালিয়ে ব্যর্থ হন। এরপর থেকে পলাতক। তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

ওয়াকিবহাল একটি সূত্র জানায়, মেজর জিয়া আগে থেকেই উগ্রগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানী গ্রেপ্তার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ধরা পড়ার আগে তিনি একাধিকবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, জিয়া এই জঙ্গিগোষ্ঠীর সামরিক শাখার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি ব্লগার হত্যা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলা এত বেশি নিখুঁতভাবে হয় যে ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, নতুন নেতৃত্ব আসার পর আনসারুল্লাহ ‘আনসার আল ইসলাম’ নাম ধারণ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, আনসারুল্লাহ নতুন নেতৃত্বে এখন আনসার আল ইসলাম নামে তৎপরতা চালানোর বিষয়টি তাঁরা অবগত আছেন। তিনি বলেন, ‘এটা নতুন বোতলে পুরোনো মদ’।

গত বছর গ্রেপ্তার হওয়া আনসারুল্লাহর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে যুক্ত ছিলেন এমন একাধিক কর্মকর্তা গত বছরের জুনে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, তখন আনসারুল্লাহর লক্ষ্য ছিল প্রতি মাসে অন্তত একজন ‘ইসলামবিরোধী’ (তাদের বিবেচনায়) ব্যক্তিকে হত্যা করা। ২০১৬ সালে এসে সংগঠনটি ব্লগার হত্যার পাশাপাশি বড় নাশকতার পরিকল্পনাও শুরু করে, যা জঙ্গি দমন-সংক্রান্ত কর্মকর্তারা টের পান গত ফেব্রুয়ারিতে। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বাড্ডা ও মোহাম্মদপুরে এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি উত্তরার দক্ষিণখানে আনসার আল ইসলামের তিনটি আস্তানার সন্ধান পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসব আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ বোমা তৈরির উপাদান, নিজস্ব প্রযুক্তিতে হাতে তৈরি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনটির বেশ কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। যার মাধ্যমে জানা যায়, সংগঠনটি আনসার আল ইসলাম নাম ধারণ করেছে। পলাতক ও বহিষ্কৃত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল হক যে এর সামরিক প্রধান, এ ব্যাপারেও তথ্য মেলে।

বোমা নিষ্ক্রিয় দলের একজন কর্মকর্তা জানান, মোহাম্মদপুরের আস্তানায় কিছু বোমা পাওয়া গেছে ৫ থেকে ৬ কেজি ওজনের, যা দিয়ে বড় ভবন উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া আত্মঘাতী বেল্ট ও টেনিস বল আকৃতির হাতে তৈরি গ্রেনেডসহ পাঁচ ধরনের বোমা পাওয়া গেছে। এ থেকে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, আনসার আল ইসলাম শুধু ব্লগার হত্যা নয়, আরও বড় নাশকতার দিকে এগোচ্ছে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, বাড্ডার জঙ্গি আস্তানাটি মূলত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের হেডকোয়ার্টার্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। আর মোহাম্মাদপুরের বাসাটি তাদের বোমা তৈরির কারখানা।

এদিকে আনসার আল ইসলামের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ইন্টারনেটে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বিভিন্ন ওয়েব পেইজ চালু থাকছে। এরই মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম গত ৩১ ডিসেম্বর ইন্টারনেটে আল-কায়েদার প্রচারযন্ত্র গ্লোবাল ইসলামিক মিডিয়া ফ্রন্টের (জিআইএমএফ) অধিভুক্ত হয়েছে বলে খবর দিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠীর ইন্টারনেটভিত্তিক তৎপরতা নজরদারিতে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। তাতে বলা হয়, এখন আনসারুল্লাহর প্রচারযন্ত্রের নাম হয়েছে ‘জিআইএমএফ বাংলা টিম’।

সাইটের ওয়েবসাইটে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ সম্প্রতি ‘জিআইএমএফ বাংলা টিমের’ তৈরি একটি তালিকাও (টাইমলাইন) প্রকাশ করে। তাতে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাঁদের ভাষায় ‘ধর্মদ্রোহীদের’ ওপর ১১টি হামলার বর্ণনা দেওয়া হয়। এতে আটজনকে হত্যা ও পাঁচজনকে আহত করার দায় স্বীকার করা হয়।

সর্বশেষ গত বুধবার রাতে পুরান ঢাকায় নাজিম উদ্দিন হত্যার দায়ও স্বীকার করেছে একিউআইএস। তাতে বলা হয়, তাদের বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলাম এটা করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের জঙ্গি দমন-সংক্রান্ত সেলের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, নাজিম হত্যায়ও আনসারুল্লাহ বা আনসার আল ইসলাম প্রধান সন্দেহভাজন। কিন্তু এ দেশে আল-কায়েদার কোনো শাখা আছে, এমন তথ্যপ্রমাণ এখনো তাঁরা পাননি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিম হত্যায় আল-কায়েদার দায় স্বীকার নিয়ে গতকাল চট্টগ্রামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকেরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্তের আগে এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। অনেকে দায় স্বীকার করে। আবার আমাদের তদন্তে অন্য কিছু বের হয়ে আসে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে নিরাপত্তা বাহিনী ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত গোয়েন্দারা। প্রায় সব কটি বিচারাধীন রয়েছে। খুন করে কেউ পার পাবে না। প্রথম আলো