মেইন ম্যেনু

নতুন ভাষা রপ্ত করার কৌশল

জন্মের পর থেকে মায়ের মুখের ভাষাটাই হয়ে যায় আমাদের ভাষা। ওটাকেই অনেক বেশি আপন করে নেয় মানুষ। তাই একজন মানুষের প্রথম ভাষা হিসেবে ধরে নেওয়া হয় তার মাতৃভাষাকে। কিন্তু বিশ্বায়নের এ যুগে শুধু মাতৃভাষায় পারদর্শী কোনো ব্যক্তির ভিনদেশে ঘুরতে যাওয়ার মতো সাধারণ ব্যাপার থেকে শুরু করে পেশাগত জীবনে ভালো কিছু করা অনেক বেশি কঠিন।

শুধু তাই নয়, একের অধিক ভাষায় কথা বলতে পারাটাকে অনেক ভালো একটা গুণ। নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে, নতুন সংস্কৃতিকে জানতে, নিজের মনের ভাব আরো ভালো করে প্রকাশ করতে, উচ্চশিক্ষার জন্য আমাদেরকে সাহায্য করে বাড়তি শিখে নেওয়া ভাষাগুলো? এছাড়াও গবেষকদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, একের অধিক ভাষায় কথা বলতে পারা মানুষগুলো অন্যদের চাইতে পাঁচ বছর দেরীতে স্মৃতিহীনতায় ভোগেন। সুতরাং মস্তিষ্ককে আরো বেশি সতেজ রাখতে, মনযোগী করে তুলতে এবং কর্মক্ষম রাখতেও ভাষা সাহায্য করে থাকে।

যদিও স্নায়ুবিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী শিশু থাকাবস্থাতেই মানুষের ভেতরে নতুন কিছুকে পুরোপুরি আয়ত্বে নেবার ক্ষমতা থাকে। এর পরের জীবনে বয়স বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কমে যেতে থাকে এবং একটা সময় নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যাপারটা কিন্তু সবসময় এরকম ঘটে না।

প্রায় ২০টি ভাষায় কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই স্বতস্ফুর্তভাবে কথা বলতে পারা কেলির মতে, ‘পুরো তত্ত্বটাই আসলে ভূয়া!’ আর এভাবে অন্যকে সমালোচনা করবার তার প্রধান কারণটি হচ্ছে সে নিজে। নিজেকে উদাহরণ হিসেবে টেনে নিয়ে তিনি জানান যে, তার শেখা সবগুলো ভাষাই বড় হয়ে শিখেছেন কেলি। এর আগে নয়! আর তাই সময় নষ্ট না করে আসুন জেনে নিই যেকোনো বয়সেই কী করে নতুন ভাষাকে আরো ভালোভাবে আয়ত্বে আনতে হলে কী কী করতে হবে-

সংস্কৃতিকে ধারণ করুন : বহু ভাষায় কথা বলতে পারা মানুষদের মতে, প্রত্যেকটি ভাষারই রয়েছে নিজস্ব একটা আচরণবিধি। কোনোটা অনেক বেশি আন্তরিক, কোনোটা তা নয়। আর তাই প্রত্যেকটি ভাষা কেবল কিছু অক্ষর বা শব্দ নয়, তুলে ধরে নতুন একটা সংস্কৃতি, নতুন মূল্যবোধ আর ভাবনা। অনেকে নতুন কোনো ভাষা শিখতে গিয়ে এই ভিন্নতাটা আমলে নেন না। ফলে শেখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কোনো ভাষা শেখার সময় তাই অত্যন্ত সচেতন থাকুন এর ব্যবহার সম্পর্কে। অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে একদমই যেন মিশে না যায় সেটা মনে রাখুন। সেই সঙ্গে ভাষাগুলো কেবল পড়ে বা শুনে রপ্ত করার চেষ্টা না করে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার চেষ্টা করুন। মস্তিষ্ককে ভাষাটি শেখার কিছু স্মৃতি সংগ্রহের সুযোগ দিন। এতে করে খুব দ্রুত রপ্ত করতে পারেন ভাষাটি। সেই সঙ্গে সেটি বলার সময় মস্তিষ্কের কোণে জমে থাকা স্মৃতিগুলো আপনাকে সাহায্য করবে আরো ভালোভাবে, মাতৃভাষার মতো করে ভাষাটিকে প্রকাশ করতে।

মাতৃভাষাকে আলাদা রাখুন : মাতৃভাষা সবসময়েই আমাদের হৃদয়ের অনেক বেশি কাছের। অনেকে চান খুব তাড়াতাড়িই যেন অন্য ভাষাটিকেও মাতৃভাষার মতো করে বলতে পারা যায়। তবে সত্যিটা হচ্ছে এই যে, আপনি যতটা চেষ্টাই করুন না কেন, মাতৃভাষায় যেভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবেন অন্য কোনে ভাষাতেই সেটা পারবেন না। রাশিয়ান লেখক ভ্লাডিমির নাবোকোভ নিজের জীবনী লিখতে গিয়ে প্রথমে ইংরেজিকে ভাষা হিসেবে বেছে নেন। পরবর্তীতে রাশান ভাষায় সেটাকে অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি টের পান আরো অনেক কিছু বলার আছে তার, যেটা কিনা কেবল তার ভাষাতেই বলা সম্ভব। ইংরেজিতে নয়। শেষ পর্যন্ত নতুন করেই একটা বই লিখে ফেলেন তিনি রাশান ভাষায় আর অনুবাদ করেন ইংরেজিতে। তবে তাই বলে নতুন ভাষাকে রপ্ত করা ছেড়ে দেবেন সেটা নয়। চেষ্টা করুন মাতৃভাষাকে আলাদা করে রাখতে। যে ভাষাতে কথা বলছেন সেটার নিজস্ব সুরকে অনুসরণ করুন। লজ্জা পাবেন না। হয়তো আপনার নিজের কানে সেটা শুনতে প্রথমটায় একটু অদ্ভূত আর হাস্যকর শোনাবে। তবে মনে রাখবেন, আপনি যেটা হাস্যকর ভাবছেন, সামনের মানুষগুলোর কাছে সেটাই কিন্তু আসল উচ্চারণভঙ্গী!

অনুকরণ করুন : অভিনেতা মাইকেল লেভি হ্যারিস জানান, কথা বলার সময় যে জিনিসগুলো সবচাইতে বেশি দরকারি তার একটি হচ্ছে উচ্চারণ, আরেকটি মুখভঙ্গী! উচ্চারণ বলতে কেবল অনুসরণকেই বোঝান তিনি। হ্যারিসের মতে অভিনয় করবার সময় অনেক সময় না জেনেও কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে হয় এবং সেটাও এমনভাবে যাতে করে সামনের মানুষগুলো বিশ্বাস করে যে আপনি আসলে সে ভাষাতেই কথা বলেন। মানুষ খুব সহজেই অনুকরণ করতে পারে। আর তাই ১০ এর অধিক ভাষায় স্বতস্ফুর্তভাবে কথা বলতে পারা হ্যারিসের মতে, কোনো ভাষা রপ্ত করবার ক্ষেত্রে অনুকরণ অনেক বেশি কাজে আসে। ঠিক যেমনটা আমাদের সবার কাজে এসেছিল জন্ম নেওয়ার পর মায়ের ভাষাকে অনুকরণ করে। আর সেই সঙ্গে মুখভঙ্গী! কারণ আপনার ঠোঁটের অবস্থান অনেকটাই পাল্টে দিতে পারে আপনার কথার মানে। সুতরাং, এ ব্যাপারগুলো নিয়ে সতর্ক থাকুন।

অনুশীলন করুন : টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাভেলনকো বলেন, ‘কোনো একটি ব্যাপার যদি আমাদের ভাষা শেখার পথে বাঁধা সৃষ্টি করে সেটা হচ্ছে স্থানীয়দের মতো করে দ্রুত বলতে চাওয়ার ইচ্ছা।’ আপনি অবশ্যই পারবেন স্থানীয়দের মতো স্বতস্ফূর্তভাবে নতুন ভাষাটিতে কথা বলতে। কিন্তু তার জন্যে দরকার অনুশীলনের। আরেক বহুভাষাবিদ অ্যালেক্স রওলিং-এর মতে, প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট করে দিনে চারবার ভাষাটিকে অনুশীলন করা উচিত। কে না জানে, অনুশীলনের চাইতে ভালো এক্ষেত্রে আর কিছু হতেই পারে না!

অবসরকে কাজে লাগান : অবসরে কী করতে ভালোবাসেন আপনি? বই পড়তে, গান শুনতে, আড্ডা দিতে কিংবা ঘুরতে যেতে? তাহলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সিইও ডেভিড বেইলির ফ্রেঞ্চ ভাষা শেখার পদ্ধতিটি কাজে লাগতে পারে আপনার। ডেভিড সেবার ছুটিতে ১৭ দিনের জন্যে ফ্রেঞ্চ বন্ধুর সঙ্গে তার গ্রামে বেড়াতে যান। সঙ্গে নিয়ে যান ফ্রেঞ্চ গল্পের কিছু বই। এরপর? টানা ১৭ দিন ফ্রেঞ্চ ভাষার মুভি দেখে, গান শুনে, বই পড়ে, সেখানকার দৈনন্দিন জীবন যাপন করে বেশ ভালোরকমভাবে ভাষাটিকে আয়ত্বে এনে ফেলেন ডেভিড। কী ভাবছেন? সামনের ছুটিতে কী পরিকল্পনা করছেন তাহলে?

আত্মবিশ্বাস রাখুন : এতকিছুর কোনটাই কোনো কাজে আসবে না যদি না আপনি বিশ্বাস করেন যে আপনি পারবেন। আর তাই নিজের ওপর আস্থা রাখুন। ভাবছেন বয়স বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে? একদমই না! সম্প্রতি হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বয়স্করা ভাষা সংক্রান্ত নিয়মের ক্ষেত্রে ছোটদের চাইতে অনেক বেশি ভালো বোঝেন। এছাড়া একটা ধারণা থাকলেও পুরোপুরিভাবে কেউ এখনো সরাসরি বয়স বাড়বার সঙ্গে ভাষা শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখাতে পারেনি। সুতরাং, নিজেকে বলুন- আমি পারব! আর এগিয়ে যান নতুন ভাষার জগতে খুব সহজেই!