মেইন ম্যেনু

নতুন মহাকাশযান: চার ঘণ্টায় চাঁদে !

স্টার ট্রেক বা স্টার ওয়ার্স সিনেমা দুটি যারা দেখেছেন তাদের কাছে বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তবে তারা শুনে অবাক হবেন সেটা আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়, বাস্তব হতে চলেছে!

লক্ষ কোটি মাইল দূরে শত্রু নিধনে নিমেষে পৌঁছে যায় সেইসব সিনেমার নায়কেরা। সেটা সত্যিই রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা!
একে বলে ওয়ার্প ড্রাইভ (warp drive), কেউ বলেন হাইপার ড্রাইভ (hyper drive)। এটা হচ্ছে এমন এক শক্তি উৎস যা মহাকাশযানকে অবিশ্বাস্য গতি দিতে সক্ষম।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা দাবি করছে, তারা এমন এক বৈপ্লবিক কৌশল আবিষ্কার করেছেন যে শক্তি উৎস ব্যবহার করে মাত্র চার ঘণ্টায় চাঁদে পৌঁছে দেবে, যেখানে প্রচলিত রকেটে তিন দিন সময় লাগে। আর মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র দুই থেকে তিন দিন, যেখানে প্রচলিত রকেটে লাগে সাত মাস!

তাদের দাবি, সুটকেসে ভরা সম্ভব এমন একটি যন্ত্র মহাকাশে বিশাল দূরত্বে ঘণ্টায় ৪৫ কোটি মাইল গতি পেতে সক্ষম। এই যন্ত্র একটি মহাকাশযানে ভরে মানুষ হয়তো একদিন শুক্র গ্রহে সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে যাবে!

এই শক্তি উৎসের কৌশলকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ড্রাইভ বা সংক্ষেপে ইএম ড্রাইভ বলা হচ্ছে। এতে শক্তি সরবরাহের কৌশলটি হবে যেমনটি হয় একটি মাইক্রোঅয়েভ ওভেনের মধ্যে।

এ যুগান্তকারী যন্ত্র কৌশলের ধারণা দিয়েছেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রজার শাওয়ের। তবে প্রায় এক দশক আগে যখন এই ধারণাটির কথা তিনি বলেছিলেন তখন বাকিরা হাসাহাসি করেছে। এমনকি নাসার বিজ্ঞানীরাও এর সম্ভাব্যতা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।

এই সন্দেহের প্রধান কারণ হলো: এখানে নিউটনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সূত্রের ব্যত্যয় ঘটে, যে সূত্রের ভিত্তিতে রকেট ইঞ্জিন আবিষ্কার করা হয়েছে। রকেট ইঞ্জিন জ্বালানি পুড়ে যে গ্যাস তৈরি করে তা প্রচণ্ড বেগে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী বিপরীত দিকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয় ফলে মহাকাশযান সামনের দিকে যায়।

তবে নতুন ধারণার এ ইঞ্জিন রকেটের মতো কোনো জ্বালানি (প্রোপেল্যান্ট) ব্যবহার করে না। বৈদ্যুতিক শক্তিকেই রূপান্তর করে চলবে এ ইএমড্রাইভ ইঞ্জিন।

এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কিন্তু গবেষণা থেমে নেই। সবচেয়ে বড় বিমান প্রস্তুতকারক কোম্পানি বোয়িং এবং ব্রিটেন সরকার শাওয়েরের ধারণা সম্প্রসারিত করার জন্য গবেষণায় অর্থ ব্যয় করছে।

শাওয়ের এখন অবসরে এবং একটি ব্রিটিশ কোম্পানির পরামর্শক হিসেবে কর্মরত। তিনি নিজেও এ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন এবং তার দাবি আরো বেশ ক’টি দেশ এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।

পাঁচ বছর আগে চীনা বিজ্ঞানীরা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করে সফলভাবে পরীক্ষা চালানোর দাবি করলে, কেউ তাতে বিশ্বাস করেনি।
তবে নাসা যখন এমন দাবি করলো তখন কেউ আর এ নিয়ে কৌতুক করার সাহস পেল না। কারণ এ প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে চাঁদ এবং মঙ্গলগ্রহে সফলভাবে মহাকাশযান পাঠিয়েছে।

নাসার প্রকৌশলী পল মার্চ বলেছেন, তারা মহাকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করতে কৃত্রিম শূন্যস্থানে ইএম ড্রাইভের সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন।

তবে শাওয়ের বলছেন, এখানে জাদুবিদ্যার কিছু নেই। স্রেফ নিউটন, আইনস্টাইন আর ম্যাক্সওয়েলের সূত্র। এটা বুঝতে হলে আপনাকে মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংটা বুঝতে হবে। এই সহজ জিনিসটা অনেকেই বোঝেন না।

এর ব্যাখ্যায় শাওয়ের বলেন, ১৮৭০ এর দশকে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছেন, বাতাস যেমন মাটিতে মৃদু ধাক্কা দেয় তেমনি আলোও যখন কোনো তলে আপতিত হয় তখন এটা মৃদু বলে ধাক্কা দেয়। তবে এই বল খুবই সামান্য। এই বলকে বর্ধিত করলে অবিশ্বাস্য ফল পাওয়া যাবে। যেমনটি করা হয় মাইক্রোওয়েভ ওভেনে।

ওভেনের ভেতর ম্যানেট্রন নামে একটি ডিভাইস রয়েছে। শাওয়ের এমন একটি ডিভাইসই ব্যবহার করে আলোক তরঙ্গকে একটি দুই মুখ বন্ধ টিউবের মধ্যে সামনে পেছনে আন্দোলিত করেন। এভাবে একদিন তিনি দেখলেন, টিউবের একটি মুখ ক্রমেই প্রসারিত করলে আলো অপরপ্রান্তে গিয়ে বর্ধিত বল প্রয়োগ করে। এভাবে বাড়াতে থাকলে এক সময় টিউবটি সামনের দিকে চলতে থাকে।

নাসা বলছে, একই প্রক্রিয়ায় ইএম ড্রাইভের মধ্যে লেজার রশ্মি চালনা করলে এতো বল পাওয়া যায় যে এটি আলোর চেয়ে বেশি গতি পায়। এ থেকে ধারণা করা যায়, এই শক্তি একটি মহাকাশ যানকে একই গতিতে চালনা করতে সক্ষম হবে।

শাওয়ের প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি পরে ব্যাখ্যা করে বলেন, ইএম ড্রাইভ আস্তে আস্তে গতিপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু যতোক্ষণ বিদ্যুৎ প্রবাহ অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। বিুদ্যুৎ প্রবাহটি সৌর বা পারমাণবিক যেকোনোটি হতে পারে।

তিনি হিসাব করে দেখেছেন, যদি একটি আন্তঃগ্যালাক্সি ভ্রমণে এরকম একটি মহাকাশ যানের আলো গতির এক তৃতীয়াংশ গতি পেতে ১০ বছর সময় লাগবে। এই গতিই কিন্তু এখনো পর্যন্ত ভ্রমণবেগের চাইতে অনেক বেশি! অর্থাৎ সেকেন্ডে ১ লাখ ২৫ হাজার মাইল।

এই কৌশলটি সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে আর এখনকার মতো টন টন জ্বালানি বহন করতে হবে না। মহাকাশ যান বেশি সময় ধরে মহাশূন্যে অবস্থান করার প্রধান বাধাই এই জ্বালানি।



(পরের সংবাদ) »