মেইন ম্যেনু

নদী নিয়ে মাথাব্যথা নেই সরকারি কোম্পানির

নদীমাতৃক এই দেশের নদীগুলো নাব্যতার অভাবে প্রায় মরতে বসেছে। অন্যদিকে বারবার তেল ও কয়লাবাহী ট্যাংকার ডুবিতে ভয়াবহ হুমকির মুখে নদী ও তৎসংলগ্ন পরিবেশ। কিন্তু এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর।

কর্ণফুলী নদীতে গত জানুযারিতে তেলবাহী ট্যাংকার ফুটো হয়ে দেড় লাখ লিটারেরও বেশি ডিজেল ছড়িয়ে পড়ে। এতে আর্থিক ক্ষতির হিসাব কড়াগণ্ডায় কষে নিয়েছে তেলের মালিক রাষ্ট্রীয় কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম। তদন্ত কমিটির সুপারিশে ট্যাংকার মালিকের কাছে প্রায় এক কোট আট লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দবি করেছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যা কিস্তিতে আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে পরিবেশের কী ক্ষতি হলো তা নিয়ে কোনো চিন্তাই করছে না তারা। তাদের যুক্তি তেল সব সাগরে ভেসে গেছে, ফলে নদীর কোনো ক্ষতি হয়নি!

এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু বলা হয়েছে, নদীতে পড়ে যাওয়া তেলে কিছু অংশ দেশীয় পদ্ধতিতে ফোম, মোটা রশি, প্লাস্টিকের ক্যানের সাহায্যে সংগ্রহ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিষয়টিকে নদী ও পরিবেশের প্রতি সরকারি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার নজির হিসেবেই দেখছেন পরিবেশবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

সূত্র জানিয়েছে, গত ৩০ জানুয়ারি এমটি রাশেদ নামের একটি কোস্টাল ট্যাংকার মেঘনা পেট্রোলিয়ামের চট্টগ্রামের প্রধান সংরক্ষণাগার থেকে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ জ্বালানি তেল নিয়ে ফতুল্লার উদ্দেশে যাত্রা করে। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে এমটি শবনম-৪ নামে একটি নৌয়ানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তলায় ছিদ্র হয়ে যায়। এর ফলে নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ে। এমটি রাশেদের মালিক বাবুল চিশতী নামে জনৈক ব্যবসায়ী।

দুর্ঘটনার পরদিনই মেঘনা পেট্রোলিয়াম উপ মহাব্যবস্থাপক (পরিচলন) সেখ আব্দুল মতলেবকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এমআই) মো. মফিজুর রহমান, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (আইটি) মো. সাদেকুর রহমান, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) অলি আহাম্মদ ভূঁঞা ও মহাব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান তালুকদার।

কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় ও তেলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে বলা হয়।

কমিটি দু’দিনের মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটি এমটি রাশেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও এমটি শবনম এর কেনো প্রতিনিধির বক্তব্য নেয়নি। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, ‘পরিদর্শনকালে এমটি শবনমকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি’।

এমটি রাশেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে তদন্ত কমিটি জানায়, জাহাজ চালুর সময় জেনারেটরের সার্কিট ব্রেকার ফেল করায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে জাহজের স্টিয়ারিং কার্যক্ষমতা হারায়। জাহাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত নোঙ্গর ফেলা হলেও গতি ও তীব্র স্রোতের কারণে পাশে নোঙ্গর করে থাকা এমটি শবনম এর হেডের সঙ্গে ডান পাশের ৩নং কার্গো ট্যাংকে আঘাত লাগে। এতে ট্যাংকের ১ম ও ২য় হালের প্লেট ছিদ্র হয়ে তেল নদীতে পড়ে। পরে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করে জাহাজটি জেটিতে ভিড়িয়ে অবশিষ্ট তেল খালাস করা হয়।

তদন্ত কমিটির তথ্য মতে, প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার লিটার ডিজেল তেল নদীতে নিঃসরিত হয়। এ জন্য চুক্তির শর্ত অনুসারে জাহজের মালিক পক্ষকে প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

দুর্ঘটনার সময় ট্যাংকারটিতে ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯৪ লিটার ডিজেল এবং ২ লাখ ৩৫ হাজার ২০৭ লিটার জেট ফুয়েল ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য মতে, কোনো জেট ফুয়েল নিঃসরিত হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বাংলামেইলকে বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনায় নদী ও আশে পাশের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের উচিত কার‌্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আবদুল মতিন বলেন, সরকার দেশের নদী ও পরিবেশ নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয় না হলে শুধু শ্যালা নদীতেই কেন একের পা এক দুর্ঘটনা ঘটবে। তিনি অভিযোগ করেন, নদী আমাদের জন্য জীবনের রক্ষাকবচ হলেও সরকারের কাছে এটা একটা প্রাকৃতিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা।

তেল ছড়িয়ে পড়ায় বন্দর ও নদীর পরিবেশ রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে মেঘনা পেট্রোলিয়াম এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. শরীফ আশরাফউজ্জামান গত বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘না এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কারণ তেলের পরিমাণ খুবই অল্প। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।‘

তদন্ত প্রতিবেদনে দেড় লাখ লিটারের বেশি তেল নিঃসরণের কথা বলা হয়েছে- এর জবাবে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ তেল সমুদ্রে ভেসে গেছে তাই এতে বড় কোনো ক্ষতি হবে না।’

উল্লেখ্য, গত ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শেলা নদীতে সাউদার্ন স্টার-৭ নামে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে প্রায় পৌনে তিনশ টন তেল ছড়িয়ে পড়ে। একই নদীতে গত ১৯ মার্চ ১ হাজার ২৩৫ টন কয়লা নিয়ে সি হর্স-১ নামে একটি কোস্টার ডুবে যায়। এরপর সরকার শেলা নদীদের সব ধরনের নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে।বাংলামেইল



(পরের সংবাদ) »