মেইন ম্যেনু

নবম বছরে বেরোবি : শিক্ষক সংকটসহ আজো নানা সমস্যায় জর্জরিত

এইচ.এম নুর আলম, বেরোবি প্রতিনিধি : নারী জাগরনের অগ্রদূত মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত এর নামে প্রতিষ্ঠিত হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টি ৮ বছরেও শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। সেশন জটের জাতাকল, শিক্ষাসামগ্রী, শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যার বেড়াজলে বন্দি উত্তরবঙ্গের এই প্রতিষ্ঠানটি। মাত্র ৬টি বিভাগে ৩০০ শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক, ৩ জন কর্মকর্তা ও ৯ জন কর্মচারী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। ৪ এপ্রিল ২০০৯ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমদিকে রংপুর শহরের টিচার্স ট্রেনিং কলেজের পরিত্যক্ত কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও রংপুর শহরের প্রবেশদ্বার মর্ডান মোড়ে ক্যাডেট কলেজ ও কারমাইকেল কলেজের মাঝে ৭৫ একর জমির উপরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস।

৬টি অনুষদভুক্ত ২১টি বিভাগে প্রায় ৯ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী, ১৩২ জন শিক্ষক, ৬৭৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়েই চলছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাওয়ার পাওয়ার ৯ম বছরে এসেও অনেককিছু থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীসহ সকলেই। সময়ের পাল্লায় নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয় নবীনত্ব কাটলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে যে অনুপাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে সেই তুলনায় গত চার বছরে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার প্লান অনুযায়ী তিন ধাপে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য মোট ৫৩টি ভবন নির্মাণ করার কথা থাকলেও ১ম ধাপের কাজ শেষ হওয়ার দুই বছরেও ২য় ধাপের কাজ এখনও শুরুই করা হয়নি। ফলে আবাসনসহ ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। দু-একটি শ্রেণীকক্ষ নিয়েই চালাতে হচ্ছে একেকটি বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম।

সরেজমিনে এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমানের আমলে মাস্টার প্লান অনুযায়ী তিন ধাপে মোট ৫৩টি ভবন নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। ১ম ধাপের জন্য বরাদ্দকৃত শত কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে চারটি একাডেমিক ভবন, তিনটি আবাসিক হল, চারটি ডরমিটরি, একটি মসজিদ, একটি লাইব্রেরি, একটি প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্যের বাসভবন, ক্যাফেটরিয়া, নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণসহ ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়। মাস্টার প্লান অনুযায়ী ২০০৯ সালে শুরু হয়ে ২০১২ সালের মধ্যে এসব ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নির্মাণ কাজের মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। এসব কাজের বলা যায় পুরোটাই হয়েছে দ্বিতীয় উপাচার্য আবদুল জলিল মিয়ার আমলে। তবে ১ম ধাপের কাজ দীর্ঘদিন আগে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত ২য় ধাপের কাজ শুরুই হয়নি। অথচ মাস্টার প্লানের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের মধ্যে তিন ধাপে ৫৩টি ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত ২য় ধাপের কাজ শুরু না হওয়ার আদৌ ওই সময়ের মধ্যে ৩য় ধাপের কাজ শেষ হবার কোন সম্ভাবনাই নেই।এদিকে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার কোনটিই প্রতিষ্ঠার আট বছরেও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া ভবন নির্মাণের প্রায় চার বছর সময় পার হলে গেলেও নানা তালবাহানায় আজ পর্যন্ত ক্যাফেটেরিয়া খুলে দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নির্মাণ করা হয়নি টিএসসি, অডিটোরিয়াম, জিমনেসিয়াম কিংবা খেলাধুলার জন্য কোন পরিকল্পিত স্টেডিয়াম।নানান সমস্যার সঙ্গে পরিবহন ও আবাসন সংকট, বই সংকট রয়েছে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে। এছাড়াও কয়েকহাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ২০টি কম্পিউটারে দিয়ে বেহাল দশায় চলছে সাইবার সেন্টার। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোন ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট কানেকশনের সুবিধাও। অন্যদিকে চিকিৎসক অভাবে ঝিমিয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারটিও। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জ্বর ও সর্দি বাদে অন্য কিছু হলেই এখানে চিকিৎসা মেলে না। রোগীকে চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সেশনজটের প্রবণতা।
২০১৩ সালের ৭মে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে ৮মে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তার কর্মরেখা একটুকুও প্রতিফলন ঘটেনি বলে বিশ্ববিদ্যালয় সাক্ষী রয়েছে।

২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাড়ে ৯৭ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ প্রকল্প আসলেও হেলায় ফেলায় সেটির বাস্তব কর্মকাণ্ড এখনও ব্যাহত রয়েছে। ১ম প্রকল্পের কাজ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বোধনের অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ক্যাফেটেরিয়া। শিক্ষকদের রাজনীতি বা অন্তঃকোন্দল, শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুম সংকট এবং ব্যবহারিক সরঞ্জামদ্রবাদির অভাবের কারণে ভয়াবহ সেশনজটের জটাজালে অতিষ্ঠ হয়ে পরেছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি বিভাগের প্রত্যেকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা কমবেশি সেশনজটের জটাজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ৬ মাস থেকে আড়াই বছরের সেশনজটের বোঝা নিয়ে চলছে বিভাগগুলো।

চার বছরের অধিক সময় ধরে দুটো বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে কিন্তু প্রশাসনের তেমন কোনো সদিচ্ছা নেই এই অভাব পূরণে।কলা,সামাজিক বিজ্ঞান বিশেষ করে বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোতে সেশনজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং এ অবস্থা চলতে থাকলে সেশনজটের মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ার আশংকা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় উপাচার্য হিসেবে প্রফেসর ড. একে এম নূর-উন-নবী ২০১৩ সালের ৭মে যোগ দান করেন। উপাচার্য এর মেয়াদ শেষ হবে ২০১৭ সালের ৭ মে। এ সময়ের মধ্যেই বর্তমান প্রশাসন সকলের চাহিদা পূরণ করবেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারিরা আশা করেন।