মেইন ম্যেনু

নারীর স্তনকে কেন শরীরের আরসব অঙ্গের মতো করে দেখা হয় না

নারীর স্তন নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিকে নিজের অভিজ্ঞতায় ধরতে চেয়েছেন সাহিত্যিক শ্রীমুয়ি পিউ কুন্ডু। এ নিয়ে মতামতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি ও’তে একটি নিবন্ধ লিখেছেন দিল্লিভিত্তিক এ লেখক। এর আগে লাইফ স্টাইল সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ফ্যারাওয়ে মিউসিক এবং সীতা’স কার্স নামের বই দুটি তারই লেখা। শ্রীমুয়ির মতে, একসময় শরীরের বক্ষভাগ ঢেকে রাখার অধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে তার দেশের নারীরা। আর এখন নতুন এক যুদ্ধ করতে হবে। আর সেটা হল, স্তনকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে শরীরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারার অধিকারের দাবি।

শ্রীমুয়ির লেখা সে নিবন্ধটি প্রিয় পাঠকের জন্য ভাষান্তরিত করে তুলে ধরা হল।

শৈশবে আমি বেশ মোটাসোটা ছিলাম আর সেকারণেই হয়তোবা খুব দ্রুত আমার স্তনের আকার বেড়েছিল। ১১ বছরের মধ্যেই আমাকে ব্রা পরতে হল। আমি যেন ব্রা পরি তার জন্য আমার মা সবসময় চেঁচামেচি করতেন। এমনকি বাড়িতেও পরতে বলতেন। না পরতে চাইলে কঠিন কণ্ঠে মা বলতেন ‘স্তনের আকার নষ্ট হয়ে যাবে।’

কিন্তু কোন আকার? সত্যি কথা বলতে আমার স্তন সবসময় একইরকমই আছে। আমার মতে, ব্রা হল এমন একটি পোশাক যেটাকে দিয়ে ‘যৌন আকর্ষণ’ বোঝানোর চেষ্টা করা হয় এবং বেশিরভাগ সময় একে নারীর শরীরের একটি অংশ বলে বিবেচনা করা হয়।

আদতে আমাদের স্তন কখনোই আমাদের নিজেদের নয়। বাস্তবিক অর্থে এটি হল পবিত্রতা, পাপ কিংবা লজ্জ্বার উৎস। আমার স্তন প্রসঙ্গে সবসময় মায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, বাবা কিংবা ভাইদের সামনে যাওয়ার সময় আমাকে ব্রা পরতে হয়। জনবহুল এলাকায় কিংবা বাসে চলাফেরার সময় পুরুষের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে স্তনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

আমার সব প্রেমীরাও আমার স্তনের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। আমি কল্পনা করি, আমার যখন বাচ্চা হবে, তাকে কোলে নিয়ে স্তন্যদান করব, তখন তা দাগে দাগে ভরে যাবে। কিন্তু আমার কিচ্ছু মনে হবে না।

নারীদের স্তন কী কেবলই পুরুষদের প্রয়োজনীয়তা এবং আকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্য?

শরীর, আত্মা

আমাদের স্তন যা কিনা প্রত্যেক নারীর জন্য নারীত্বের যন্ত্রণাদা্য়ক যাত্রাপথের সূচনা চিহ্ণ বলে বিবেচিত, তা কেন শারীরিক লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়? কেন সবাই শরীরের এ অংশটির ওপর দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

আমি বুঝতে পারি না যখন দেখি নারীরাই অন্য নারীর স্তন দেখে চমকিত হন এবং বলে ওঠেন ‘তোমার স্তনের আকার সুন্দর।’ কেবল তাই নয়, আমরা পর্ন স্টার এমনকি ফিল্মের নায়িকাদেরকে পর্যন্ত স্তন ইমপ্ল্যান্ট করতে দেখি।

আমি বুঝতে পারি না কেন সমতল বুকের নারীদের বিবাহ উপাদান নেই বলে গণ্য করা হয়? এও বুঝতে পারি না যেদেশের নারীরা সুন্দর আর পাতলা হতে চায় সেখানে কেন আমরা বক্ষহীন নারীকে কটু কথা শোনাই।

ভালো ব্র্যান্ডিং

সম্প্রতি একটি সুইডিশ ফোন কোম্পানি ‘রেবটেল’ একটি স্কিম চালু করে। এর আওতায়, ভারতে সীমাহীন ফোন কলের সুযোগ দেয়া হয়। এ উদ্যোগের প্রচারণা চালানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি চারজন নারীকে বাছাই করে। এরপর পুরো শরীরে পেইন্ট করে তাদেরকে উন্মুক্ত বক্ষ নিয়ে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের মাঝখানে নাচতে বলা হয়। চার নারীই নেচেছেন ‘চামাক ছাল্লো’ গানের সুরে সুরে। এ উদ্যোগকে যখন ‘সেক্সিস্ট’ বলে উল্লেখ করা হল তখন জবাবে কোম্পানিটি জানালো আনলিমিটেড কলিং এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সংযোগ বোঝানোর জন্যই তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে। নিজেদের একটি বিদ্রোহী ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করানোও এ উদ্যোগের অংশ ছিল বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু এখানে কেন উন্মুক্ত বক্ষের নারীকেই উপস্থাপন করতে হবে? কেনইবা বলিউড অভিনেত্রীদের বুকের ওপর ক্যামেরা জুম করে দৃশ্যায়ন করা হয়? কেন জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা মাধুর বানধারকার তার নতুন ছবি ‘ক্যালেন্ডার গার্লস’ এর জন্য বিকিনি পরিহিতা নারীদের পোস্টার ব্যবহার করেছেন? কেনইবা আমরা আমাদের স্তনকে প্রাকৃতিক বলে মেনে নিতে পারি না?

কাপড় পরার যুদ্ধ বনাম না পরার যুদ্ধ

নগ্নতা যে লজ্জ্বার ব্যাপার তা ভারতীয় সংস্কৃতির জন্য নতুন একটি ধারণা। একসময় এটি শিল্প ও সংস্কৃতিতে উদযাপনের বিষয় ছিল। সত্যিকার অর্থে, বলা হয়ে থাকে যে ব্লাউজের চল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত নারীরা শরীরের উপরিভাগে কিছু পরতেন না এবং তারা তাদের শরীর নিয়ে লজ্জ্বিতও ছিলেন না। কোনার্ক এবং খাজুরাহের প্রাচীন ভাস্কর্যগুলোর দিকে লক্ষ্য করলেই আমি যা বলতে চাচ্ছি তার প্রমাণ পাবেন আপনারা।

কৈরালাতে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকেও নারীদের বক্ষ ঢেকে রাখাকে নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হত। ব্রাহ্মণরা ছাড়া হিন্দু নারীদের কেউই মনে করতেন না যে স্তন ঢেকে রাখতে হবে। নায়ার সম্প্রদায় এবং উচ্চ বর্ণের নারীরা সাধারণ একটি সাদা মুন্ডু (ধুতি সদৃশ কাপড়) দিয়ে তাদের স্তন ঢেকে রাখতেন। ঊনবিংশ শতাব্দি পর্যন্ত ত্রাবোনকোর, কোচিন এবং মালাবারে ব্রাহ্মণদের সামনে কোন নারীরই তাদের শরীরের উপরের অংশ ঢেকে রাখার অনুমতি ছিল না। ১৮১৮ সালের দিকে প্রভু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে পরিচিত আয়া ভাইকুন্দারের সমর্থনে নির্দিষ্ট কয়েকটি সম্প্রদায় বুকে কাপড় পরার অধিকারের দাবিতে লড়াই শুরু করে।

১৮৮৯ সালে ত্রাভানকোরের রানী ঘোষণা দিলেন যে, কৈরালার অ-ব্রাহ্মণদের মতই তার রাজ্যে নাদার গোষ্ঠীর নারীদের বক্ষ ঢাকার অধিকার নেই। যদিও কৈরালার নাদার গোষ্ঠীর নারীদের বক্ষ ঢাকার অধিকার ছিল। রাজ্যজুড়ে বিশেষ করে নেয়াত্তিনকারা এবং নেয়ুরে নাদার গোষ্ঠীর নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা চরমে পৌঁছালো ১৮৫৯ সালে।

ঐ বছরের ১৬ই জুলাই মাদ্রাজ সরকারের চাপে পড়ে আরেকটি ঘোষণা দেয় ত্রাভানকোরের রাজা। উচ্চ শ্রেণির নারীদের স্টাইল অনুকরণ না করার শর্তে নাদার নারীদের শরীরের উপরের অংশ কাপড় দিয়ে ঢাকার অধিকার ঘোষণা করেন তিনি।

আর এখন আমরা আরেকটি লড়াই করছি।