মেইন ম্যেনু

নারী ও পুরুষের শ্বশুরবাড়ি কি এক?

ইশরাত জাহান ঊর্মি : আচ্ছা আপনার কি মনে পড়ে বিয়ের ঠিক আগে আগে আপনার মা বা খালা বা ফুপু বা চাচী বা এরকম কেউ আপনাকে একলা ডেকে নিয়ে কি বলেছিল?

“মা ভাল হয়ে চলবে। শ্বশুরবাড়ির কারো সাথে বেয়াদবী করো না, সবাই যেন বলে মা-বাবার শিক্ষা ভালো।” অথবা এমনও বলতে পারে, “স্বামীকে আয়ত্ত্বে রাখতে হয় এই এইভাবে।” বলেন তো গল্পটা কি অধিকাংশের কমন পড়ছে না? না কি আমি খুব বেশি বানিয়ে লিখলাম?

কদিন আগে এক সাবেক সহকর্মীর বিয়ে হলো। সে আমার কাছে জানতে চাইল, “আপু আপনি তো মেয়েদের জন্য লেখেন টেখেন, আমাকে একটু বলে দেবেন, শ্বশুরবাড়িতে নিজের সম্মান বাঁচিয়ে কি করে সবার সাথে মিলে-মিশে হাসি-খুশি হয়ে চলা যায়?”

আমি কাউন্সিলার নই, তাছাড়া আমার অত সময়ও ছিল যে ওর শশুরবাড়ির ধরন বুঝে ওকে পরামর্শ দেবো। কিন্তু বিষয়টা ভাবালো। ‘নারীর শ্বশুরবাড়ি’ এক নির্মম বাস্তব। আসলেই কিন্তু নির্মম বাস্তব। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কালো-ফর্সা, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত, কর্মজীবী-গৃহবধূ সবার জন্য সে এক ভীতিকর অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।বিপরীতে ‘পুরুষের শ্বশুরবাড়ি’ বলে কোন বিশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়না। আপনি যদি এই রিজিওনের লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন পড়েন তো দেখবেন তারাও আপনাকে প্রায় পিতা-মাতার মতোই উপদেশ দিচ্ছে। ২০০৮ সালের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকা সানন্দার কাভার স্টোরি ‘শশুরবাড়ি এবং আপনি’। পুরো কাভার স্টোরির সাথে ফিল গুড টিপস। প্রথম টিপসটি শুনুন। শাশুড়ির কাছ থেকে স্বামীর ফেবারিট স্যুইট ডিশের রেসিপি শিখে নিন। এভাবেই ওরা আপনার কাছের লোক হয়ে উঠবেন। এরপরের টিপস, ভুল স্বীকার করতে শিখুন। বাবা-মায়ের কাছে অনেক ভুল করেও আমরা পার পেয়ে যাই। হয়তো শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা আপনাকে সেই নিরিখে বিচার করবেন না। যদি মনে হয় কোন ভুল কথা বলে ফেলেছেন তৎখনাত ক্ষমা চান। পরের টিপস বাড়ির সবার জন্মদিন সেলিব্রেট করুন। টিপস ছয়: ধৈর্য্য ধরুন। আপনার মা-বাবা যত সহজে আপনার প্রয়োজন, রাগ অভিমান বুঝতে পারতেন, শ্বশুরবাড়ির মানুষজন সেটা পারবেন না। খাওয়া-দাওয়া, শোয়ার সময়ের হেরফের, টিভি দেখার মতো ছোট ছোট ব্যাপারে মন খারাপ করলে খামোখা নিজেই কষ্ট পাবেন। আরেকটি টিপস ‘শ্বশুরবাড়ি গিয়ে প্রথমেই বিপ্লব করতে যাবেন না। মনে রাখবেন, প্রতিটি বাড়িরই কিছু নিজস্ব রীতি, আচার থাকে। এগুলোকে ফুৎকারে উড়োতে যাবেননা। শুনুন, বুঝুন তারপর কৌশলী হয়ে আচরণ করুন।’

অর্থাৎ সংসার কিভাবে কিভাবে টেকাবেন, কৌশল করবেন সেসব আপনাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিখিয়ে দিচ্ছে এই পত্রিকা। সানন্দার মতো বাংলাদেশের জনপ্রিয় লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন বা দৈনিকের পাতা যেগুলো নারীরা নিয়মিত পড়ে থাকে, সেগুলো আপনাকে নানান ছবক দেবে। আপনি যাতে কোনভাবেই রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তীর মতো বেঘোরে না মরেন, সহানুভুতিশীল হয়ে তারা তার উপায় বাতলে দেন। ‘সংসার এবং শ্বশুরবাড়ি’ এমনই এক ভয়ানক জিনিস যা আপনার সকল সারল্য এবং নিষ্পাপতা ঘুচিয়ে হয় আপনাকে ‘কৌশলী’ বানাবে নয় তো ‘নির্যাতিতা’। এই কথা পড়ে যারা ব্যাতিক্রম অভিজ্ঞতার ডালি নিয়ে হাজির হচ্ছেন তাদের প্রতি আমার হাজার স্যালুট। আপনাদের সুখ দেখে আমার চোখ টাটাচ্ছে না, আপনারা পয়মন্ত ঘর-সংসার করুন। আমার লেখাটা অধিকাংশের দীর্ঘশ্বাসের জন্য।

নারী-শ্বশুরবাড়ি এসেছেন তো প্রথমেই আপনি যে নিখুঁত বউ তার পরীক্ষা এবং প্রমাণ দিতে হবে প্রতিনিয়ত। এই পরীক্ষা অনেক মেয়ে খুব সানন্দেই দেয়। ঘর-দোর সাজায়, গোছায়, আত্নীয়-স্বজনের যত্ন-আত্তি করে এবং এই প্রক্রিয়া পরবর্তীতে দীর্ঘায়িত হয়। পরীক্ষা লম্বা হতে থাকে। আপনি যদি সেখান থেকে সরে আসেন তো সঙ্গে সঙ্গে শুনতে হবে আপনি বদলে গেছেন। এখন এই পরীক্ষা যদি আপনি জীবনভর দিতেই থাকেন, আপনার সংসার টিকবে, খুব ভালোমতোই টিকবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে একসময় আপনি ক্লান্ত হয়ে যাবেন। খুব নীরব সেই ক্লান্তি। ঘুনপোকা, নি:শব্দে কাটবে আপনাকে। আবার এমনও হতে পারে, যে সংসার খুব ভালো চলছে বলে আপনার মনে হয়েছে হঠাতই একদিন দেখবেন এটা আসলে অসাড় একটা জিনিস দাঁড়িয়েছে। আপনি আমি আমরা জানি সংসার মানেই সমঝোতা, কিন্তু নারীকে সবসময় এই সমঝোতা বাধ্যতামূলকভাবে করতে হয়। পুরুষকে নয় কিন্তু। অনেকসময় অনেক নারীও কথা বলেন পুরুষের সুরে। এই লেখা পড়েও কেউ বলতে পারেন,এতো সমস্যা থাকলে সেসব মেয়েদের সংসারই করতে আসার দরকার নাই। কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছা করে, যারা আমাদের শেখায় শ্বশুরবাড়ি একটা পরিবার সেটাকে নিজের করে নাও, আপন করে নাও, তাহলে ঐ পরিবারে আসার আগেই কিছু নারী যারা কোন মেয়ের খালা-ফুফু-মা এরা কেন কৌশলী হতে বলে? কিংবা বিয়ের পরে যে বাড়িতে আসি সেই বাড়ির বড় জা কিংবা পাশের বাড়ির আরেক বউ বলে ‘একটু সমঝে চলো’, ইত্যাদি। যদি শ্বশুরবাড়িকে আপনারা পরিবার বলেই থাকেন তাহলে সেখানে একটা মেয়ে তাঁকে এতো কৌশলী হতে হবে কেন, কেন টিপে টিপে পা ফেলতে হবে? আচ্ছা আমরা কেউ কি কখনো পরিবারের ভেতর সতর্ক হয়ে চলি, বলেন তো দেখি? তার মানে শ্বশুরবাড়ি আসলে বাড়ি নয়, শ্বশুরবাড়িই?

বিপরীতে পুরুষের কোন শ্বশুরবাড়ি ইফেক্ট নাই। সে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কারে সালাম দিল কারে দিল না সেটা এমন কিছু ম্যাটার করেনা, সাধারণত করে না। বরং জামাই এসেছে শ্বশুরবাড়ি, তাকে সবাই মাথায় তুলে রাখে। সে কি খাবে, কিভাবে খাবে কখন খাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভাবার কোন কারণ নেই যে এই চিত্রের খুব কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সেরকম কেন কাভারস্টোরি আমি দেখিনি যে পুরুষ তার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কি আচরণ করবে, কোন কৌশলে শালী-শ্যালক আর শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করবে, কিভাবে টাইম ম্যানেজমেন্ট করবে, কার জন্য কিভাবে রাঁধবে। কারণ পুরুষের এসব দরকার হয়না।

এখন আমার মনে হয় কি, নারীর উচিত সবকিছুতে প্রশ্ন তোলা। কেন সবাইকে আপনার সমঝে চলতে হবে তা আপনি এখনই ভাবুন। মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বাঁচে যে মানুষ, সে আরেক মানুষকে সম্মান করবেন, ভয় পেয়ে সমঝে চলবেন না বা চরিত্রের বিপরীতে গিয়ে কৌশল করবেননা।

আপনি তাই প্রশ্ন করুন। এতে প্রথমে হয়তো সবাই আপনাকে বেয়াদব ভাববে কিন্তু আখেরে লাভ হবে। আপনার পছন্দ-অপছন্দ, সমস্যা-সুবিধাকে সম্মান করবে সবাই যেমন আপনার পুরুষ পার্টনারেরটা করে।

লেখক : সাংবাদিক