মেইন ম্যেনু

নার্সারী ব্যবসায় সাবলম্বি তোফাজ্জল হোসেন

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি,: সবুজ শ্যামল ছায়ার তৃষ্ণা মেটাতে ও জলবায়ুর বিরুপ প্রভাব থেকে পরিবেশকে মুক্ত করতে তোফাজ্জল হোসেন গড়ে তুলেছেন নার্সারী। পরিবেশ ও প্র্রৃতির অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে এলাকায় বেশ সুনাম এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভাবেও হয়েছেন সাবলম্বী তিনি।

ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীসংকৈল উপজেলার কলন্দা (করিয়া) ধামগানী পুকুর পাড়ে গিয়ে জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেনের সাবলম্বী হওয়ার গল্প।

১৯৬৭ সালে ঠাকুরগাঁও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ছায়াঘেরা সুনিবিড় অরণ্য অধূষিত প্রকৃতির মায়ামমতা শুভাশিত ৬ নং ভানোর ইউনিয়নের কলন্দা (করিয়া) গ্রামে তার জন্ম। জম্মের পর থেকেই তার পরিবারে অভাবে নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে তিনি। পিতার উপার্জনে ৬ সদস্যের পরিবারে অন্ন বস্ত্রের জোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

বয়স মাত্র ১৮। বাবার ৪ ছেলে মেয়ের মধ্যে সে এক মাত্র ছেলে হওয়ায় তোফাজ্জল হোসেন সেই বয়সেই চিন্তিত হয়ে পরে কি করে দূর হবে সংসারের অভাব অনটন। বাবার ১০ বিঘা জমি থাকলেও তাতে কি করবে তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। চিন্তিত মনে একদিন নেকমরদ বাজারে চায়ের দোকানে মাত্র ৪ টাকা হাতে নিয়ে ভাবছিলেন কি করা যায়। এমন সময় হঠাৎ ব্র্যাক অফিসের ৩ জন ভদ্রলোক এসে বলে, এই ছেলে মাথায় হাত দিয়ে কি ভাবছ। চলো তোমাদের গ্রামের ওখানে ছেলেদের নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করি।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় নার্সারি, মৎস চাষ, ও পশু পালন প্রসংগে তিন জন ব্যাক্তি প্রায় ৯০ মিনিট অনেক ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়। গ্রামের ১০০ জন যুবক প্রশিক্ষণ নেয়। তোফাজ্জ্বল স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন পশিক্ষণ কর্মশালাতেই। স্বপ্ন পুরণের লক্ষ্যে বিভোর হয়ে উঠেন তিনি। বাবাকে জানায় নার্সারি করার স্বপ্নের কথা। বাবা বলেন তুই আর কি কি করবি। যা মনে চায় কর! অবশ্য এ ব্যাপারে তাকে তার মা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন। বাবাকে বলে বাড়ির পাশেই মাত্র ১ শতক জমি পান। জমিটি নিচু থাকায় মাথায় করে দুর থেকে মাটি এনে খাল ভরতে হয় তাকে। এরপর সেখানে আম, জাম ও কাঠালের প্রায় ১৫০০শ চারা গাছ লাগান। কিছুদিন পর সাড়ে ৩ ফুট চারা গাছ বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে যান। ১ম বিক্রিতে খরচ ছাড়াই ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা লাভ হয়। তিনি আরো বেশি সাহস পান। ছেলের কর্ম দেখে তার বাবা খুব খুশি হয়। তিনি বুঝতে পারলেন তার ছেলে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে পারবে। তাই তিনি আরো ৮ শতক জমি দিলেন। সেই জমিতে আরো গাছ লাগান। সকালে ঘুম থেকে ওঠে নার্সারীতে গিয়ে আপন মনে আনন্দের সাথে কাজ করেন। এভাবে কেটে যায় একটি বছর। ১ম বছরে নার্সারির ব্যবসা আরো ভালো হলো। আরো জমি প্রয়োজন হলো। তার বাবাকে বলে আরো ২০ শতক জমি নিয়ে সেখানে আরো প্রায় ২০,০০০ নতুন চারা গাছ লাগান।

নার্সারীর নাম দেন ‘বারমাসি নার্সারী’। আরো জমি বাড়িয়ে নিয়ে নার্সারী পরিধি বাড়ান। এভাবে ৩২ বছরে ৪ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন বিশাল বারমাসি নার্সারী। নার্সারী করে এখন সে লাখোপতি। নার্সারির ৪ একর জমির মধ্যে ১.৫(দেড়) একর জমি নিজের এবং ২.৫ (আড়াই) একর জমি ভাড়া হিসেবে নিয়েছেন। নার্সারির লাভের টাকায় সংসার খরচ, ছেলে মেয়ের পড়াশুনা সহ বিভিন্ন কাজে লাগান। বর্তমানে নার্সারীতে চারার সংখ্যা প্রায় ৫০-৬০ হাজার। তার নার্সারীতে বিভিন্ন প্রকার গাছের মধ্যে ফলজ, বনজ ও ঔষধী বৃক্ষ রয়েছে। এখন আর তার পিছনে তাকাতে হয় না। নার্সারীতে দুইজন দক্ষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কারিগর সারাদিন কাজ করে। এর মধ্যে এক জন সাতক্ষীরা জেলা থেকে এসেছেন। তিনি এই এলাকায় স্ব পরিবারে প্রায় ১৪ বছর ধরে আছেন। এবং অন্যজন দিনাজপুর জেলার ৩ বছর থেকে আছেন। এছাড়াও প্রতিদিন নার্সারিতে ৭/১০ জন শ্রমিক কাজ করে।

নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁও ছাড়াও দিনাজপুর, পঞ্চগড়, লালমনির হাঁট, রংপুর, বগুড়া, সিলেট, কুমিল্লা ও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাক ভর্তি করে যাচ্ছে তার নার্সারীর চারা।

নিজের পায়ে দাড়িয়ে ২২ বছর বয়সে বিয়ে করেন তোফাজ্জল হোসেন। সংসারে তার বাবা বেঁচে নেই। তার মা এখন ৮০ বছরের বৃদ্ধা। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় মেয়ে নাজমা আক্তারকে ডিগ্রি ২য় বর্ষের পরীক্ষার পর এক সম্ভান্ত পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন।

২য় মেয়ে সিদ্দিকা খানম নেকমরদ বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্রী। ৩য় ছেলে তোজাম্মেল হোসেন একই কলেজে এইচ এস সিতে পড়ছে। ৪র্থ মেয়ে মাফিতুবা খানম কুশুম উদ্দীন ফারাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।

তিনি স্থানীয় নার্সারী সংগঠনের সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

তিনি বৃক্ষ রোপন তরান্বিত ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রতি বছর বৃক্ষ মেলায় বিনামূল্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করেন। এছাড়াও তার গ্রামের মসজিদ, মন্দির, স্কুল সহ বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে চারা দিয়ে থাকেন।

তোফাজ্জল হোসেন শুধু নার্সারী করেননি। তিনি স্ব-উদ্দোগে আশপাশের কয়েক গ্রামের বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ৩২ টি নার্সারী করে দিয়েছেন। এ নার্সারীর প্রেমিক কে এলাকার সবাই এখন সম্মানের চোখে দেখে। এক সময়ের তোফাজ্জল এখন “বারমাসি নার্সারীর” একমাত্র মালিক তোফাজ্জল হোসেন হিসেবে এলাকায় সমধিক পরিচিত। পরিবেশ নিয়ে ভাবেন তিনি। পরিবশে বান্ধব বৃক্ষ রোপনের জন্য সবাইকে উৎসাহিত করেন। গাছ লাগানোর পরামর্শ ও বিনামূল্যে গাছ বিতরণ করেন। গাছ লাগিয়ে ভরবো দেশ এ আপ্রাণ ইচ্ছা ও মনোবাসনা নিয়ে সবাইকে গাছ লাগানোর ও গাছ ভবিষ্যতের অকৃত্রিম বন্ধু তা সবাইকে বুঝান।

তোফাজ্জল হোসেন জানান, নার্সারী আমার শুধু স্বাবলম্বী করেনি, করেছে আর্থসামাজিক অবস্থারও ইতিবাচক পরিবর্তন। আজ আর পিছনে তাকাতে হয়না। অনাহারে থাকতে হয় না। তিনি জানান, সকালে ঘুম থেকে ওঠে যখন নার্সারীতে যাই ভোরের মিষ্টি রোদ এসে যখন গাছের কচি পাতায় পড়ে চিকচিক করে সে সবুজ দৃশ্য দেখতে আমার খুব ভাল লাগে।

তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, এতো বড় নার্সারী করেছি কোন সরকারি ও বেসরকারি সহযোগীতা পাইনি। তিনি ভবিষ্যতে আরো বড় আকারের নার্সারী করতে চান। তোফাজ্জল হোসেনের নার্সারী ঘুরে দেখা যায়, ঘৃনকাঞ্চন, লজ্জাবতী, গাদালি, লটকন, বাজনা, জয়না, কাকডুমুর, জগডুমুর, পলাশ, আজুলি, মহুয়া, নামেশ্বর, বাশক, নিম, নিশিন্তা, বিপুল মারপসন্ধা, তুরক চাত্তাল, রান্থচাত্তাল, প্রড়মাচাত্তাল, কালচাত্তাল, হাতিশুড়, অধ্যসন্ধা, খেতচান্দন, রক্তচন্দন, শিমুল, সোনালু, হাড়মচকা, উলটকুমল, হিজল, আমলকি, জারুল, অর্জুন, কদম, বহেড়া, হরিতকি, আম, আমরুপালি, মল্লিকা, হাঁড়িভাঙ্গা, চোসা, সুবর্ণরেখা, লকলা, নবাব, শাহী বোম্বাই, সুন্দরী, নেংড়া, ফজলি, গোরাপ ভোগ, ক্ষীরসাপাত, বারমাসি পালমাল, কাঠাল, জাম, জামরুল, চাইলটা, আতা, হর বরই, কমলা, মালটা, আঙ্গুর, লেবু, পেয়ারা, পামওয়েল, ডালিম, আকাশমনি, মেহগুনি, লম্বু, রেইনট্টি কড়–ই, সেগুন, চাপালিশ, আসর, বেত, বাঁশ, দেবদারু গামারী, দেওয়া, বকাইন, পাতাবাহার, বাগান বিলাশ, গর্জন, মেহেদী, বট। এছাড়াও শতাধিক প্রজাতির বীজের সমাহারও রয়েছে তার নার্সারীতে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারী বিদ্যালয়, মাদরাসা সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে পেয়েছেন বিভিন্ন সম্মাননা ও সনদপত্র।

তোফাজ্জল হোসেন জানান, যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এর ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। বিপন্নের হাত থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে পরিবেশ বান্ধন বিভিন্ন গাছ তার নার্সারীতে উৎপাদন করছেন। তার আশা এ সব গাছ লাগিয়ে একদিন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এসব গাছ ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

তিনি আশ পাশের জেলার বিভিন্ন নার্সারী মালিক ও ব্যক্তিকে বিনামূল্যে চারা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। টিস্যু কালচার পদ্ধতি, নতুন জাত উদ্ভাবন, গ্রাফটিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন কলম বিষয়ে তিনি ব্রাক, যুব উন্নয়ন, বরেন্দ্র সহ বিভিন্ন জায়গায় ২৭/২৮ টি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।

তিনি স্থানীয় এমপি, কৃষি কর্মকর্তা, এনজিও এবং প্রশাসনিক সরকারি বে-সরকারি সকলের সু দৃষ্টি কামনা করেন।