মেইন ম্যেনু

নিঝুম দ্বীপের অরণ্যে আনন্দময় ভ্রমণে কিছু দরকারি টিপস্

নোয়াখালী জেলার সর্ব দক্ষিণের দ্বীপ হল হাতিয়া। হাতিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন আরেকটি দ্বীপ হলো নিঝুম দ্বীপ। একে ‘দ্বীপ’ বলা হলেও মূলত এটি হল চর। বঙ্গোপসাগর ও মেঘনার নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা নিঝুম দ্বীপ প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। প্রাকৃতিক পরিবেশে পশু-পাখির জন্য দেশের একমাত্র অভয়ারণ্য এ দ্বীপটি।

1690309_1597346837192522_346594859161409813_n

নিঝুম দ্বীপ এর ইতিহাসঃ
নিঝুম দ্বীপের উত্পত্তির ইতিহাস বেশ চমত্কার। যতদূর জানা যায়, প্রায় একশ’ বছরেরও বেশি সময় আগে গভীর রাতে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা এই একটি ডুবো চরের সন্ধান পান । গভীর রাতে বঙ্গোপসাগর আর প্রমত্ত মেঘনার মোহনায় হঠাৎ সাগরের উথাল-পাতাল ঢেউ দেখে প্রথমে জেলেরা ভাবেন—হয়তো সাগর মোহনা দিয়ে বিশাল সব তিমির বিশাল ঝাঁক পথ হারিয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। উথাল পাথাল ঢেউ এর তাণ্ডব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় দুঃসাহসী জেলেরা রাতেই সেদিকে এগিয়ে যায় এবং বিশাল এক ডুবোচরের সন্ধান পান। সেই ডুবোচরই আস্তে আস্তে পলি জমে একটি দ্বিপের আকার ধারন করে । যা আজকের নিঝুম দ্বীপ । কিছুদিন পর স্থানীয় জেলেরা পাখির আনাগোনা দেখে মাছ ধরতে এই এলাকায় যাওয়া-আসা শুরু করেন। বালুয়ার চর নামে এই দ্বীপটি জেলেদের কাছে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে নিঝুম দ্বীপের বালুর রঙ স্বর্ণের রঙের মতো হওয়ায় কিছুদিন পর এর নামকরণ করা হয় স্বর্ণদ্বীপ। তখন ওসমান নামের একজন বাথানিয়া তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম নিঝুম দ্বীপে বসবাস শুরু করেন । এ কারনে তার নামেই এই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় চর ওসমান । এর পর হাতিয়ার একজন সাংসদ এই দ্বীপটির নাম বদলে নাম রাখেন নিঝুম দ্বীপ । ১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত এখানে লোকজনের বসবাস ছিলো না। ১৯৭০ সালে বনবিভাগ এই দ্বীপে তাদের কার্যক্রম শুরু করে চার জোড়া হরিণ অবমুক্ত করণের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে এক হরিণশুমারীতে পাওয়া তথ্যে জানা যায় সেই ১৯৭০-১৯৯৬ এই ২৬ বছরে হরিণের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ২২,০০০ এ। সেই থেকে এই দ্বীপটিকে হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানেও অসংখ্য হরিণ রয়েছে দ্বীপটিতে।

অন্য আরেকটি সূত্র হতে জানা যায়, ১৯৪০- এর দ্বীপটি বঙ্গোপসাগর হতে জেগে ওঠা শুরু করে। চর গঠনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ৪০-এর দশকের শেষদিকে নিঝুম দ্বীপ তৃণচর বা গোচারণের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। হাতিয়ার জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে এই দ্বীপের সন্ধান পায়। ৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিঝুম দ্বীপে জনবসতি শুরু হয় বলে ধারনা করা হয় । মূলত হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়ন থেকে কিছু জেলে পরিবার প্রথম নিঝুম দ্বীপে বসবাসের জন্যে আসেন । তখন নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর ইছা মাছ (চিংড়ি মাছ) ধরা পড়ত বিধায় জেলেরা এ দ্বীপের নাম দেয় ‘ইছামতির দ্বীপ’। আবার এ দ্বীপটিতে মাঝে মাঝে বালির ঢিবি বা টিলার মতো ছিল বিধায় স্থানীয় লোকজন এ দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বলেও ডাকত। কালক্রমে ইছামতি দ্বীপ নামটি হারিয়ে গেলেও স্থানীয় লোকেরা এখনো এ দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বলেই সম্বোধন করে।
১৯৬৯ সালের দিকে একদল জরিপকারী এই চরে জরিপ করতে আসেন। তখন ওসমান নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা জরিপকারীদের সহযোগিতা করেন। জরিপকারী দলটি চর ওসমান নামে এই চরের নামকরণ করেন । কালের পরিক্রমায় সমুদ্রের পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরাজির বীজ ভেসে আসায় দ্বীপটিতে গড়ে ওঠে এক বিশাল প্রাকৃতিক বনাঞ্চল । চলে এই দ্বীপজুড়ে নেমে আসে গভীর নির্জনতা । পরে লোকের মুখে মুখে নির্জন দ্বীপ নামে আত্মপ্রকাশ করে । ১৯৭৯ সালে তৎকালীন প্রয়াত সংসদ সদস্য প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম পরিদর্শনে এসে নির্জন দ্বীপের শান্ত ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে দ্বীপটির নামকরণ করেন নিঝুম দ্বীপ।

12512774_1597346877192518_4156951273764688941_n

কীভাবে যাবেন নিঝুম দ্বীপঃ

যদি বাসে যেতে চানঃ
ঢাকার মহাখালী, কমলাপুর ও সায়েদাবাদ থেকে এশিয়া লাইন, এশিয়া ক্লাসিক, একুশে এক্সপ্রেস ও হিমাচল এক্সপ্রেসের চলাচল করে নোয়াখালীর সোনাপুর রুটে। ভাড়া পড়বে ৩৫০-৪৫০ টাকার মধ্যে।
বাসে সোনাপুর নেমে সিএনজি অটোরিকশায় করে চলে যান চেয়ারম্যান ঘাট। ভাড়া গুনতে হবে ১০০ টাকা।
এরপর ট্রলারে চড়ে যেতে হবে নলচিরা ঘাটে। জনপ্রতি ভাড়া ১৫০ টাকা। সেখান থেকে আবারও বাসে জাহাজমারা বাজার। জনপ্রতি ভাড়া দিতে হবে ৭০টাকা।

জাহাজমারা বাজার থেকে মোটর সাইকেলে মুক্তারিয়া ঘাট। ভাড়া পড়বে ৭০টাকা করে। সেখান থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় নিঝুম দ্বীপ ঘাট। ভাড়া জনপ্রতি ১০টাকা।

এরপর আবারও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে করে যেতে হবে নামার বাজারে (নিঝুম দ্বীপ)। সেজন্য আপনাকে ভাড়া দিতে হবে ৬০ টাকা।

12932986_1597346830525856_7331981046107717845_n

লঞ্চে যেতে চাইলেঃ
লঞ্চে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে হাতিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রতিদিন ১ টা লঞ্চ বরাদ্দ রয়েছে একটার নাম “এম.ভি ফারহান – ৩” অন্যটা “এম.ভি ফারহান – ৪”। দুইটা লঞ্চ রোটেশন পদ্ধতিতে ডেইলি ১ টা করে ছেড়ে যায়, প্রতিদিন বিকাল ৫.৩০ মিনিটে লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে যায়, লঞ্চ ১ মিনিট ও লেট করে না, আপনি দেরি করলেও কিন্তু লঞ্চ দেরি করে না তাই সাবধান। হাতিয়ার উদ্দেশ্যে সদরঘাট থেকে বিকেল সাড়ে ৫ টায় ছেড়ে যাওয়া লঞ্চ কালিগঞ্জ (মেহেন্দীগঞ্জ) – বিশ্বরোড (ভোলা) – দৌলত খাঁ (ভোলা) – মির্জাকালু – শরাশগঞ্জ – ভোলা তজুমুদ্দিন – মনপুরা (রামনেওয়াজ লঞ্চ ঘাট) হয়ে হাতিয়ার তমুরদ্দী ঘাটে সাধারণত পৌঁছায় পরদিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে নয়টার মধ্যে। নিঝুম দ্বীপ এ যেতে হলে নামতে হবে লাস্ট ঘাট হাতিয়ার তমুরদ্দী । আবার ঢাকায় ফেরত যাবার লঞ্চ ছাড়ে দুপুর সাড়ে ১২ টায়।

যোগাযোগঃ- এম.ভি ফারহান ৩- ০১৭৮৫৬৩০৩৬৬। এম.ভি ফারহান ৪- ০১৭৮৫৬৩০৩৬৮, ০১৭৮৫৬৩০৩৬৯, ০১৭৮৫৬৩০৩৭০।
ভাড়াঃ ডেকে ৩৫০ টাকা, আবার ২৫০ টাকা দিয়েও যাওয়া যায়। কেবিন সিঙ্গেল- ১২০০ টাকা, ডাবল কেবিন -২২০০ টাকা, ভিআইপি কেবিন -৩৫০০-৪০০০ টাকা।

তমুরদ্দী ঘাটে নেমে বেবি টেক্সিতে (৫০০-৬০০ টাকা) সরাসরি মোক্তারিয়া ঘাটে যেতে পারেন আবার সরাসরি মোটর সাইকেলযোগেও মোক্তারিয়া ঘাট এ যাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে ভাড়া দুই জন ৩০০ – ৩৫০ টাকা, দর দাম করে নেওয়াই ভাল। সেখান থেকে ট্রলারে ১০ মিনিট লাগবে নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলা ঘাটে ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা করে । এরপর আপনি নামার বাজার থাকতে চাইলে ভ্যান/রিক্সা/মোটর সাইকেল এ যেতে হবে। ভাড়া দুইজন ৮০-১০০ টাকা মটরসাইকেলে । এছাড়া আপনি ট্রলার রিজার্ভ করে যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার ভাড়া ট্রলার সাইজ অনুযায়ী ৩৫০০ থেকে ৫০০০ টাকার মত । সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ভাল ট্রলার নেওয়া উত্তম মাঝ নদীতে না হলে ধুকতে ধুকতে আপনার জার্নির বারটা বাজিয়ে ছাড়বে।

12920461_1597346747192531_5955073510447100694_n

ভ্রমণে দরকারি টিপস্ঃ
শুধুমাত্র রবি এবং গ্রামীনফোন এর নেটওয়ার্ক পাবেন। তাই যাবার আগে এই দিকে খেয়াল রাখা উচিত । বিদ্যুতের ঘাটতি আছে দ্বীপে শুধুমাত্র রাতে বাজারে সোলারে চার্জ দিতে পারবেন। তাই পাওয়ার ব্যাংক নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আর খরচ?
মোটর সাইকেল ওয়ালারা নিঝুম দ্বীপে নামার সাথে সাথে ঘিরে ধরে , ভুলেও এদের নিয়ে কোন হোটেলে যাওয়া উচিত না।

১. নিঝুম রিসোর্ট (অবকাশ হোটেল) নামার বাজারঃ অবকাশ পর্যটন লিমিটেড এর একটা রিসোর্ট হল নিঝুম রিসোর্ট যা নামার বাজার সী বীচ এর কাছে অবস্থিত। নিঝুম রিসোর্ট থাকার জন্য একটি ভালো মানের রিসোর্ট।

ভাড়াঃ ২ বেড এর VIP রুমের ভাড়া ২০০০ টাকা , ২ বেড এর Executive রুমের ভাড়া ১৫০০ টাকা, ৩ বেড এর Executive রুম ভাড়া ১৮০০ টাকা, ৪ বেডের Executive রুম ভাড়া ২০০০ টাকা, আর ৫ বেড এর ফ্যামিলি রুমের ভাড়া হল ৩০০০ টাকা এবং ৫ বেড এর ডরমেটরি রুম ভাড়া ১৮০০ টাকা ও ১২ বেড এর ডরমেটরি রুম ভাড়া ৩০০০ টাকা।
ডরমেটরি রুমে অতিরিক্ত প্রতি জন থাকলে ২০০ টাকা করে দিতে হবে। প্রতিটিতে এটাচ ওয়াশরুম আছে।
দুপুর ১২ টার আগে চেক আউট করতে হবে। অফ সিজনে রুম ভাড়ায় ৫০% ডিসকাউন্ট পাওয়া যায় ( এপ্রিল ১৫- সেপ্টেম্বর ৩০ )।

12928279_1597346853859187_5463588069053133785_n

যোগাযোগঃ ঢাকা অফিসঃ অবকাশ পর্যটন লি., আলহাজ সামসুদ্দিন ম্যানসন (নবম তলা), ১৭ নিউ ইস্কাটন রোড, ঢাকা। ফোন : ৮৩৫৮৪৮৫, ৯৩৪২৩৫১, ৯৩৫৯২৩০, ০১৫৫২৩৭২২৬৯।
নিঝুম দ্বীপ অফিসঃ সবুজঃ ০১৭২৪-১৪৫৮৬৪, ০১৮৪৫৫৫৮৮৯৯ , ০১৭৩৮২৩০৬৫৫

২. মসজিদ বোর্ডিং, নামার বাজারঃ এটা থাকার ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে সস্তা । স্থানীয় মসজিদ থেকে এই ব্যবস্থা করেছে, দুইটা সিঙ্গেল এবং দুইটা ডবল রুম আছে, আর সব ডরমেটরি । ডরমেটরি – ভাড়া ২০০ – ৩০০ টাকার মত । এই বোর্ডিং-এ কোনো এটাচ বাথরুম এবং জেনারটরের ব্যবস্থা নাই। ২টি কমন বাথরুম এবং একটি টিউবওয়েল আছে।

৩. হোটেল শাহিন, নামার বাজারঃ এই হোটেলটি নতুন। ১০০০ টাকার রুমের ভাড়া ২৫০০ টাকা চাইবে। যাই হোক ফোন নম্বরঃ ০১৮৬৩১৫০৮৮১
এই বোর্ডিং-এ থাকার জন্য বুকিং করতে যোগাযোগঃ মোঃ আব্দুল হামিদ জসিম, কেন্দ্রিয় জামে মসজিদ, নামার বাজার, হাতিয়া, নোয়াখালী। ফোনঃ ০১৭২৭-৯৫৮৮৭৯।

৪. হোটেল দ্বীপ সম্পদ নামার বাজারঃ ফোনঃ ০১৭২০ ৬০১ ০২৬, ০১৭৬০ ০০৮১০৬। (সৈয়দ চাচার থাকা এবং খাওয়ার হোটেল)

৫. নিঝুম ড্রিম ল্যান্ড রিসোর্ট, বন্দরটিলাঃ নতুন খোলা এই রিসোর্টের পরিবেশ ভালোই। যোগাযোগঃ ঢাকা বুকিং অফিসঃ০১৮৪৭১২৩৫৭৩ নিঝুমদ্বীপ বুকিং অফিসঃ০১৮৪৭১২৩৫৭২

৬. জেলা প্রশাসন ডাক বাংলো।

10399587_1597346770525862_3728578380729856688_n

ক্যাম্পিং সুবিধাঃ
ক্যাম্পিং হতে পারে খুব মজার একটা আইডিয়া। আপনাকে ক্যাম্পিং এর জন্যে স্থান নির্বাচনে তেমন চিন্তা ভাবনা করতে হবে। পুরো দ্বীপেই প্রায় সব জায়গায় আপনি ক্যাম্পিং করতে পারেন চাইলে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে যতটুকু জানা যায় নিরাপদেই দ্বীপে ক্যাম্পিং করা যায়।

সূত্রঃ blog.monju.me