মেইন ম্যেনু

নিষ্পাপ রাষ্ট্রে অপরাধী তনু !

ইয়াসিন মাহমুদ : একটি দেশ, একটি সমাজের দায়িত্ব কী? রাষ্ট্রের নাগরিকদের সার্বিক দেখভাল,তাদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা, পথ দেখানো একটি সরকারেরও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন নির্যাতিত হয়ে সুবিচারের প্রার্থনা করে তখন একটি সরকারের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় তা সমাধানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু বিপরীতটা আমাদের দেখতে হচ্ছে। সরকার কেনো একটি দেশের জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিবে, প্রতিপক্ষ বানাবে? সরকার কারো প্রতিপক্ষ নয়, কল্যাণীয় মনোভাব নিয়ে, দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে স্ববান্ধবে জনগণের কল্যাণে এগিয়ে আসবে এটাই তো প্রত্যাশা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী, নাট্যকর্মী সোহগী জাহান তনু হত্যার পর কুমিল্লা সহ সারা দেশের সচেতন মহল আন্দোলনে নামে। অথচ আন্দোলন করার কী খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো? নাকি সরকারের দায়িত্ব অপরাধীকে খুঁজে বের করে শাস্তি প্রদান করা? ১৯ বছরের একজন তরুণী সোহাগী জাহান তনু। প্রতিটি মানুষের জীবনে কতো না স্বপ্ন থাকে। তনুদের জীবনেও এর ব্যতিক্রম ছিলো না । এখনো আমাদের সমাজে মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষিত করা নিয়ে রয়েছে নানা কথা দ্বন্দ্ব। তাঁর পরেও আশ পাশের পাঁচ কথাকে পিছনে ফেলে দারিদ্রতাকে জয় করার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছিলেন উদ্যোগী ও উদ্যোমী তরুণী তনু।পরিবারের বোঝা না হয়ে আগামীর সম্পদ হয়ে ওঠার তাগাদা ছিলো তাঁর মনে। তাই পড়াশোনাকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য টিউশনি ও করতো তনু। প্রতিদিনের মতো ২০ মার্চ কুমিল্লার ময়নামতি সেনানীবাস এলাকায় টিউশনিতে গিয়েছিলো তনু। কিন্তু আর ফেরা হলো না তনুর। তনু ফিরছিলো রক্তমাখা লাশ হয়ে। আজীবনের জন্য চলে গেলো না ফেরার দেশে, প্রাণহীন লাশের মিছিলে। মৃত্যুর কারণ উল্লেখ নেই,ধর্ষণেরও আলামত মেলেনি ( দৈনিক প্রথম আলো, ৫ এপ্রিল, ২০১৬) ৪ এপ্রিল কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয় হয়েছে -তাঁর মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত। ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি। ভিসেরা পরীক্ষায় কোনো প্রকার বিষক্রিয়া বা রাসায়নিকের প্রমাণও পাওয়া যায়নি । প্রথম ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষার পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক অধ্যাপক কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, তনুর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে মিডিয়া কর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন- ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে কোনো কিছু পাওয়া না গেলে আমি বলব? আমি তো ডাক্তারের ওপরের কোনো ব্যক্তি না। আমার মেয়ের নাকে আঘাত,কানের নিচে আঘাত ,মাথা থেতলানো এসব কি সব মিছা? এ যে দেখি নিষ্পাপ রাষ্ট্রে অপরাধী তনু। ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ (২৮ মার্চ,২০১৬ দৈনিক প্রথম আলো ) সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর ফুঁসে ওঠে সারাদেশের মানুষ । মুখে মুখে তনুকে নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। সাথে বিচারের দাবিতে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলো। নড়ে চড়ে বসে দেশের বুদ্ধিজীবীমহলও। বিশেষ করে গণজাগরণ মঞ্চ এর ভূমিকা চোখে পড়ার মতো । ২৭ মার্চ কুমিল্লা নগরের কান্দির পাড় পূবালী চত্বরে সমাবেশ শেষে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেনÑ প্রধানমন্ত্রী ইয়াসমিন হত্যার সময় রাস্তায় নেমেছেন । আমরা চাই তনু হত্যার বিষয়েও মাঠে নামবেন। তনু যদি মন্ত্রী,রাজনীতিবিদদের মেয়ে হতো ক্যান্টনমেন্ট থেকেও কতজনকে ধরে নিয়ে যেতো। কিন্তু তনুর জন্য কাউকে ধরবে না । তনু হত্যার পর পরই সারা দেশে বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্টজনরা ব্যাপক তর্জন গর্জন নিয়ে জেগে উঠলেও ক ’দিনের ব্যবধানে সবাই কীপ সাইল্যান। নীরব নিরবতা । ইদানিং প্রতিটি ইস্যুতে এমনটি পরিলক্ষিত। তবে নেপথ্যের কারণ শুধু অজানাই রয়ে যায় । কোনো ঘটনা ঘটার পর মূল রহস্য উদঘাটন না করে খোঁজা হয় আশ পাশের সাত -পাঁচ । শাক দিয়ে মাছ ঢাকার হীনতাও কম ঘটে না। তনু হত্যার পরও সেই বিষয়টি চলে আসে। তনুর বাবা মা-চাচাতো বোনকে র‌্যাবের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা রাতভর জিজ্ঞাসা করেন। এমনকি তনুর সঙ্গে তাঁর কলেজের কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো কিনা সেটি জানতে চায়। কিন্তু কেনো এতো সব আয়োজন ? দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে এখন সি. সি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। অপরাধীকে দ্রুত খুঁজে বের জন্য এই আয়োজন । এদিকে একটি সেনানী বাসের ভিতরে একজন তরুণী খুন হলো আর কিছুই জানে না তাঁর ভিতরকার দায়িত্বরত সেনা সদস্যরা । একদম লা জবাব। তনুর মৃত্যুর সংবাদ শুনে তাদের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। যেখানে একটি সুঁচ পড়লেও খুঁজে বের করা যায় অথচ উনারা কিছুই জানেন না। মামার বাড়ির গল্প যদি মায়েই না বলতে পারে তাহলে ঘটনাটি কী হলো? ঐ সেনানীবাসের সদস্যদের দায়িত্ব বা কী ? তনু হত্যার রহস্য সম্পর্কে শিগগির জানানো হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী । (৩ এপ্রিল,১৬) ২রা এপ্রিল শনিবার দুপুরে মাদারীপুরে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জেলা সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় এ ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য নেই। তবে আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী এধরনের কোনো ঘটনায় ফেল করেননি। তনু হত্যার রহস্য উদঘাটনেও ফেল করবে না । বিচারহীনতার সংস্কৃতি এতটাই বেড়েছে যে দিন দিন ন্যায়বিচার শব্দটি ডিকশনারী থেকে উঠে যাচ্ছে বোধ হয়। নামকা ওয়াস্তে শুধু একটি বিচারালয়ের স্তম্ভ দেখি। দীর্ঘ এক মাস অতিবাহিত হলেও আজো তনু হত্যার রহস্যের মূল কাহিনী জানা যায়নি । যাই হোক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা বাস্তবে রুপায়ণ হোক। জজ মিয়া নাটক হলে কেউ গ্রহণ করবে না । (প্রথম আলো,১লা এপ্রিল ,১৬) কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর কুমিল্লায় ৩০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেনÑপ্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অন্য খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে। তনু হত্যার প্রকৃত অপরাধীকে ন্যায়বিচারের আওতায় আনা হলে সবার ভাবমূর্তি উন্নত হবে। কোনো জজ মিয়া নাটক বা ঘটনা ভিন্ন দিকে নেওয়া হলে তা কেউ গ্রহণ করবে না । প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জজ মিয়া নামে নোয়াখালীর এক নিরীহ যুবককে গ্রেপ্তার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিলো। পরের বিষয়টি সাজানো বলে প্রমাণিত হয় যা জজ মিয়া নাটক হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রতিনিয়ত আমাদের চার পাশে কোনো ঘটনা ঘটলে মূল অপরাধীকে আড়াল করে নিরীহ, নিরাপরাধী মানুষদেরকে সাজা দেওয়ার নজির এখন ঢের। মূল হোতা থাকছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে । উপরের নির্দেশে বীরদর্পে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে অপরাধীর নায়কেরা । আর কুপোকাত হয়ে দিনের পর দিন শ্রীঘরে পঁচতে থাকছে শান্ত প্রিয় মানুষ গুলো। যাই হোক মানবাধিকার কমিশনারের মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। বাস্তব কথাটি তিনি তুলে ধরেছেন অকোপটে। কিন্তু কোনো ঘটনা ঘটলে শুধু বিবৃতি দেওয়াই কী তাঁর দায়িত্ব ? তনু হত্যার বিচার জজ মিয়া নাটক না হোক সেই প্রত্যাশা । প্রার্থনা ওপরের ভুবনে ভালো থাকুক তনুরা ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি এবং আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)