মেইন ম্যেনু

ন্যাপকিন ব্যবহার করে না যৌনপল্লির ১৬%বাসিন্দা

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যৌনকর্মী এবং তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও ক্রমে বাড়ছে সচেতনতা৷ অথচ, স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার জন্য নেই আর্থিক সামর্থ্য৷ আর, তার জেরেও, এখনও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না কলকাতার বিভিন্ন যৌনপল্লির ১৬ শতাংশ বাসিন্দা৷

যৌনপল্লিগুলির ওই সব বাসিন্দার মধ্যে যেমন রয়েছেন বিভিন্ন বয়সি যৌনকর্মীরা৷ তেমনই রয়েছেন তাঁদের সন্তানরাও৷ যে কারণে, ৫০ শতাংশ কম দামে যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে পারেন কলকাতার বিভিন্ন যৌনপল্লির ওই সব বাসিন্দা, তার জন্য প্রচেষ্টা জারি রেখেছে পশ্চিমবঙ্গের যৌনকর্মীদের অন্যতম সংগঠন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি৷ ওই প্রচেষ্টার অঙ্গ হিসেবে ২০১৬-র ডিসেম্বর নাগাদ বাজারে আসতে চলেছে ‘ঊষা’ ব্র্যান্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিন৷

২৮ মে আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবস৷ অন্য বছরের মতো এ বারও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই দিবস পালন করেছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি এবং তার শাখা সংগঠন আমরা পদাতিক৷ এই বছর কালীঘাটের যৌনপল্লিতে পালিত হয়েছে যৌথ উদ্যোগের ওই আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবস৷ শুধুমাত্র মহিলারা নন৷ রক্তস্রাবের সময় যাতে উপেক্ষিত না থাকে মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি, তার জন্য পুরুষদের মধ্যেও আরও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন৷ যে কারণে, অন্য বছরের মতো এ বারও কালীঘাটের যৌনপল্লির ওই অনুষ্ঠানে স্লোগান রাখা হয়েছিল, ‘মাসিক নিয়ে লজ্জা নাই / ভয় ভাঙাতে আমরা সবাই’

তবে, শুধুমাত্র বিশেষ এই দিনটি-ই নয়৷ রক্তস্রাবের সময় কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে স্বাস্থ্য, সেই বিষয়ে বিভিন্ন উপায়ে বছরভর যৌনকর্মী এবং তাঁদের সন্তানদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে চলেছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি৷ কিন্তু, স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে যৌনকর্মীদের এই সংগঠনের অধীনে থাকা এ রাজ্যের যৌনপল্লিগুলির বাসিন্দাদের অবস্থা এখন কোন অবস্থায় রয়েছে? গত বছর দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির তরফে জানানো হয়েছিল, ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে না স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ যদিও, সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়ায়, তার আগের দুই বছরের তুলনায় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হার বেড়েছে বলেও জানানো হয়েছিল৷

যে কারণে, বছর তিনেক আগে যেখানে কলকাতার বিভিন্ন যৌনপল্লির বাসিন্দাদের মধ্যে ৪০ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত না স্যানিটারি ন্যাপকিন, গত বছর সেখানে ওই হার ২১ শতাংশে পৌঁছতে পেরেছিল৷ আর, এক বছর পর? দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মুখ্য উপদেষ্টা ডাক্তার স্মরজিৎ জানা বলেন, ‘‘আগের তুলনায় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হার এখন আরও বেড়েছে৷ কলকাতার যৌনপল্লিগুলিতে গত এক বছরে এই হার বেড়েছে পাঁচ শতাংশ৷’’ অর্থাৎ, এখনও ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে না স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ যদিও, সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চলছে৷ তা হলে, এখনও কেন ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে না স্যানিটারি ন্যাপকিন, সমস্যা কোথায়?

ডাক্তার স্মরজিৎ জানা বলেন, ‘‘স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের জন্য সচেতনতা বাড়ছে৷ তবে, স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার জন্য আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় এখনও ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে না৷ এখনও যাঁরা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারছেন না, তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন বিভিন্ন বয়সি যৌনকর্মীরা, তেমনই রয়েছেন তাঁদের সন্তানরাও৷’’ এ ক্ষেত্রে কী করছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি? ডাক্তার স্মরজিৎ জানা বলেন, ‘‘স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে সোশ্যাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ২০ শতাংশ কম দামে যৌনকর্মী আর তাঁদের সন্তানদের জন্য আমরা বিক্রি করছি৷ তবে, আমরা নিজেরাই স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন করতে পারলে, ৫০ শতাংশ কম দামে যৌনকর্মী আর তাঁদের সন্তানদের জন্য তুলে দিতে পারব৷’’mhd.04

দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির অধীনেই রয়েছে ঊষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড৷ গত বছর ডাক্তার স্মরজিৎ জানা বলেছিলেন, ‘‘ব্র্যান্ড হিসেবে ঊষা-কে ব্যবহার করে আমরা স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে আনতে চলেছি৷ এ জন্য এইচএলএল লাইফকেয়ার লিমিটেড এবং মেডিকেয়ার, এই দুটি সংস্থার সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘‘পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে আমরা ওই সংস্থায় বিনিয়োগ করব৷ চুক্তি অনুযায়ী, ঊষা নামে স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে আনা হবে৷ পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদের যৌনকর্মী এবং তাঁদের সন্তানদের একটি অংশ ওই দুই সংস্থায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন৷ তৃতীয় পর্যায়ে আমরা নিজেরাই স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন করব আমাদের নিজস্ব পরিকাঠামোয়৷ বারুইপুরে আমাদের যে জমি রয়েছে, সেখানেই আমরা স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদনের জন্য পরিকাঠামো গড়ে তুলব৷’’

ওই স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদনের জন্য ঊষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড যেমন বিনিয়োগ করবে, তেমনই আবার ঋণ-ও নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল৷ ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৫-র ডিসেম্বর অথবা ২০১৬-র জানুয়ারি মাসে বাজারে চলে আসত ঊষা স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ তা হলে, সমস্যা কোথায়? ডাক্তার স্মরজিৎ জানা বলেন, ‘‘মেডিকেয়ার সংস্থার তরফে সেভাবে আর সাড়া মেলেনি৷ তবে, আমরা এখন এইচএলএল অর্থাৎ হিন্দুস্তান লেটেক্স লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করতে চলেছি৷ আশা করছি ২০১৬-র ডিসেম্বর নাগাদ বাজারে চলে আসবে ঊষা স্যানিটারি ন্যাপকিন৷’’ তবে, পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঊষা স্যানিটারি ন্যাপকিন যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন দোকানেই বিক্রি হবে, তাও নয়৷ দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মুখ্য উপদেষ্টা বলেছেন, ‘‘আমাদের উৎপাদিত স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন যৌনপল্লি সহ বিভিন্ন দোকানেও বিক্রি হবে৷ তার পরে বিহার, ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন যৌনপল্লি সহ ওই দুই রাজ্যের বিভিন্ন দোকানে বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে৷’’

ঊষা স্যানিটারি ন্যাপকিনের জন্য গোটা পরিকল্পনা বছর দু’য়েকের মধ্যে রূপায়িত হবে বলেও জানিয়েছেন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মুখ্য উপদেষ্টা৷ অন্যদিকে, নিজস্ব পরিকাঠামোয় স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদনের ফলে যৌনকর্মী এবং তাঁদের সন্তানদের একটি অংশ যেমন সেখানে কাজ করে উপার্জনের সুযোগ পাবে, তেমনই আবার লাভবান হবেন ঊষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সদস্যরাও৷ কারণ, যৌনকর্মীরা সঞ্চয় করেন এই ঊষা মাল্টিপারপাস সোসাইটি কো-অপারেটিভ লিমিটেডে৷ আর, তাঁদের ওই সঞ্চয় অন্য কোনও ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে যে আয় হয়, তার অংশ আবার দেওয়া হয় ওই যৌনকর্মীদের৷ যে কারণে, ঊষা স্যানিটারি ন্যাপকিনের হাত ধরেও পশ্চিমবঙ্গের যৌনকর্মীরা আরও সাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পাবেন বলে মনে করছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি৷