মেইন ম্যেনু

পতিতাবেশে সন্ন্যাসিনী: মানবতার গোপন রক্ষী

মানবতার অবতার যীশু খ্রিস্টের জন্ম, মৃত্যু এবং পুনরুত্থান নিয়ে অনেকগুলো গস্পেল রয়েছে, তার মধ্যে মার্কের গস্পেলে বলা হয়েছে যীশু খ্রিস্ট একদা কিভাবে এক মৃত কন্যাশিশুকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তিনি মৃত শিশুটির সামনে দাঁড়িয়ে এরামায়িক ভাষায় বলেছিলেন, ‘তালিথা কুম’ অর্থাৎ ছোট্ট শিশু! আমি বলছি তুমি জেগে ওঠো।

যীশু খ্রিস্টের এই গল্প মানবতার চেতনা বহন করে। তিনি চলে গেছেন দুই হাজার বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু তার দেয়া চেতনা এখনো রয়ে গেছে, অন্তত কিছু মানুষের মধ্যে। এরকমই একদল মানবী জোট বেঁধে অতি সঙ্গোপনে নিরলস করে যাচ্ছেন এমন এক কাজ যা কেউ চিন্তাও করতে পারবে না। শুধু মানবী না বলে এদেরকে বলা উচিত সন্ন্যাসিনী। তবে তারা প্রথাগত স্বার্থপর সন্ন্যাস জীবনযাপন করেন না, তারা সত্যিকার সন্ন্যাসিনী। তারা এমন সন্ন্যাসিনী যারা প্রয়োজনে হতে পারেন বেশ্যা, হতে পারেন দিনমজুর কিংবা দাসী। এই ব্যতিক্রমি সন্ন্যাসিনীদের দলের নাম ‘তালিথা কুম’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কি এমন প্রয়োজনে এই সন্ন্যাসিনীদেরকে সাজতে হবে বেশ্যা এবং বেশ্যা সেজে তারা মানবতার কি এমন কাজ সাধন করছেন?

পৃথিবীতে যতগুলো পুরাতন লাভজনক ব্যাবসা আছে মানব পাচার তার মধ্যে একটা। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা ১ ভাগ মানুষ যে কোন উপায়ে প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবীর জনসংখ্যা যদি হয় সাড়ে সাতশো কোটি তাহলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ এই পাচারের শিকার। আরো দুঃখের সংবাদ হচ্ছে, এই সাড়ে সাত কোটি মানুষের শতকরা ৭০ ভাগ হচ্ছে নারী এবং শিশু, যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। এটা এতই লাভজনক ব্যাবসা যে এর সাথে জড়িত সমাজের প্রভাবশালী সব মানুষ এবং এটা যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই সত্য। সবাই জানে মানব পাচার মানবতা বিরোধী একটা কাজ কিন্তু চাইলেই তো এটা বন্ধ করা যাচ্ছেনা। বাস্তবতা হচ্ছে দাসী এবং যৌনকর্মী হিসাবে নারী এবং শিশুদের পাচার বন্ধের কোনো উপায় নেই। সবাই ধরেই নিয়েছে এটা থাকবে এবং এখানে করণীয় একটাই, সেটা হচ্ছে যতটুকু সামলে রাখা যায়। কিন্তু যে সমস্ত নারী শিশু প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে তারা ভয়াবহ যৌন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং বন্দী অবস্থায় যাপন করছে মানবেতর জীবন। তাদের কি হবে? তাদেরকে কি বাঁচানো সম্ভব? কিভাবে সম্ভব? সরাসরি তো সম্ভব না, কারন তাদেরকে গোপনে আটকে রাখা হয় পৃথিবীর অন্ধকারতম জায়গাগুলোতে। তাদের খোঁজ পেতে হলে যেতে হবে বেশ্যালয়ে।

তালিথা কুমের সন্ন্যাসিনীরা ঠিক এই কাজটাই করেন। তারা পতিতা সেজে হামলা দেন পতিতালয়ে, খুঁজে বের করেন পাচার হওয়া নারী এবং শিশুদের। তারা এমনকি দাস হিসাবে বিক্রি করে দেয়া শিশুদেরকেও টাকা দিয়ে কিনে নেন এবং তাদের পুনর্বাসন করেন।

তালিথা কুম সঙ্ঘের চেয়ারম্যান জন স্টুডজিন্সকি বলেছেন, তাদের দলের প্রায় ১১ শো সন্ন্যাসিনী বিশ্বের প্রায় ৮০ টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে মানব পাচারের বিরুদ্ধে তাদের এই গোপন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পাচার এবং দাসত্বের বিরুদ্ধে এই লড়াই দিনকে দিন আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। কাজেই তাদেরকে লোকবল বাড়াতে হচ্ছে। খুব শিগগিরি তারা ১৪০ টি দেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছেন।

মানবতাবাদী জন স্টুডজিন্সকি আরো বলেন, আমি ব্যাপারটাকে রোমাঞ্চকর বা উত্তেজনাপূর্ণ করার জন্য বলছি না কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীতে সরলতার বড় অভাব, এখানে অশুভ শক্তির প্রভাব বেশি।

পাচারকৃতদের মধ্যে যৌনদাসীদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। তাদের উপর নির্মম অত্যাচার করা হয়। একদিনে ১৫ থেকে ২০ বার জোরপূর্বক শারীরিক মিলন করাতে বাধ্য করানো হয় এবং এটা করতে না পারলে তাদেরকে খাবার না দিয়ে আটকে রাখা হয় দিনের পর দিন এবং মারধর করা হয়। একটি নারীকে দিয়ে যত বেশি যৌন মিলন করানো যায়, পাচারকারীরা তত বেশি টাকা পায়। এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেক নারীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়।

সন্ন্যাসিনীরা পাচারকৃত নারীদের উদ্ধারে যে কোনো কাজ করতে প্রস্তুত। তারা পতিতার বেশে রাস্তায় এবং পতিতালয়ে যান, ধীরে ধীরে খুঁজে বের করেন যৌন দাসীদের মুক্তির উপায় কিন্তু তারা নিজেদের পরিচয় নিখুতভাবে গোপন রাখেন। তারা এই কাজে প্রশিক্ষিত। কাজের ক্ষেত্রে তারা কোনো প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসন কিংবা সরকার কাউকে বিশ্বাস করেন না। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে তারা রক্ষা করেন অসহায় নারীদের।

এছাড়া আফ্রিকা, ব্রাজিল, ফিলিপাইন এবং ভারতে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করে দেয়া শিশুদেরকে কেনার জন্য টাকাও জোগাড় করেন এই মহৎ হৃদয় সন্ন্যাসিনীরা। কেনার পরে তাদের পুনর্বাসন করেন এবং সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।

মুখে বড় বড় নীতি কথা বলা সহজ কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক সময় সবচেয়ে সঠিক কাজটা করতে হয় সবচেয়ে কুৎসিত উপায়ে। সঠিক কাজ কোনটা সেটা আমরা সবাই জানলেও কেউ সেটা করার সাহস দেখাই না কিন্তু তালিথা কুমের সন্ন্যাসিনীরা সেটা করে দেখিয়েছেন। অত্যাচারী মানুষের আঘাতে মৃতপ্রায় নারী এবং শিশুদের উদ্দেশে তারা যেন অনেকটা যীশু খ্রিস্টের মত বলছেন, ‘তালিথা কুম’ অর্থাৎ জেগে ওঠো।



« (পূর্বের সংবাদ)
(পরের সংবাদ) »