মেইন ম্যেনু

পতিতালয়ে বিক্রি হওয়া দুই বাংলাদেশী তরুণীর কষ্টের কথা…

পারিবারিক অসচ্ছলতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ভালো চাকরির প্রলোভনে অসংখ্য তরুণীকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হচ্ছে। সেখানে পতিতালয়ে তাদের বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। সেখানে ফাঁদে পড়ে দেশান্তরী হওয়া নারীদের ওপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আর এ নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। খবর যুগান্তর।

এর একটি নড়াইল সিন্ডিকেট। ভারতের পতিতালয়ে বিক্রি হওয়া ৭৪ তরুণীকে সম্প্রতি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যৌন ব্যবসায় নিয়োজিত হওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন ভারত থেকে উদ্ধার হওয়া দুই তরুণী। লোমহর্ষক ঘটনা প্রবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথমে বিব্রতবোধ করেন এদের একজন। একপর্যায়ে সাহস জোগালে খুলনার তরুণী রুবিনা (ছদ্মনাম) বলে ওঠেন, কাউকে ভাই ডাকতেও এখন ভয় লাগে। আমরা চার বোন। ভাই নেই, তাই রুবেলকে (দালাল) বিশ্বাস করে ভাই ডেকেছিলাম, সেই রুবেলই আমার সর্বনাশ করেছে। আমাকে ভারতে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিল। এ কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন ওই তরুণী। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাইটস যশোর কার্যালয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

পরিবারের দুর্দশার বর্ণনা করে রুবিনা বলেন, চার বোন ও মাকে ফেলে রেখে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে ঢাকায় সংসার করছেন। আমাদের কোনো খোঁজ নেন না। সেই ছোট্ট বেলা থেকে দেখছি মা মজুরের কাজ করে সংসার চালান। বড় মেয়ে হিসেবে আমি খুব কষ্ট পেতাম। মনে মনে চাকরি খুঁজছিলাম। একপর্যায়ে বান্ধবীর স্বামী রুবেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাকে ভাই ডাকি। তাকেই বলেছিলাম ভাই সংসারে মেলা অভাব, একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। রুবেল বলেছিল, ভারতে ভালো চাকরি আছে। বাসাবাড়িতে কাজ করবি, বেতনও পাবি মেলা টাকা। রুবেলের কথায় বিশ্বাস করে চাকরির লোভে মাকে না জানিয়ে বাড়ি ছাড়ি। রুবেল আমাকে বেনাপোলের পুটখালি সীমান্ত দিয়ে ভারতে দিল্লি নিয়ে এক দেহ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেয়। এরপর ওই ব্যবসায়ী আরেকজনের কাছে আমাকে বিক্রি করে দেয়। এরপর দেখি একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে একগাদা মেয়ে। সেখানে আমাকে রাখা হয়। আমি খুব কেঁদেছিলাম। একটা মেয়ে এসে বলল কিছু করার নেই। তুই বিক্রি হয়ে গেছিস।

পতিতালয়ে নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে রুবিনা বলেন, দিল্লির একটা পতিতালয়ে ছিলাম ছয় মাস। সেখানে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। সেখানে এক খদ্দেরের (কলকাতার ছেলে) সঙ্গে ভাব জমিয়ে তুলি। তাকে বলেছিলাম আমাকে বাঁচান। আমি দেশে ফিরে যাব। ওই ছেলেটির কথামতো একদিন খুব সকালে পতিতালয় থেকে পালাই। ওই ছেলেটি আমাকে বোম্বের ট্রেনে তুলে দিয়েছিল। বোম্বে স্টেশনে আসার পর একটা মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। সে আমাকে খুব আদর-যত্ন করে। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি ওই মেয়েটিও ছিল দালাল। ওই মেয়েটি আমাকে পুনে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়। সেখানে ছয় মাস থাকার পর রেস্কি ফাউন্ডেশন আমাকে উদ্ধার করে। রেস্কি ফাউন্ডেশনে দুই বছর থেকেছি। ওই সংগঠনের কার্যালয়ে আমার মতো উদ্ধার হওয়া মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আমি বিউটি পার্লার আর সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। সব মিলিয়ে তিন বছর ভারতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করে দেশে ফিরেছি।

রুবিনার মতো ঢাকার মেয়ে মাহীর (ছদ্মনাম) পাড়ার একটি মেসের এক ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। মাহী জানান, পরিচয়ের সুবাধে ফরিদপুরের ওই ভাইয়ের কাছে পার্টটাইম চাকরি চেয়েছিলেন। ওই ভাই তাকে কম্পিউটার কম্পোজের চাকরি দিতে চেয়েছিল। চাকরির প্রলোভনে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনো একদিন দুপুরে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হই। ওই যুবক তাকে শ্যামলী নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাসে তোলে। এরপর পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে বেনাপোলে নিয়ে যায়। এরপর পুটখালি সীমান্তে এক দালালের বাড়িতে রেখে ভারতে পাচার করে দেয়। এরপর পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ শহরের একটি বাড়িতে রাখা হয় মাহীকে। সেখানে দুদিন রাখার পর বোম্বের পুনে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়। সেখানে খদ্দের ও দালালদের নির্যাতনের শিকার হন মাহী। একপর্যায়ে ২০১৪ সালের ৬ জুলাই একটি এনজিও পতিতালয় থেকে তাকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর এনজিও তাকে প্রশিক্ষণ দেয়। সর্বশেষ ৩ জুলাই পাচার হওয়া ৭৪ বাংলাদেশী দেশে ফিরে আসে।

শুধু রুবিনা কিংবা মাহী নয়, তাদের মতো শত শত তরুণী চাকরি প্রলোভনে ভারতে পাচার হচ্ছে প্রতিবেশী, বন্ধু ও স্বজনের মতো মুখোশধারীদের দ্বারা। বিক্রির পর তাদের পতিতালয়ে যৌন ব্যবসায় নিয়োজিত করা হচ্ছে। এমন ৭৪ জনকে ৩ জুলাই ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের সবাইকে বিভিন্ন সময়ে দালাল চক্র অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ভালো চাকরির প্রলোভনে ভারতে বিক্রি করে দিয়েছিল। ভারতের বেসরকারি একটি সংস্থা উদ্ধারের পর দীর্ঘমেয়াদি আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা রাইটস যশোর ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে তরুণীদের দেশে পাঠিয়েছে।

পাচার নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ভারতে নারী পাচারে নড়াইল সিন্ডিকেট সবচেয়ে শক্তিশালী। তাদের নেটওয়ার্ক সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। কলকতা, বোম্বে, দিল্লির পতিতালয়ে তরুণীদের বিক্রির সঙ্গে নড়াইল সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর এসএম আহজারুল ইসলাম জানান, নির্যাতিতা নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পর তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষে পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে তাদের।