মেইন ম্যেনু

পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের রহস্য বললেন আইনমন্ত্রী

পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলার পেছনে রয়েছে কিছু রহস্য। কানাডার সুপেরিয়র কোর্টের একটি আদেশের কারণে সেই রহস্য এতদিন গোপন রাখা হয়েছিলো। কিন্তু এ সংক্রান্ত মামলাটি খারিজ হওয়ার পর মুখ খুললেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। কেননা ২০১২ সালের পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের মামলায় তিনি তখন প্রধান আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন শেষে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের পেছনের রহস্য তুলে ধরেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে, পদ্মা সেতুর যে মামলা কানাডার সুপেরিয়র কোর্টে চলছিলো সেটা তারা খারিজ করে দিয়েছে। এটা খারিজ করে দিয়েছে দুটি কারণে। একটি হলো, অন মেরিট আর অন্যটি হলো অন টেকনিক্যাল গ্রাউন্ড। আদালত অন মেরিট যেটা বলেছে সেটা হল- এই মামলায় যা বক্তব্য সেগুলো হচ্ছে গুজব নির্ভর এবং এটার কোনো প্রমাণ নেই। সেই কারণে এটা একটা মামলা হিসেবে চলতে পারে না। দ্বিতীয়টি হলো টেকনিক্যাল। ওয়্যার ট্যাপিংয়ের মাধ্যমেও কোনো তথ্য আসেনি যেটা একটা মামলা সৃষ্টি (পরিচালনা) করার মত। এখন এই মামলা নিয়ে আমি একটু পেছন দিকে যেতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মামলা নিয়ে ২০১২ সালের এই সময়টা খুব গরম আবহাওয়ায় ছিলো। ২০১২ সালে মামলাটা কীভাবে শুরু হলো? সেটা হচ্ছে, একটা পত্রিকায় একটা খবর আসলো যে, বিশ্বব্যাংকে এমন কথা উঠেছে যে পদ্মা সেতু সুপারভিশন কন্ট্রাক্টের ব্যাপারে একটা দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং দুর্নীতি হচ্ছে। তখন দুদক নিয়ম অনুসারে এই খবরের ওপর একটা অনুসন্ধান করতে শুরু করলো।
অনুসন্ধান করা যখন শুরু করলো তখন বিশ্ব ব্যাংক বললো, আমাদের কাছেও তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। আমরা সেই তথ্য দেবো। এই নিয়ে তোমাদেরকে (দুদক) একটি মামলা করতে হবে। বলা হলো, এই দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত তারা হচ্ছেন- তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন, যোগাযোগ সচিব, অন্য যারা এই মন্ত্রণালয়ে আছেন তারা এবং যারা এই কন্ট্রাক্ট নেয়ার চেষ্টা করছেন তারা। তখন একটা পর্যায়ে বিশ্ব ব্যাংক থেকে বলা হলো, দুদক একা নয়। এখানে বিশ্ব ব্যাংক তাদের লোক দিয়ে দুদকের মাধ্যমে অনুসন্ধান করবে। আমরা তখন দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের নেতৃত্বে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বসলাম। সেখানে পরিষ্কারভাবে আমরা বলে দিলাম, আমাদের দেশের আইনে এমন কোনো শর্ত বা নিয়ম নেই যেটা দুদকের করার কথা সেটা অন্য কোনো বিদেশি সংস্থা অনুসন্ধান করবে। এরকম যদি হয় তবে মামলায় করা যাবে না। কারণ মামলা টিকবে না।’
‘এটা যখন বললাম তখন তারা (বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ) বললেন, এটা যদি না হয় তবে আমরা ঋণ দেব না। দুদকের সেসময়কার চেয়ারম্যান, দুদকের পরবর্তী চেয়ারম্যান বদিউজ্জামানের ও কমিশনার সাহাবুদ্দিন আহমেদ চুপ্পুর উপস্থিতিতে সেই মিটিংয়ে তখন আমি বললাম, বাংলাদেশ হলো একটি স্বাধীন দেশ। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ। আমরা আমাদের স্বাধীনতা কারো হাতে তুলে দিতে রাজি না। কারণ এ বিষয়টা যখন বিশ্বব্যাংকের হাতে তুলে দেব তখন তার মানে হয় আমাদের স্বাধীনতা তাদের হাতে তুলে দেওয়া। তিনি বলেন, আমরা ১.২ বিলিয়নের জন্য বা এটা যদি ১.২ ট্রিলিয়ন ইনটু ইনফিনিটি করা হয় তারপরেও আমরা এই ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেয়েছি সেই স্বাধীনতা কারো হাতে তুলে দেবো না। যখন এই কথা বলা হলো তার পরেই কিন্তু টাকা যে দেয়া হবে না সেই ঘোষণা তারা দিয়ে দিলেন।
তারা আরো বললেন, যদি আমরা তদন্ত করতে না পারি তাহলে আমাদের একটা তদন্ত টিম অন্তত দুদকের তদন্ত টিমের সঙ্গে থাকবে এবং তারা সেটা তদন্ত করবে। এখানেও আমি বললাম, আইনে সেটাও বলা নেই। আমরা সেটা দিতে পারি না। আমার এসব কথার সকল নথি এখনও আমার কাছে লিখিত রয়েছে।’
আমরা বললাম, ‘আপনারা যেহেতু অভিযোগকারী যেহেতু একটা জিনিস হতে পারে। আপনাদের তরফ থেকে দুদকের সঙ্গে তদবিরকারী রাখতে পারেন। ফলে এই মামলায় আমরা কতটুকু উন্নতি করছি, অগ্রসর হচ্ছি তার প্রতিবেদন তারা আপনাদেরকে দিতে পারবে। সেই তথ্য সংগ্রহের জন্য তারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তারা এটা মানলেন এবং বললেন তারা একটি টিম অব এক্সপার্টস পাঠাবেন। এরপর তারা টিম অব এক্সপার্টসদের নাম দিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের চিফ প্রসিকিউটর ওকামপো, হংকংয়ের এ্যান্টি করাপশন কমিশনের একজন মেম্বার এবং স্কার্ডিয়ানের একজন তদন্তকারী। তারা সম্ভবত ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২/১৩ তারিখ আমাদের দেশে এসেছিলেন। এ সময় তাদের সাথে আমরা মিটিং করি।’
মিটিং-এ তারা কি বলেছিলেন তা আমার মনে আছে।মিটিংয়ে ওনারা প্রথমেই বলেছেন, আবুল হোসেনকে আসামি করতে হবে। আমরা বললাম তথ্য-উপাত্ত যদি না পাই তাহলে আমরা কীভাবে একজনকে আসামী করবো? তখন তারা মামলার এফআইআর-এ আবুল হোসেনের নাম দিতে বললেন। তাদের একজন এই পর্যন্তও বললেন, এফআইআর-এ তার নাম দিয়ে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলেই সব বেরিয়ে যাবে।
আমরা তখন দৃঢভাবে বললাম, না।তা হতে পারে না।
এরপর মিটিং-এ বিশ্বব্যাংকের দুই প্রতিনিধির উদ্দেশ্যে বললাম, দুদককে আপনারা যেই সব কাগজ-পত্র, দলিলপত্র দিয়েছেন তার বাইরে আপনাদের কাছে আর কোনো কাগজ-পত্র আছে কি? তারা বললেন, না।
‘আমি তখন ওকামপোকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটাই যদি দলিল-পত্র হয়ে থাকে তাহলে এখানেতো মন্ত্রী আবুল হোসেনর যে তথ্য দেখছি তা হচ্ছে তার সঙ্গে ওই কোম্পানির চারজন গিয়ে তার সাথে দেখা করেছে। এইটুকু ছাড়া তার আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এখানে কোনো তথ্য নেই যে, তাকে এত টাকা দেয়া হবে বা টাকা দেবার লেনদেনের বিষয়ে কোনো আলাপ–আলোচনা হয়েছে, সে তথ্যও নেই। তাহলে আমরা তাকে আসামি করবো কিভাবে ?’
‘আমরা যখন এই কথা বললাম তখন তাদের একজন রেগে গিয়ে চুপ্পু সাহেবকে বললেন, তুমি কি আবুল হোসেনকে চেন? সেকি তোমার আত্মীয় ?
আমি বাধা দিলাম। বললাম, এভাবে আপনি ওনার সঙ্গে কথা বলছেন কেন ?
তখন তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি তাকে চেনেন ?
আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই আমি তাকে চিনি। তিনি এই দেশের মন্ত্রী, তাকে চিনবো না কেন? কিন্তু আপনি যদি বলেন আমার সাথে তার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা- তাহলে আমি বলবো, তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। আপনারা এসব কথা বলবেন না। বরং আপনারা কাগজে তথ্য থাকলে বলুন আমরা তাকে আসামি বানাবো।’
‘এরপর উনারা বলেলেন, কোনো অপরাধ করার ষড়যন্ত্রের জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়? তখন আমি স্পষ্ট বলেছি যে, এ বিধান আছে। কোনো অপরাধের ষড়যন্ত্র করাও অপরাধ এবং সেই ষড়যন্ত্রের শাস্তি অপরাধের মতই সমান। এটা আইনে আছে। তারা তখন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে গেলেন।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পরে আপনারা জানেন যে, ওই ওকাম্পোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং সেই দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার কিছুদিন পরে আমরা জানতে পারলাম, ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের ৮ থেকে ১৯ তারিখের মধ্যে কানাডার একটি কোর্টে ‘এসএমসি লেভেলিং কোম্পানি’র বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ ছিল সেটির তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হবে এবং তাদের বিচার হবে। তো সেখানে বিচারের নিয়ম হলো পূর্ববর্তী শুনানি হওয়ার মাধ্যমে মামলাটি আদৌ ট্রায়ালে যাবে কিনা তার ব্যবস্থা করা। সেই শুনানি হবে এপ্রিল মাসের ৮ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত। তখন দেশে ভিসা পাওয়ার যে নিয়ম ছিলো সে অনুসারে আমাদের যাওয়ার সময় ছিলো না। সেই কারণে ঠিক সেই সময় সেখানে দুদকের কোনো প্রতিনিধি যাওয়ার সুযোগ পায়নি।’
‘আমি এই মামলার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ২০১৩ সালের মে মাসের ২৯ তারিখ টরেন্টোতে যাই। টরেন্টোতে যাওয়ার পূর্বে রওনা দেবার মূহূর্তে ক্যানাডার হাই কমিশনারের কাছ থেকে একটি ম্যাসেজ পাই। সেখানে তিনি পরিষ্কারভাবে আমাকে বলেছিলেন, যে আমি টরেন্টোতে গেলে কানাডার কোনো অফিসার আমার সাথে কথা বলবে না, দেখা করবে না, ফোন ধরবে না এবং কোনো সহযোগিতা করবে না। তখন আমি ফোন করে তাকে জানাই- আমিতো টিকেট কেটে ফেলেছি। আজকে আমাকে যেতেই হবে।’
‘আমি কানাডায় গেলাম। যাওয়ার পরে যেটা প্রথমেই জানতে পারলাম সেটা হলো, আমরা(দুদক) ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর একটি এফআইআর করেছিলাম। সে এফআইআর-এ যাদেরকে আসামী করা হয়েছিলো তাদের মধ্যে একজন ব্যবসায়ী ছিলো। আমেরিকার প্রবাসী সেই ব্যবসায়ীকে বিশ্ব ব্যাংক এখান থেকে গোপনে আমেরিকায় নিয়ে গিয়েছে। নিয়ে যাওয়ার পর তাকে বলেছে সব দোষ থেকে তাকে মুক্ত করবে যদি সে রাজসাক্ষী হয় এবং সেই হিসাবে কানাডার রয়েল মাউন্টেন পুলিশ ২৬/২৭ ফেব্রুয়ারি তার একটি জবানবন্দি গ্রহণ করে। সেই জবানবন্দির পরিপ্রেক্ষিতে প্রি-হেয়ারিং হয় এবং তারও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে, জবানবন্দির সার্টিফাইড কপি পাওয়ার জন্য আমাদের একটি দরখাস্ত করা ছিলো। আমাকে তখনকার কানাডিয়ান হাইকমিশনার যা বলেছিলো তা সত্য। কেউ আমার সঙ্গে তখন সহযোগিতা বা কথা বলতে রাজি হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘তবে আজকে আমি বলতে পারি, দুদকের কাছে সেই প্রিলিমিনারি হেয়ারিংয়ে যারা যারা সাক্ষী দিয়েছে তার সাক্ষ্য-তথ্য রয়েছে। সেই সাক্ষীর স্বাক্ষ্য আমি পড়েছি। এমনকি যিনি রাজসাক্ষী হয়েছিলেন তিনি এই যাদের নাম বললাম (যাদের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিলো) তাদের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি। এমনকি এখানে যে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে সেটিও প্রমাণ করতে পারেননি। এরপরেই নতুন করে কিছু আসামী যুক্ত করার চেষ্টা চলেছে।’
‘দেশে ফিরে এসে আমি কোনো মন্তব্য করিনি। কারণ, এক, দুদকের এফআইআর করার কারণে মামলার তদন্ত চলছিলো। দুই, কানাডার সুপেরিয়র কোর্ট বিষয়টি পাবলিসিটি ব্যান্ডের আদেশ দিয়েছিলো। অর্থাৎ এই মামলায় যে স্বাক্ষ্য-প্রমাণ দেয়া হয়েছিলো তা যেন সবসময়ই ওপেন কোর্ট এবং পাবলিক হেয়ারিং না হয় এবং পাবলিকেশন করা না হয়। মানে পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ে খবর ওঠানো যাবে না। আমরা সেই সময় তদন্তের স্বার্থে চুপ ছিলাম। আজকে সেইজন্যই এত কথা বলছি।’
তিনি বলেন, ‘আজকে রায় যেটা হলো তাতে বাংলাদেশের মর্যাদা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা যে সহিষ্ণু জাতি এটা প্রমাণ পেয়েছে। আমরা যে কারো কাছে মাথা নত করি না সেটা আমাদের শিখিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ, তিনি সেদিন বলেছিলেন, এই যে দুর্নীতি হয়েছিলো সেটা তোমরা (বিশ্বব্যাংক) প্রমাণ করো। তোমরা যখন পদ্মা সেতুতে টাকা দেবে না, তখন আমরা নিজের টাকায় সেতু করবো। আজকে পদ্মা সেতু নিজেদের টাকায় হচ্ছে। এর চেয়ে আনন্দের কিছু নেই।’
মন্ত্রী বলেন ‘বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের স্বাক্ষরকারী একটি অংশ। তাই তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া যাবেনা। তবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা চাইলে এর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে। তাদের এ বিষয়ে আইনত পরামর্শ নেয়া উচিৎ।’