মেইন ম্যেনু

পবিত্র গঙ্গা নিজেই যখন অশুদ্ধ

ভারতের প্রাচীন নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম গঙ্গা। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নদী হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত নদীটি। কিন্তু কালের পরিক্রমায় নদীটির যে বেহাল অবস্থা হচ্ছে তাও হয়তো অনেকেরই জানা। বরফপূর্ণ হিমালয় শৃঙ্গ এই নদীর উৎপত্তিস্থল হলেও শেষ পর্যন্ত এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে পাললিক ভূমিতে। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে আজও অনেকেই নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য গঙ্গার পানিতে ডুব দেন। কিন্তু মানুষকে শুদ্ধ করতে করতে বর্তমানে গঙ্গা নিজেই দূষিত হয়ে পড়ছে। প্রায় প্রতিদিন এই গঙ্গা নদীতেই ৪৫০ মিলিয়ন লোকের বর্জ্য নিষ্কাশিত হয়।

নানান কলকারখানা এবং খামারের বর্জ্য জমা হয় এই গঙ্গা নদীতে। এমনকি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের স্বজনদের পোড়ানো শবদেহের শেষ আনুষ্ঠানিকতাও করে থাকে এই নদীতে। আর এভাবেই নদীটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিষাক্ত নদীতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুই বছর আগে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে গঙ্গা নদী পরিষ্কার করার প্রতিজ্ঞা করলেও আদৌ এর সুফল চোখে পড়ার মতো না। তাহলে এখন প্রশ্ন হিন্দুদের এই গঙ্গামাতা কি বাঁচানো সম্ভব হবে?

গঙ্গা নদীর পানির উৎপত্তিস্থল হলো সরাসরি হিমালয় শৃঙ্গ থেকে। হিমালয় থেকে সরাসরি আসে বলে এই নদীর পানি সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে অনেক পবিত্র। আর এজন্য হিমালয়ের যে জায়গাটি থেকে থেকে গঙ্গা নদীর পানির উৎপত্তি হয় তা হিন্দুধর্মালম্বীদের কাছে পবিত্র একটি স্থান। তাদের কাছে মনে হয় হিমালয় থেকে বরফ গলে আসা এই পানি একদিকে যেমন ঠাণ্ডা অপরদিকে অনেক পবিত্র এবং বিশুদ্ধ। এছাড়াও হিমালয়কে ঘিরে হিন্দু পুরাকথায় অনেক কল্পকাহিনী আছে। ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে গঙ্গা নদী ওতোপ্রেতভাবে জড়িত। গঙ্গাকে তারা মায়ের সমতুল্য মনে করে গঙ্গামাতাও বলে থাকে।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। পরিসংখ্যান মতে, হিমালয়ের পানিও দিনে দিনে দূষিত হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ধরেই নেয়া যেতে পারে এই ঐতিহাসিক নদীর পানির গোড়াতেই রয়েছে সমস্যা, তার উপর যোগ হয়েছে মানবসৃষ্ট দূষণ সমস্যা। এই দূষিত নদীর পবিত্র পানির সামনে দাড়িয়েই রিশিকেশের সবচেয়ে বড় আরতির আয়োজন করেন স্বামী চিদানন্দ সরস্বতী। মাখনের ওপর জ্বালানো প্রদীপ হাতে নিয়ে ধর্মীয় সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে তিনি আরতি আরচোনা করেন। ৫০ জনেরও বেশি সাধুরা তার সঙ্গে আরতিতে অংশগ্রহন করে। দূর থেকে দাড়িয়ে হাজারো ভক্তরা তা দেখতে থাতে। এই আরতি মূলত গঙ্গামাতার জন্যই করা হয়। শুধু গঙ্গাতেই নয় একই ধরণের প্রথা গ্রাম ও শহরের অন্যান্য নদীগুলোকে কেন্দ্র করেও দেখা যায়।

প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তরা প্রাচীণ প্রথা মেনে নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য গঙ্গার পানিতে স্নান করেন। গঙ্গা তাদের কাছে দেবীস্বরূপা। তাদের বিশ্বাস গঙ্গা স্বর্গ থেকে আসা দেবী যাকে পৃথিবীতে পাপমোচনের জন্য পাঠানো হয়েছে। স্বামী চিদানন্দ গঙ্গার পারে আসা ভক্তদের জন্য এখানে একটি বিশাল আশ্রম তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার হৃদয় তখন আনন্দে পরিষ্ফুটিত হয়ে যায় যখন আমি লাখো ভক্তদের গঙ্গার পারে আসতে দেখি। কিন্তু আবার তখনই ব্যাথিত হয় এই ভেবে যে গঙ্গার পানি আর আগের মতো নেই।’

অনেকে মনে করেন গঙ্গা যেমন সকল মনুষ্যের পাপ পরিষ্কার করে তেমনি এর জন্য গঙ্গাকে আগে শুদ্ধ হতে হবে। গঙ্গা মানুষের পাপ শুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে সবার ভালো মন্দ দেখাশোনা করে কিন্তু এদিকে মানুষের পাপ মোচন করতে গিয়ে গঙ্গা যে নিজেই দূষিত হয়ে যাচ্ছে এ খবর কি গঙ্গা রাখে। গঙ্গাকে নদী পরিষ্কার করা নিয়ে নানা রকম প্রচার চালোনো হচ্ছে তবে যত বড় প্রচারণাই হোক না কেন কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ ব্যপারে স্বামী বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় গঙ্গা ভারতের একটি অংশ যদি গঙ্গাকে বাঁচানো না যায় তাহলে ভারতকে বাঁচানো যাবে না। যদি গঙ্গা বাঁচে তাহলে ভারতও বাঁচবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতীয় হিন্দু কমিটি ইতোমধ্যে গঙ্গা পরিষ্কার করার মিশনে মাঠে নেমেছে। এতে মনে হয় তারা খোদ দেবী শুদ্ধের কাজে নেমেছে। দুবছর আগে ভারতের বিজয় দিবসে নরেন্দ্র মোদী গঙ্গা পরিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গঙ্গা পরিষ্কারে পাঁচ বছরে তিনি তিন বিলিয়ন ডলার ব্যায় করবে। তবে মোদীর আগে রাজীব গান্ধিও গঙ্গা বাঁচাও প্রচারণা চালিয়েছিল কিন্তু এতে কোন ফলপ্রসূ অগ্রগতি দেখা যায়নি। এখন দেখার পালা দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতির কতটুকু রক্ষা করেতে পারেন।