মেইন ম্যেনু

পরীর রানির ১৬০ বছর

কত সুন্দর নাম ‘পরীর রানি’। শুনলে দেখার নেশা বাড়ে। সত্যিই না কত সুন্দরী!

না, এ কোনো রাজার সুন্দরী রানি নয়। বরং বলা যায়, ভ্রমণের পরী। ভ্রমণপরীদের রানি। রাজার রানি না হলেও রানির মতোই তার আড়ম্বর।

পরীর রানির বয়স ১৬০ বছর পুরো হয়েছে। জৌলুশ নিয়ে টিকে আছে আজো। ঘটাং ঘটাং শব্দ তুলে যখন ছোটা শুরু করে, তখন তার সঙ্গে ছুটে চলে ১৬০ বছর ঐতিহ্য। ইতিহাসের গৌরবও তার সর্বাঙ্গে মেখে আছে।

পরীর রানি। একটি ট্রেন। এ সেই ট্রেন, যেটি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলছে। অর্থাৎ বিশ্বে যত ট্রেন আছে, তার মধ্যে যেগুলো এখনো চলছে, সেদিক থেকে এটি সবচেয়ে পুরনো।

ফেইরি কুইন (পরীর রানি) ১৮৫৫ সালে ইংল্যান্ডে তৈরি হয়। ট্রেনটি তৈরি করে কিটসন থম্পসন অ্যান্ড হেউইটসন নামে একটি কোম্পানি। একই বছর ট্রেনটি ভারতের কলকাতায় আনা হয়। তখন এর মালিক ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি। পশ্চিমবঙ্গে হাওড়া ও রানিগঞ্জের মধ্যে চলাচল করত।

পরীর রানি ঐতিহ্যবাহী ট্রেন। এ ঐতিহ্যের ভিতটা অবশ্য শোষণের ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভারতে ট্রেনের আগমন হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইচ্ছায়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ট্রেন ভারতবর্ষে বিপ্লব ঘটাবে- বিষয়টি মোটেও এমন ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা রমরমা করতেই ট্রেন আনা হয় কলকাতায়। তা ছাড়া ভারতের সাধারণ লোক সে সময় ট্রেনে চড়তেই পারত না।

এই ট্রেনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৮৫৭ সালের সিপাহী ব্রিদ্রোহের ইতিহাস। সিপাহী বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত ব্রিটিশ সেনাদের বহনের কাজে ব্যবহার করা হয় ট্রেনটি। এ ছাড়া কুলিন ব্রিটিশদের অনেক অপকর্মের সাক্ষী পরীর রানি।

যা হোক, অতীতের কষ্ট নিয়ে বুক চাপড়ে লাভ নেই। ব্রিটিশরা গেছে। ভারতও আগের চেহারায় নেই। তা ছাড়া ব্রিটিশরা ভারতের জন্য যা করেছে, নিয়ে গেছে তার চেয়ে অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সব কিছুইতে ভারতের স্বত্ব আছে। ফলে পরীর রানি ট্রেনও আজ ভারতের, ভারতীয়দের ঐতিহ্য।

পরীর রানি ১৯০৯ সাল পর্যন্ত একটানা সার্ভিস দেয়। কয়লা শক্তি এবং বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেনটি চালানো হয়। সেই ইঞ্জিন আজো আছে। তবে মাঝে দীর্ঘ সময় ট্রেনটি বসিয়ে রাখা হয়। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার ট্রেনটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপর দিল্লির চাণক্যপুরীতে জাতীয় রেলওয়ে জাদুঘরে রাখা হয় এটি।

প্রয়োজনী সংস্কার করে ১৯৯৭ সালে ট্রেনটি আবার সার্ভিসে আনা হয়। ১৯৯৮ সালে গিনেস বুক ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ঠাঁই হয় পরীর রানির। পরীর রানি এখন ভারতে আসা পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে। দিল্লি থেকে রাজস্থানের আলওয়ার পর্যন্ত চলাচল করে। ট্রেনটি ছোট। সর্বোচ্চ ৬০ জন যাত্রী চড়তে পারে এতে। আর এর গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারের বেশি ওঠেই না। ফলে নিরাপদ ও আনন্দঘন ভ্রমণের জন্য পরীর রানি উৎকৃষ্ট বাহন। খাওয়া-দাওয়া, আরাম-আয়েশের সব ধরনের ব্যবস্থা আছে।

দুঃখের বিষয় হলো- ২০১১ সালে ট্রেনটির কিছু যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যায়। যন্ত্রাংশগুলো এখন আর তৈরি হয় না কোথাও। তবে ভারতের রেল প্রকৌশলীরা বিকল্প যন্ত্রাংশ তৈরি করে আবার তা চালু করে। ২০১২ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন সার্ভিস দিচ্ছে পরীর রানি।

দিল্লি গেলে পরীর রানির রূপ দেখে নিতে ভুলবেন না যেন!