মেইন ম্যেনু

পর্ণ একটি সামাজিক ব্যাধি

পর্ণ একটি সমস্যা। অনেকের জন্যই এটি একটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের গুরুতর সমস্যা, আর সামাজিক পর্যায়ে সকলের জন্যই। আপনি মনে করতে পারেন পর্ণ আপনাকে প্রভাবিত করে না; কিন্তু সত্য কথা হল, তা করে, কারণ তা আপনার আশেপাশের সমাজের সাথে এত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। পর্ণ ইন্ডাস্ট্রির বিশাল আকার, মিডিয়াতে এর প্রভাব, প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি এবং এর সাথে পর্ণের সুলভ মূল্যে সহজলভ্যতা, এবং পরিচয়বিহীনভাবে ব্যবহার করার সুবিধা – সব কিছুর দ্বারাই আমাদের সমাজে এর প্রভাব বেড়ে চলেছে।

আপনি দেখে থাকুন বা না থাকুন, পর্ণগ্রাফী আপনাকর জীবনে প্রভাব ফেলছে। আপনি পুরুষ বা মহিলা হোন, এতে আসক্ত হোন, বা আসক্ত কোন ছেলে বা মেয়ের মা/বাবা হোন, পর্ণের কিছু নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকাটা সুবিধাজনক। পর্ণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিপুল পরিমাণে গবেষণা হয়েছে (এবং আমার মতে নিম্নে যা বর্ণিত হল তা আবশ্যকভাবে সবচাইতে ভয়াবহ প্রভাবগুলো নয়)। নারী ও পুরুষের উপর পর্ণের কিছু নেতিবাচক প্রভাবঃ

১. পর্ণগ্রাফী পুরুষ মানুষের মধ্যে সামাজিক ও মনস্তাত্বিক সমস্যা সৃষ্টিতে অবদান রাখে: পর্ণ-বিরোধী সক্রিয় কর্মী গেইল ডাইন্স বলেন, যে তরুণেরা পর্ণে আসক্ত হয়ে পড়ে, তারা “স্কুলের কাজে অবহেলা করে, প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা দেখায় যা তাদের নেই, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এবং প্রায়ই হতাশায় ভোগে”। ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনোয়া অ্যাট শিকাগো থেকে বায়োসাইকোলজি-তে পি.এইচ.ডি অর্জনকারি ডঃ উইলিয়াম স্ট্রুদারস উপরোল্লিখিত প্রভাবগুলো সম্বন্ধে নিশ্চিত করেন এবং আরও কিছু যোগ করেন। তার গবেষণা অনুযায়ী, পুরুষ যারা পর্ণ ব্যবহার করে তাদের ব্যক্তিত্বে আধিপত্যশীলতা, প্রচণ্ড অন্তর্মুখীতা, বিকারগ্রস্থ, আত্মমুগ্ধ, কৌতুহলী, নিজের ব্যাপারে আস্থাহীন, হতাশ, নিঃসঙ্গ, অমনোযোগী। লক্ষ্যণীয় যে, পর্ণ দেখার ফলে যদিও ক্ষণস্থায়ী সুতীব্র শারীরিক সুখানুভূতির সৃষ্টি হয়, কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক মনস্তাত্বিক প্রভাব হয় প্রলম্বিত।

২. পর্ণের প্রভাবে পুরুষ মস্তিষ্কের স্নায়বিক গঠণতন্ত্র পরিবর্তন হয়: স্ট্রুথার আরও বলেন, যখন কারও জন্য পর্ণগ্রাফী উপভোগ নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হতে থাকে, এর ফলে মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ূতন্ত্র বিন্যাসিত হয়। ঠিক যেমন জঙ্গলের অভ্যন্তরে প্রতিটি পথচারীর পদচারণায় পায়ে চলা পথটি আরও স্পষ্ট ও সুগঠিত হয়, ঠিক সেভাবেই পরবর্তী যৌনউত্তেজক চিত্রটি দেখার প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কের স্নায়বিক গঠণতন্ত্রে। সময়ের সাথে সাথে (এবং প্রতিবার পর্ণগ্রাফী ব্যবহারের সাথে সাথে) এই স্নায়বিক “পথ” –গুলো আরও সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী হতে থাকে। এই স্নায়বিক পথগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নারীদের সাথে একজন পুরুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। মনের অজান্তেই তারা এমন একটি স্নায়বিক গঠন গড়ে তুলে যা তাদের নারীদেরকে আল্লাহর একটি পবিত্র সৃষ্টি হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গীকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।

মস্তিষ্কের উপর পর্ণের প্রভাব সম্পর্কিত একই ধর্মী তার একটি লেখা “দ্যা পর্ণ মিথ” –এ নাওমী উল্‌ফ লিখেছেন, মোটের উপর, মস্তিষ্কের উপর পর্ণ খুবই মৌলিক উপায়ে প্রভাব ফেলেঃ প্রভাবটি অভ্যাসকৃত প্রবণতা/প্রবৃত্তি গঠণমূলক। চূড়ান্ত যৌন উত্তেজনা খুবই শক্তিশালী একটি অভ্যাস গঠণকারী ঘটনা। যদি এটার সাথে জড়িত থাকে আপনার স্ত্রী, চুম্বন, কোনও ঘ্রাণ, একটি শরীর, তাহলে এগুলোই দীর্ঘ মেয়াদে আপনার যৌন অভ্যাসের সাথে জড়িত হবে। কিন্তু যদি আপনার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় বিরামহীন মাত্রায় নতুন নতুন সাইবার যৌন দাসীদের ছবিতে, তাহলে এটাই আপনার যৌন অভ্যাস নিয়ন্ত্রকে পরিণত হবে। যৌন উত্তেজক ছবির সর্বব্যাপী সহজলভ্যতা রোমান্টিকতাকে সহজ করেনা, বরং দুর্বল করে।

৩. পর্ণের প্রভাবে সুস্থ (স্বামী-স্ত্রীর) যৌনতাকে প্রতিস্থাপন করে হস্তমৈথুন (MASTERBATION)
যৌনতা হয়ে দাঁড়ায় স্বার্থপর সুখের অন্বেষণ। লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় শুধুই নিজের আরাম-সুখ-আনন্দ, পরস্পরকে আনন্দ দেওয়ার মাধ্যমে আনন্দ পাওয়া ও অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধির সুস্থ মানসিকতা হারিয়ে যায়।

৪. পর্ণ নারীদের তুচ্ছ পণ্য-দ্রব্যের স্তরে নামিয়ে আনে
এটা স্বল্প মাত্রা বা ভারী মাত্রা, সব ধরনের পর্ণের প্রভাবেই হতে পারে। নিজের বই “Pornified”-এ পামেলা পল Texas A&M ইউনিভার্সিটিতে পর্ণগ্রাফীর উপর একজন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘পুরুষ মানুষের উপর স্বল্প মাত্রার পর্ণগ্রাফীরও খুব নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। স্বল্প মাত্রার পর্ণের সমস্যা হল, এতে আসক্ত ব্যক্তি নারীদের সাথে মানুষ হিসেবে সম্পর্ক গড়ার বদলে তাদেরকে পণ্যদ্রব্য হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।’ ব্রুক্‌স-এর মতে, পর্ণগ্রাফী পুরুষদের মাঝে এই ভুল ধারনার সৃষ্টি করে যে, যৌনতা এবং যৌনসুখ সম্পূর্ণরূপে বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ব্যাপার। অন্যভাবে বললে, পর্ণগ্রাফী ব্যবহার মৌলিকভাবেই আত্মসর্বস্ব একটি অভ্যাস, যা একজন পুরুষ শুধু নিজে একাই ব্যবহার করে, শুধুই নিজের আনন্দের জন্য – একজন নারীকে আনন্দদায়ক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে, শুধুই একটি উপভোগ্য বস্তু হিসেবে।

পল একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে পর্ণের আরও একটি ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখ করেনঃ “পুরুষ ও নারী যারা প্রচুর পরিমাণে পর্ণে ব্যবহার করেছেন, তারা কন্যা সন্তানের ব্যাপারে আগ্রহী নন। কে চাইবে তার নিজের ছোট্ট আদরের মেয়েটি পর্ণগ্রাফীর পর্দায় দেখানো ঘটনার শিকার হোক ?”

আবারও উল্লেখ করা প্রয়োজন, পর্ণের এই প্রভাব শুধু পর্ণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্ণের সর্বব্যাপী ব্যবহার এবং বিশাল বিস্তৃত পর্ণ ব্যবসার প্রভাবে সমাজব্যাপী বিকৃত যৌনতার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। পুরুষ ও নারীরা একটি পর্ণগ্রাফী দ্বারা গ্রাস করা সমাজ-সংস্কৃতিতে জন্ম নিচ্ছে ও বেড়ে উঠছে, যেখানে পর্ণ সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গ্রহণযোগ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং এতে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ। ডাইন আরও বলেন, “যৌন-আবেদনই তোমার সবচাইতে বড় গুন” –এই বার্তা নারীদের মনের গভীরে প্রোত্থিত করে দেয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে লয়প্রাপ্ত হচ্ছে তাদের আত্ম-মর্যাদা, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নিজের স্বকীয়তা কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তাদেরকে একটাই মাত্র পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, এবং অন্য সকল মানবিক গুনগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে।

৫. পর্ণ একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে ধ্বংস করে দেয়
উলফ তার স্বভাবসিদ্ধ ঠোঁটকাটা ভঙ্গিতে উল্লেখ করেন, মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়কাল জুড়ে, যৌন-আবেদনময় চিত্রের ব্যবহার হয়ে এসেছে শুধুই বাস্তব নারীর সৌন্দর্যের বিকল্প হিসেবে। কিন্তু বর্তমান কালে, ইতিহাসে প্রথমবারের মত, চিত্রের আকর্ষন ও প্রভাব বাস্তবকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আজকের দিনে, বাস্তব নগ্ন নারী দেহ সস্তা মানের পর্ণের সমতুল্য।

৬. পর্ণের প্রভাবে বাস্তবতাবোধ অনুভূতিহীন হতে থাকে
বাস্তব যৌনমিলন এমনকি পুরো বাস্তব জগতটাই বিরক্তিকর লাগতে শুরু করে। বিশেষ করে মানুষের জীবনের মানসিক/আবেগনির্ভর অংশটাকে পর্ণ পুরোপুরি অসাড় করে দেয়। পল বলেন, পর্ণগ্রাফী মানুষের ক্রোধ, উত্তেজনা, সব ধরনের অনুভূতি ভোঁতা করে দেয়। সার্বিক আবেগ/অনুভূতি হ্রাস পেতে থাকে, এমনকি প্রতিদিনকার স্বাভাবিক আবেগনির্ভর জীবনাযাত্রার প্রতি গভীর এক অতৃপ্তিবোধের সৃষ্টি হয়। শেষে অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, যৌন আচার-ব্যবহারের ব্যাপারে অবাস্তব সব ধারনা এবং নারীদের ব্যাপারে সার্বিকভাবে অনুভূতি/আবেগহীন এক অদ্ভূত মানসিক বিকারের সৃষ্টি হয়। যখন একজন মানুষ পর্ণের উপর বিরক্ত হয়ে পড়ে, সে কাল্পনিক ও বাস্তব উভয় জগতের ব্যাপারেই নিস্পৃহ ও উদাসীন হয়ে পড়ে। বাস্তব জগত সাধারণত হয়ে পড়ে প্রচণ্ড একঘেয়ে।”

৭. পর্ণ পুরুষ ও নারী স্বত্বার ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারনা সৃষ্টি করে
ডাইন্স উল্লেখ করেছেন, কিভাবে পর্ণ পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে এক মিথ্যা ধারণার সৃষ্টি করে। পর্ণের কাহিনীতে, নারীদের চরিত্র শুধুই একমুখী – তারা কখনও না বলে না, কখনও গর্ভবতী হয়ে পড়ে না, এবং যে কোন পুরুষ মানুষের সাথে যৌন মিলন করতে এবং তাদের সবধরণের সম্ভাব্য (এবং অসম্ভব/ অকল্পনীয়) উপায়ে সুখ দিতে তারা সবসময়েই উদগ্রীব। অন্যদিকে পর্ণের কাহিনী পুরুষ মানুষ সম্পর্কে বলে, তারা অনুভূতিহীন, স্বত্বাবিহীন জীব যাদের একমাত্র উদ্দেশ্যই নারীদের নিজের ইচ্ছেমত যে কোনভাবে ব্যবহার করা। পর্ণ কাহিনীর এসব পুরুষেরা যেসব নারীর সাথে মিলিত হয় তাদের ব্যাপারে কোন রকম সহানুভূতি, শ্রদ্ধাবোধ, বা ভালোবাসা প্রকাশ করে না।

লেখকঃ রাশিদুল ইসলাম জুয়েল
সিঙ্গাপুর প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক।