মেইন ম্যেনু

পর্বত অভিযান জয় নয়, আত্মসমর্পণ

পর্বত অভিযান এক ধরনের খেলা। আরও অনেক ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে’র মতো এই খেলাতেও বিপদ পদে-পদে। ভয় কেবল নিজেকে নিয়ে নয়। প্রকৃতি এবং আবহাওয়াকে নিয়েও। সাত-আট হাজার মিটার উচ্চতায় বিরুদ্ধ-প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এভারেস্টের মতো শৃঙ্গ জয় করা সহজ কথা নয়। এটা এক ধরনের খেলা। পাহাড়ের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক নতুন নয়। হিমালয়ের দুর্গমতা উপেক্ষা করে বাঙালি যুগে যুগে পৌঁছে গিয়েছে অচেনা গিরিখাতে, শৃঙ্গে, উপত্যকায়। দেশ-বিদেশের পর্বতারোহীর সঙ্গীও হয়েছে বাঙালি। পাহাড়ের নেশায়। অচেনার আনন্দের নেশায়। প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলার নেশায়। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়েরা লিখে গিয়েছেন সেসব। সেইসব কাহিনিতে একটি বিষয়ের উপরই জোর দিয়েছেন তাঁরা আত্মনিবেদন। প্রকৃতির সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ানো। তাই কোনও অভিযানই তাঁদের কাছে ব্যর্থ নয়। জয়-পরাজয় তাঁদের লক্ষ্য নয়। আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়েই হিমালয়কে কাছে পেতে চেয়েছেন তাঁরা। তরুণ বাঙালিকে উজ্জীবিতও করেছেন উমাপ্রসাদের মতো ভ্রমণ-দার্শনিকেরা। যুগে-যুগে তরুণ অভিযাত্রীদল বেরিয়ে পড়েছে পাহাড়চূড়ার লক্ষ্যে।

পর্বতাভিযান এক ধরনের খেলাও। আরও অনেক ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে’র মতো এই খেলাতেও বিপদ পদে-পদে। ভয় কেবল নিজেকে নিয়ে নয়। প্রকৃতি এবং আবহাওয়াকে নিয়েও। সাত-আট হাজার মিটার উচ্চতায় বিরুদ্ধ-প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এভারেস্টের মতো শৃঙ্গ জয় করা সহজ কথা নয়। যে কোনও সময় নেমে আসতে পারে তুষারধস, তুষারঝড়। আবহওয়া খারাপ হলে শরীরে তার প্রভাব অনিবার্য। পাহাড়েই হারিয়ে যান অভিযাত্রী। পর্বতকে ভালবেসে যাঁরা ওই খেলায় অংশ নেন, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা নেশায় মাতেন। যাঁরা জেতেন, তাঁরা ফিরে আসেন বিজয়মাল্য গলায় পরে। যাঁরা হেরে যান, বরফের বুকে শেষ শ্বাসটুকু পরিত্যাগ করে তাঁরা ছুটি নেন। রোম্যান্টিকতার এ দুই বিচিত্র মেরু ! সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সব সময় আত্মস্থ করা সহজ নয়।

প্রেমে না-পড়লে প্রেমের গরল পান করতে পারে কোন কৃষ্ণের জীব ! সমস্যা অন্যত্র। পাহাড়কে যাঁরা ভালবাসতে শিখিয়েছেন, পাহাড়ের কোলে হারিয়ে যাওয়াকে যাঁরা রোম্যান্টিক করে তুলেছেন, একটি কথাই তাঁরা বারে বারে মনে করিয়ে দিয়েছেন। ‘অ্যাডভেঞ্চার’ কখনওই ‘ট্যুরিজম’ নয়। পর্যটনে গন্তব্যে পৌঁছনোর দায় থাকে। সময় ও অর্থের টানাটানির হিসেব থাকে। গন্তব্য থাকে অভিযানেও। কিন্তু গন্তব্য সেখানে নিছকই লক্ষ্য। প্রকৃতি না-চাইলে, আবহাওয়া সঙ্গ না-দিলে গন্তব্যকে ছোঁয়া যায় না। ক্ষতি নেই তাতে। কঠোর পরিশ্রম করে যে পর্যন্ত পৌঁছনো যায়, সেটুকুই প্রাপ্তি ! প্রকৃতি এবং পাহাড়ি মানুষের সঙ্গে মনের আদানপ্রদানই অভিযাত্রার সম্পদ। বাঙালি অভিযাত্রী এক সময় এই দর্শনেই বিশ্বাস করতেন। পাহাড়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে ফিরে আসাকে তাঁরা পরাজয় বলে গণ্য করতেন না।

এক বিদেশি পর্বতারোহী এভারেস্ট জয় করে বলেছিলেন, নারীকে জয় করার মতোই তিনি জয় করেছেন শৃঙ্গকে ! অত্যন্ত নিম্নস্তরের অলংকৃতি, সন্দেহ নেই ! বিশিষ্ট পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী প্রতিবাদে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। প্রকৃতিকে জয় করা যায় না ! অর্থব্যয়ে কেনাও যায় না শৃঙ্গ। পর্বতাভিযানকে যাঁরা ব্যবসায়ে পরিণত করেছেন, তাঁরা লোভ দেখাচ্ছেন। অর্থের বিনিময়ে শিখরসুখ বিক্রির চেষ্টা করছেন। এভারেস্টের পাদদেশে ‘ট্র্যাফিক জ্যাম’ হচ্ছে। আবর্জনার স্তূপ জমা হচ্ছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধতা করতে গিয়ে ভাঙছে বিশ্বাস। চলছে দোষারোপ। প্রাণ যাচ্ছে। সে মৃত্যুতে রোম্যান্টিকতা নেই। পর্বতারোহণ যদি তার অভিযাত্রার চরিত্রে ফিরে যেতে পারে, তবেই বহু দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটতে পারে। নয় তো নয়।-এবেলা