মেইন ম্যেনু

‘পলাতক’ তারেককে ফেরানো যাচ্ছে না যে কারণে

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে ও দলটির ভাইস-চেয়ারম্যাস তারেক রহমান; ২০০৮ সাল থেকে যিনি লন্ডনে আছেন। অবশ্য এই মামলায় তারেকের নাম আসে ২০১১ সালে।

২০০৪ সালের এই ঘটনায় দায়ের করা মামলা বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। তারেক জিয়াকে এ মামলায় পলাতক দেখানো হয়েছে। গেল এপ্রিলে ওয়ান্টেড ঘোষণা করে তারেকের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)।

২০১১ সালে এই মামলায় তারেকের নাম আসার পর থেকেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু এখনো এই বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ইন্টারপোলের রেড নোটিস থাকলেও নানা জটিলতার কারণে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, তারেককে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করলেও চাইলেই কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনা যায় না। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনতে গেলে জটিলতায় পড়তে হয়। এখনো পর্যন্ত যুক্তরাজ্য থেকে কোনো ফেরারি আসামিকে ফেরত আনার নজির বাংলাদেশের নেই।

যুক্তরাজ্যে যেকোন আসামি সে দেশের আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। আর বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে সে দেশের আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত গণ্য হয়। বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে ওই আসামিকে বিচারের সম্মুখীন করা হলেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না মর্মে নিশ্চয়তাও দিতে হয়। বিষয়টি আদালতে পাঠানোর আগেও একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, আসামি ফেরত আনার জন্য সরকারের বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদনের সঙ্গে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা সাজাপ্রাপ্ত হলে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তথ্যসহ আদালতের আদেশের যাবতীয় তথ্য দিতে হবে। নিশ্চয়তা দিতে হবে ওই আসামিকে সংশ্লিষ্ট মামলা ছাড়া অন্য মামলায় সাজা দেয়া যাবে না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। আর মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না এই শর্ত তো থাকছেই।

এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবেন এবং আবেদনটি আদালতে বিবেচনার জন্য পাঠাবেন। ইস্যুকৃত সার্টিফিকেটের বলে ওই আসামিকে আটক করে আদালতে হাজির করা হবে। আদালত প্রাথমিক শুনানির পর পূর্ণাঙ্গ শুনানির দিন ধার্য করবেন। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন। আসামির যদি ওই আদালতের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হয় তবে তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করারও সুযোগ পাবেন।

তারেকের ক্ষেত্রেও এই বিষয়গুলো প্রযোজ্য। যে কারণে এই বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি বলেই সূত্রের দাবি।

বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি (এনসিবি) মাহাবুবুর রহমান ভূইয়া বলেন, ‘তারেক রহমানকে ফেরানোর ব্যাপারে পুলিশের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠিয়ে দিয়েছে।’

২১ আগষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ বলেন, ‘তারেক রহমানের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হলেও তাকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যেমে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে। প্রক্রিয়া শেষ হলেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।’

১১ বছর আগে ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতা-কর্মী নিহত হন, আহত হন পাঁচ শতাধিক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

এরপর ১১ বছরে তিন দফায় এ মামলার তদন্ত হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রথম দফায় তদন্তে জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে এই মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালানো হয় বলে উঠে আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায় সরকারের তদন্তে। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ জুন এই মামলায় ২২ জনকে আসামি করে চার্জশিট প্রদান করেন সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর। ওই চার্জশিটে চার দলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে চার্জশিট দেয়া হয়। কিন্তু গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতা কারা এই বিষয়টি থেকে যায় আড়ালেই।

এরপর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময় আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্ত শুরু করে সিআইডি। ২০১১ সালের ৩ জুলাই সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতাদের শনাক্ত করে ৩০ জনের বিরুদ্ধে একটি সম্পূরক চার্জশিট প্রদান করে।

ওই চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী, ডিজিএফআইএয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক আব্দুর রহিম ও খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউকসহ ৩০ জন। বাদ যায়নি জোট সরকারের সময়ের এই মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তার নামও। ফলে এই মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২-তে।