মেইন ম্যেনু

কলারোয়ার দূ:খ ৪ নদী

পানিতে নিমজ্জিত কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি, পানিবন্দি অসহায় মানুষের হাহাকার

বর্ষা মৌসুম আসলেই যেন কলারোয়ার জনপদ হুমকিতে পড়ে পানিবন্দি হয়ে পড়ার ভয়ে। শুধু ভয়-ই নয়, রীতিমত প্রতিবছরের এসময়ে উপজেলার অনেক এলাকার বহু ফসলী জমি ও বসতবাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ব্যতিক্রম হলো না এবারো। উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে-ই কমবেশি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ফসলী জমি কিংবা বসতবাড়ি।

এককালে প্রবাহমান কপোতাক্ষ নদ এখন সাতক্ষীরার কলারোয়ার দূ:খে পরিণত হয়েছে। নদের নাব্যতা না থাকা, স্রোতহীন নদে পরিণত, নদ পাড়ের বহু এলাকা অবৈধ দখলে যাওয়া ও সর্বোপরি নদের উপর মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিকূলতার অভিশাপে নদের দু’তীরের জনপদের আজ দূ:খের সীমা নেই। বর্ষা মৌসুম আসলেই পানি টানতে না পেরে নদের উপচে পড়া পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ছে দু’তীরের বিস্তীর্ণ জনপদ।

কপোতাক্ষের মতোই রূপ নিতে শুরু করেছে উপজেলার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে চলে যাওয়া অপর নদী বেত্রবতীও। ভারত সীমান্তঘেষা ইছামতি নদী ও সোনাই নদীতেও পানি বিপদ সীমা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নদ-নদীর পানিতে দীর্ঘদিন প্রচুর পরিমাণে কচুরিপনা জমে, কচুরিপনার উচ্ছিষ্টে নদগর্ভ ভরাট হয়ে পড়া ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়ে নদীর উপচে পড়া পানি দু’তীরসহ নিম্নাঞ্চল লোকালয় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
এ’ ৪টি নদী সংশ্লিষ্ট ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অনেক ফসলী জমিতে ইতোমধ্যে পানি উঠে গেছে। তলিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে বীজতলাসহ কয়েক হাজার বিঘা জমির আমন ধান।

উপজেলার চন্দনপুর, কেড়াঁগাছি ও সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমির এমনই চিত্র। সোনাই নদী সংশ্লিষ্ট রামভদ্রপুর, ন’কাটি বিল, বয়ারডাঙ্গা, বিক্রমপুর সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠে পানি থইথই করছে। দেখলে যেন মনে হয় বিশাল জলধারা। কয়েকটি স্থান দিয়ে পানির প্রবাহে রীতিমত বন্যার আশংকায় শঙ্কিত সেখানকার সাধারণ মানুষ।

একই চিত্র ইছামতি ঘেষা যশোরের কায়বা-গোগা ইউনিয়ন সংলগ্ন কলারোয়ার কয়েকটি গ্রাম। সেখানকার ভবানিপুর, বিলপাড়া, রুদ্রপুর, দাউখালিসহ অন্যান্য গ্রামের পানির চাপ কলারোয়ার কাদপুর, গোয়ালপাড়া, চন্দনপুর, গয়ড়াকে হুমকিতে ফেলেছে।

বেত্রবতী নদীর পানিও উপচে পড়ে নদী তীরের অনেক বসতবাড়ির আঙিনায় উঠতে শুরু করেছে। উপজেলার কেরালকাতা, কুশোডাঙ্গা, কয়লা, হেলাতলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম এবং পৌরসদরের তুলশীডাঙ্গা, মির্জাপুর, কলারোয়া বাজার, মুরারিকাটি ও গোপিনাথপুর গ্রাম দিয়ে চলে যাওয়া বেত্রবতী নদীর দু’তীরের অনেক ফসলী জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পানি উঠে গেছে কিংবা উঠতে শুরু করেছে। কলারোয়া উপজেলাকে বিভক্তকারী এ’ নদীটি পানি টানতে না পারায় নদী সংশ্লিষ্ট ও সংলগ্ন অনেক মাঠ পানিতে থই-থই করছে। পৌরসদরের পাশাপাশি উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বহু মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে উজান থেকে নেমে আসা ঢল, কপোতাক্ষের উপছে পড়া পানি এবং তীরের ভেঁড়িবাধ ভেঙ্গে উপজেলার কপোতাক্ষ ঘেঁষা ৪টি ইউনিয়নের ৩০গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে ২০হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন পানি বাড়তে থাকায় ওই জনপদের মানুষ ঘরবড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ উচু রাস্তার উপর অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে। গত এক সপ্তাহ ধরে ত্রাণের অভাবে অভুক্ত আছে ওই এলাকার কয়েক’শ মানুষের মাঝে এখনও পর্যন্ত আসেনি কোন সহায়তা। বিশুদ্ধ পানি বা স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা না থাকায় ডায়রিয়া, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেখ ফিরোজ আহম্মেদ সাংবাদিকদের জানান, পানির চাপে কপোতাক্ষের ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ধানদিয়া, ক্ষেত্রপাড়া, দক্ষিন ক্ষেত্রপাড়া, বেলেমাঠ ও মোল্যাপাড়ার বসতবাড়িতে পানি উঠে গেছে। ওই ইউনিয়নের প্রায় ৬’শ বিঘা জমির ফসলসহ বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি ক্ষতিসাধন হয়েছে। সরসকাটি হাইস্কুল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ অন্যান্য স্থানে পানি উঠে গেছে। এখন পর্যন্ত প্রতিদিন দুই থেকে তিন ইঞ্চি করে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেয়াড়ার কাশিয়াডাঙ্গা, মাঠপাড়া, আবাদপাড়া, সানাপাড়া, খাঁনপাড়া কারিগরপাড়া, বাওড়কান্দা, মিরেরডাঙ্গা, পাকুড়িয়ার অনেক বসতবাড়ির আঙ্গিনাসহ ঘরের ভিতর পানি ঢুকে পড়েছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল মান্নান। তিনি জানান, ওই ইউনিয়নের ছয়শ’ পরিবারের প্রায় আড়াই হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। ২৫টির মতো কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। ৩০বিঘা জমির আউশ-আমন ধানের বীজতলা, একশ’ বিঘা জমির ধান ও ৫৫ টির মতো মাছ চাষের পুকুরসহ ঘের ভেসে গেছে।

দেয়াড়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নেয়া জেসমিন আরা, পাকুড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া পচা বিশ্বাস, রাধাপদ বিশ্বাস জানান, তাদের ঘরবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় পরিবাররের সদস্যদের নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে। দুই বেলা শুকনো রুটি খেয়েই থাকতে হচ্ছে। গরু ছাগলসহ সহায় সম্বল নিয়ে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন।

জালালাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাস্টার শওকত আলী জানান, শংকরপুর, সিংহলাল, জালালাবাদ, বাটরা, ঘরচালা কাশিয়াডাঙ্গাসহ আশপাশের গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

যুগীখালী ইউনিয়নের ওফাপুর খালের স্লুইজ গেটের কপাট ভেঙ্গে গত এক সপ্তাহ ধরে কপোতাক্ষের উপচে পড়া পানি কামারালী, তরুলিয়া, তালুন্দিয়া, যুগীখালী, আগুনপুর ও রাজনগর বিলে প্রবেশ করছে। পানিতে ওই এলাকার প্রায় দুই হাজার বিঘা জমিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সাংসদ এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ ও কলারোয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন জানান, তারা ইতোমধ্যে ওই সব প্লাবিত অঞ্চল ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানেরা জন্য বেসরকারি সংস্থা ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহবান জানান তারা।