মেইন ম্যেনু

পানি-সঙ্কটে নদী! চিন্তায় বিজ্ঞানীরা

উৎসমুখেই খরা। আর তাতেই অদূর ভবিষ্যতে গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু-র মতো নদনদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের একাংশের আশঙ্কা, আগামী ৩৫ বছরে হিমালয়ের হিন্দুকুশ অঞ্চলে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে।

কোথাও কোথাও বৃদ্ধির হার বছরে ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। আর তাতেই গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, সালউইন ও মেকং— এই পাঁচ নদীর উৎসমুখ তীব্র জলসঙ্কটের সম্মুখীন হতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার জেরে হিমবাহগুলি দ্রুত গলে যাওয়ার আশঙ্কাতেই ওই পাঁচ নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি প্যারিসের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিষয়টি উত্থাপন করেছিল ‘সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (আইসিআইএমওডি)।

আইসিআইএমওডি-র ডিরেক্টর জেনারেল ডেভিড মোল্ডেনের দাবি, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে সব চেয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে হিমালয়ের হিন্দুকুশ অঞ্চল। কেবল আমাদের চেষ্টায় সঙ্কটের অভিমুখ বদল সম্ভব নয়। তাই বিশ্বের রাষ্ট্রনায়ক ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের কাছে সমস্যাটি তুলে ধরেছি।’’ সংস্থার সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত এক পরিবেশবিজ্ঞানীর মন্তব্য, ‘‘ওই পাঁচটি নদীর উৎসমুখ শুকিয়ে গেলে সমতলে জলের জোগান কমে যাবে।

ভারত, বাংলাদেশ চিন, মায়ানমার, তাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম— যে সব দেশের মধ্যে দিয়ে ওই নদীগুলি বয়ে গিয়েছে, সঙ্কটে পড়বে তারা।’’ হিন্দুকুশ অঞ্চলে কোথায় ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কতটা, কোথায় হিমবাহ দ্রুত গলছে, কোথায় ভূমিকম্পে পাথর পড়ে নদীবক্ষ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, ভূমিকম্পে কোথায় নতুন জলাধার তৈরি হয়েছে, কোন কোন এলাকায় ধসের ফলে জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, তার একটা মানচিত্র তৈরি করেছে আইসিআইএমওডি।

সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, ওই মানচিত্র দেখে পৃথিবীর যে কোনও এলাকার পরিবেশবিজ্ঞানীরা হিন্দুকুশ অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। নেপালে গত মে-জুন মাসের দু’টি বড় মাপের ভূমিকম্পের পরে হিমালয়ের ওই অংশে ছোট ছোট বহু ফাটল দেখা দিয়েছে। ওই সব এলাকার সুনির্দিষ্ট মানচিত্র তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতের বিপদ থেকে হিন্দুকুশ অঞ্চলকে বাঁচানো যাবে না বলে মনে করছেন আইসিআইএমওডি-র সমীক্ষকেরা।

ওই সংস্থার বিজ্ঞানীরা যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে। তার ফলে নষ্ট হয়ে যাবে গোটা এলাকার বাস্তুতন্ত্র। এতে বর্ষা দীর্ঘায়িত হবে, কিন্তু বৃষ্টি হবে সামঞ্জস্যহীন ভাবে। বৃষ্টিপাতের মাত্রা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া যাবে না।

বর্ষাকাল জুড়ে বৃষ্টি না হয়ে কয়েকটা পর্যায়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হবে। হিমবাহ গলতেই থাকবে। বেশি গলবে সিন্ধু অঞ্চলের হিমবাহগুলি। আইসিআইএমওডি-র সমীক্ষকরা জানাচ্ছেন, হঠাৎ হঠাৎ ভারী বর্ষণে নদীগুলি দিয়ে এক সঙ্গে অনেক জল নামায় পাহাড়ে ধস ও সমতলে বন্যা হবে। হড়পা বানে অধিকাংশ জল বয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভে যথেষ্ট জল সঞ্চিত হতে পারবে না। ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাবে।

আবার অন্য সময়ে নদীতে জলের অভাব থাকায় পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় চাষ মার খাবে। উষ্ণায়নের ফলে হিন্দুকুশ হিমালয়ে হিমবাহ কী ভাবে গলে যাচ্ছে, সম্প্রতি ইউরোপের ভূবিজ্ঞানীদের সংগঠন ‘ইউরোপিয়ান জিওসায়েন্সেস ইউনিয়ন’-এর জার্নাল ‘ক্রায়োস্ফিয়ার’-এ প্রকাশিত নিবন্ধে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আইসিআইএমওডি-র জলবিজ্ঞানী জোসেফ শি ওই নিবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, হিমালয়ের এই অংশে যে সাড়ে পাঁচ হাজার হিমবাহ রয়েছে, তার একটা বড় অংশ আগামী ১০০ বছরের মধ্যে গলে যাবে। নিবন্ধকারেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, হিন্দুকুশ হিমালয়েই এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো দুনিয়ার সব থেকে উঁচু পর্বতশৃঙ্গগুলি রয়েছে।

হিমবাহগুলি একের পর এক গলে গেলে ওই সব পর্বতশৃঙ্গের কী হাল হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে নিবন্ধটিতে। হিমালয়ের হিমবাহ যে দ্রুত গলে যাচ্ছে, রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইন্টার গভর্মেন্টাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর রিপোর্টেও তার উল্লেখ রয়েছে।

তবে যে হারে হিমবাহ গলবে বলে আইপিসিসি এবং আইসিআইএমওডি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, তার সঙ্গে সহমত নন ভারতীয় ভূ-বিজ্ঞান পর্ষদ (জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া)-এর বিজ্ঞানীদের অনেকেই।

তারা বলছেন, এখনও পর্যন্ত সেগুলি যে হারে গলছে, তাতে ১০০ বছরের মধ্যে অধিকাংশ হিমবাহ গলে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে তাপমাত্রা আরও দ্রুত বাড়লে তার কুফল যে হিমবাহের উপরে পড়বে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। সূত্র : আনন্দবাজার