মেইন ম্যেনু

পাল্টেছে জঙ্গি পরিকল্পনা : টার্গেট এখন স্বজনরাও

সদ্য পদোন্নতি পাওয়া এসপি বাবুল আক্তারসহ অন্তত চারজনকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও সাবধানে থাকার নির্দেশনা সত্ত্বেও খুন হলেন বাবুলের স্ত্রী। গত দেড় বছরে অর্ধশত জঙ্গি হামলায় পুলিশসহ প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭ জন। তবে এটাই প্রথম কোনো ঘটনা যেখানে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী খুন হলেন। গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জঙ্গিরা তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করছে। সক্রিয় পুলিশ সদস্যদের দুর্বল করতেই এ ধরনের হামলার ছক এঁকেছে তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে সারাদেশে উগ্রপন্থিদের অর্ধশত টার্গেট কিলিং সংগঠিত হয়েছে। নিহত হয়েছেন ৪৭ জন। তাদের হামলায় একের পর এক লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, বিদেশি নাগরিক, ইউএসএইড কর্মকর্তাসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য খুন হয়েছেন।

তাদের হাত থেকে বাদ যায়নি পুলিশ সদস্যও। গাবতলী পুলিশ চেকপোস্টে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ইব্রাহীম মণ্ডল ও সাভারের আশুলিয়ায় কনস্টেবল মুকুলকে হত্যা করে জঙ্গিরা। চলতি বছরে ১৩ হামলায় ১৬ জন মারা গেছেন। পুলিশ সদর দফতরের দেয়া তথ্য মতে, ২৩টি হামলায় জেএমবি জড়িত। কিন্তু এসব ঘটনায় দায়ের করা ২৪টি মামলার রহস্যই ভেদ করতে পারেনি পুলিশ।

গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশ-র্যাবসহ গোয়েন্দা বাহিনীর অভিযানে দুর্বৃত্তদের বেশ কয়েকটি কর্মকৌশল ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এখন তারা লক্ষ্য পরিবর্তন করেছে। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ বিরোধী অপারেশনে জড়িত পুলিশ সদস্যদের দুর্বল করতেই আত্মীয়-স্বজনদের টার্গেট করা হয়ে থাকতে পারে। এমন জেরেই হয়তো বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে।

নারীকে টার্গেট করে হত্যা এটাই প্রথম। এমনকি পুলিশের কোনো কর্মকর্তার স্ত্রী খুনের ঘটনাও প্রথম। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আশঙ্কা করছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম কিংবা জেএমবির পরিকল্পনায় খুন হয়েছেন বাবুলের স্ত্রী মিতু।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল রোববার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাবুলকে দুর্বল করতে তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাস দেড়েক আগে চিঠি দিয়ে এসপি বাবুল আক্তার, এসআই সন্তোষ চাকমা, রাজেশ চাকমা ও আকতার হোসেনকে হত্যার হুমকি দেয় বুলবুল নামে এক জেএমবি সদস্য।

২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সদরঘাটে একে-২২ রাইফেলের গুলিতে ছদ্মবেশী দুই ছিনতাইকারী ও এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ তিনজন নিহত হন। পরে জানা যায়, তারা জেএমবির সদস্য। এরপর ৬ অক্টোবর নগরীর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে জেএমবি চট্টগ্রামের সামরিক কমান্ডার জাবেদসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয় বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে। পরদিন গ্রেফতার জাবেদকে নিয়ে অক্সিজেন কুয়াইশ সড়কে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে গ্রেনেড বিস্ফোরণে জাবেদ মারা যায়। ওই চার পুলিশ কর্মকর্তা এ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।

এদিকে, বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হওয়ার পর ওসি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পাঠানো বার্তায় সবাইকে আরো সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বাবুল আক্তারের স্ত্রীর খুনিদের যে কোনো মূল্যে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হবে বরে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।

এদিকে, অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, জঙ্গিরা হুমকি দেয় কিন্তু কখনো বলে-কয়ে খুন করতে যায় না। প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা ‘পোস্ট-অ্যাকটিভ’, ঘটনা ঘটার পর দৌড়ঝাপ। অধিকাংশ খুনের ঘটনার পর জড়িতরা অধরা। এরইমধ্যে নতুন খুনের অবতারণায় আগের খুন ঢাকা পড়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান বলেন, পুলিশ ‘পোস্ট-অ্যাকটিভ। হুমকির ব্যাপারে পুলিশ আগাম তথ্য পায়। কিন্তু হামলা কখন হবে তা পায় না। সে কারণে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও নেই। কিন্তু ঘটনা ঘটনার পর দৌড়ঝাপ শুরু হয়। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে পুলিশ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতে জঙ্গিরা হামলার নতুন নতুন টার্গেট করছে। বাহিনীর মনোবল শক্ত রাখতে পুলিশের এখনই উচিৎ কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া।

উল্লেখ্য, গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন মিতুকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।জাগোনিউজ