মেইন ম্যেনু

পাল্টে যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

চলতি বছরে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আগে। এই বৃষ্টিপাতের ফলে এডিস মশার জন্ম হওয়ায় চিকুনগুনিয়ার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে গত বছরের নভেম্বর মাস থেকেই। আর বর্ষার সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ গত কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এবার ডেঙ্গু রোগীদের দেখে চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর লক্ষণ পাল্টে যাচ্ছে। মানুষের বায়োলজিক্যাল ক্যারেক্টার বদলে যাওয়ার কারণেই ডেঙ্গুর লক্ষণ পাল্টাচ্ছে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে খবরটি দিয়েছে শীর্ষস্থানীয় একটি অনলাইন নিউজ প্রোটাল; আওয়ার নিউজ বিডি’র পাঠকদের অবগতির জন্য প্রতিবেদনটি হুবহূ তুলে ধরা হলো-

চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের বায়োলজিক্যাল ক্যারেক্টার বদলে যাচ্ছে। এ কারণে রোগীরা অনেক সময় বুঝতে পারছেন না, তারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ কারণে শুরুতে অবহেলা করলেও যখন চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন তখন অনেকটা দেরি হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এজন্য জ্বর হলে অবহেলা করার সুযোগ নেই, সঙ্গে সঙ্গেই যেতে হবে চিকিৎসকের কাছে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করা ফারিয়া হাসান জ্বরকে প্রথমে পাত্তাই দেননি। কিন্তু দু’দিন পর জ্বরের তীব্রতা বাড়লে তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। সেখানেই ধরা পড়ে ফারিয়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, কিন্তু ততক্ষণে তার প্লাটিলেট কমে এসেছে ভয়ঙ্করভাবে। সে রাতেই প্রায় চার ব্যাগ রক্ত দেয়ার পর কিছুটা প্লাটিলেট বাড়ে ফারিয়ার। তিনি বলেন, ‘প্রথম দু’দিনের জ্বরে এটাকে ডেঙ্গু বলেই ভাবিনি। এখনো অনেকক্ষণ বসে কাজ করতে পারি না, খুব দুর্বল লাগে শরীর, শক্তি পাই না কাজ করার মতো।’

একই অভিজ্ঞতা সারোয়ার ইবনে আলম, মধুমিতা ব্যানার্জী, সুপর্ণা হালদারসহ অনেকেরই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কথা হয় তাদের সঙ্গে। প্রত্যেকেই জানালেন, ডেঙ্গুর যেসব লক্ষণের কথা চিকিৎসকরা বলে থাকেন, সেসব কিছুই তাদের ক্ষেত্রে ছিল না। গায়ে র‌্যাশ বা তীব্র ব্যথা ছিল না। কিন্তু পরে ডায়াগনোসিস করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু না থাকলেও চলতি বছরের ওই মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ৯১ জন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম ডেঙ্গু জ্বর ধরা পড়ে এবং রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৫। অন্যদিকে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ২৩৪ জন। ২০০৭ সালে মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৬৬ জন, ২০০৮ সালে এক হাজার ১৫৩ জন, ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন, ২০১০ সালে ৪০৯ জন, ২০১১ সালে এক হাজার ৩৫৯ জন, ২০১২ সালে ৬৭১ জন, ২০১৩ সালে এক হাজার ৭৪৯ জন, ২০১৪ সালে ৩৭৫ জন, ২০১৫ সালে তিন হাজার ১৬২ জন, ২০১৬ সালে ছয় হাজার ৬০ জন এবং চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৯১৫ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হবে জানিয়ে আইইডিসিআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর বলেন, ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক একই– এডিস মশা। কিন্তু যেহেতু এবারে চিকুনগুনিয়ার কারণে এডিস মশা নিধনের কাজ চলেছে, তাই ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কম।’

এখন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের লক্ষণগুলো বদলে যাচ্ছে জানিয়ে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমদিকে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়, তখন শরীরে তীব্র ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের চারপাশে ব্যথা নিয়ে রোগীরা আসতেন। কিন্তু এখন সে লক্ষণগুলো বদলে যাচ্ছে। এখন আমরা দেখছি এরকম লক্ষণ ছাড়াও জ্বর এবং কিছুটা মাথাব্যথা নিয়ে রোগীরা আসছেন।’

তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গুর জ্বরে আগে যেরকম ‘হাড় ভাঙা’ ব্যথা ছিল, সে লক্ষণটিরও পরিবর্তন হচ্ছে। প্রথমদিকে অনেক ডেঙ্গু রোগী আপাত সুস্থ থাকে, কিন্তু তীব্র অসুস্থতা বোধ না করে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর অসুস্থতা বোধ করে– এরকম কিছু বিষয় বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি।’

এরকম পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে ডা. চৌধুরী বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই দেশে ডেঙ্গু হচ্ছে। এ কারণে মানব শরীরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রথমদিকে ডেঙ্গুর আক্রমণ যেমন তীব্রভাবে অনুভূত হতো, সেটি এখন আর হচ্ছে না। কিন্তু এর ফলে যেটা হয়েছে, লক্ষণগুলো তীব্রভাবে অনুভুত না হওয়ার কারণে অনেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও তা প্রথমে বুঝতে পারছেন না। ডেঙ্গু হয়েছে কিনা সে বিষয়েও তারা সচেতন থাকছেন না। কিন্তু যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন তখন অনেকটা সময় চলে যায় এবং রক্তের প্লাটিলেটের ভাঙ্গন শুরু হয়ে যায়। তাই অবহেলা না করে জ্বরের শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু রোধ করতে ঘরের ভেতরে-বাইরে, ছাদে ও চারপাশে যে জায়গা এবং যেসব পাত্রে পানি জমতে পারে সে জায়গা পরিষ্কার করতে হবে। সরকারি কমিউনিটি স্পেস অর্থাৎ খোলা যেসব জায়গায় পানি জমতে পারে সেসব জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে। ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘এই দুই সমন্বিত উদ্যোগে মশার চারণভূমি বা মশার জন্মস্থানগুলো মশামুক্ত করতে পারলে ডেঙ্গু রোধ করা যাবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এবারে এমনিতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ কম। কারণ, চিকুনগুনিয়ার কারণে এডিস মশা নিয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে ডেঙ্গু রোগী যা পাওয়া যাচ্ছে, সেখান থেকেই দেখছি লক্ষণগুলো বদলে যাচ্ছে। কারও গায়ে র‌্যাশ নেই, তীব্র ব্যথা নেই– মানুষের বায়োলজিক্যাল ক্যারেক্টার বদলে যাচ্ছে বলেই মূলত আমরা এখন এগুলো দেখতে পাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘লক্ষণ পাল্টালেও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। জ্বর হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’






মন্তব্য চালু নেই