মেইন ম্যেনু

পাশের বাড়িতে গণতন্ত্র

বাড়ির পাশের গণতন্ত্র উৎসবে অন্তর থেকে অংশ নিয়েছে মিয়ানমারের প্রতিবেশীরা। বাংলাদেশের দুই নিকট প্রতিবেশীর মধ্যে মিয়ানমার অন্যতম। বর্মী গণতন্ত্র কন্যা অং সান সু চির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অনুরাগ বহু পুরনো। বর্মী জাতির পিতা এবং স্বাধীনতার স্থপতি অং সানের প্রতিও রয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিক ও জনগণের অপরিসীম শ্রদ্ধা। অনেকেরই ধারণা দেশটির

সঙ্গে বুঝি বহুকাল আগ থেকেই এদেশের সঙ্গে বিরোধ-বিসংবাদের সম্পর্ক। এই ধারণার জন্য অবশ্য রোহিঙ্গা ইস্যু অন্যতম বড় কারণ। কিন্তু গত কয়েকশ’ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, বার্মা নামের দেশটির রাজাদের সঙ্গে বাংলার শাসনকর্তাদের মধুর সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন সময়ে তারা পরস্পরের মধ্যে অত্যন্ত মূল্যবান উপহার সামগ্রী বিনিময় করেছে।

গতকালের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে বাংলাদেশীরা অনেক দিন ধরেই নিবিড়ভাবে নজর রেখে চলছিলেন। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা ও স্থলসীমা নির্ধারণ সাফল্যের সঙ্গে নিষ্পত্তি হওয়ার পরেও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আগের মতোই সীমিত রয়ে গেছে। যদিও চীনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সিল্করুট পুনরুজ্জীবনে মিয়ানমার আগ্রহ দেখিয়ে চলেছে। মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীন সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হলে সেই পথে বাংলাদেশের মানুষ চীনের মুসলিম অধ্যুষিত ইয়ানানে দ্রুততম সময়ে পৌঁছাতে পারবে। সুতরাং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক ও ব্যবসাবাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করার মনোভাব থেকেও বাংলাদেশের জনগণ মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার দিকে লক্ষ্য রেখে চলছেন।

বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ সময় সামরিক জান্তাশাসিত ছিল। জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এখনও মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মিয়ানমারসহ বিশ্বের অধিকাংশ সামরিক জান্তা ও একনায়করা সবচেয়ে বড় ভয় পায় ব্যালটকে। তারা নানা ছলেবলে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে। মানুষের ভোটের অধিকার তারা দিতেই চায় না। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির জনকের কন্যা হিসেবে অং সান সু চি কিভাবে তার দলকে নেতৃত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসছেন তা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কাছে বিশেষ করে যেসব সমাজে গণতন্ত্রের ঘাটতি চলছে তাদের কাছে বিরাট একটা শিক্ষণীয় বিষয়। অং সান সূ চি গতকাল তার দলের এগিয়ে থাকার মুহূর্তেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পরাজিত প্রার্থীদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করার জন্য। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পরাজিত প্রার্থীও একই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শ্রদ্ধাভাজন অংশীদার। যারা বিরোধী দলে বসবে তারাও অভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

সারাবিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া মিয়ানমারের নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছে। কারণ মিয়ানমার বহুকাল অবশিষ্ট বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। একসময় ধরেই নিয়েছিল অনেকে যে দেশটি বুঝি ভোট ও ব্যালটের শক্তিকে অস্বীকার করে কেবল উন্নয়ন দিয়ে গদিতে টিকতে পারবে। সামরিক জান্তা সব চেষ্টাই করেছে। ক্ষমতা ধরে রাখতে এমন ফন্দিফিকির নেই যে, সেটা তারা প্রয়োগ না করার চিন্তা করেনি। কিন্তু শেষ হাসি স্বৈরশাসকের নয়, সম্ভবত শেষ হাসিটা গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চির মুখেই দেখা যাবে। অনেকে বলছেন, শেষ হাসিটা আসলে গণতন্ত্রের। ২৫ বছর আগে তারা একটি লোকদেখানো নির্বাচন করেছিল। নির্বাচনে হার হবে জেনে তারা আর সাধারণ নির্বাচন দিতেই রাজি হয়নি।

কিন্তু গতকাল বর্মী জনগণ নতুন করে ইতিহাস লিখেছে। সারা বিশ্ব অবাক চোখে দেখেছে, বিস্ময়াভূত হয়ে শুনেছেন, স্বৈরশাসকরা যারা ক্ষমতায় থেকে দল করেছিল, আর ভেবেছিল তারা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির গল্প শুনিয়ে জনগণকে অনির্দিষ্টকাল ধরে ঘুম পাড়াতে পারবেন, যারা ভেবেছিলেন, আমরা তো আন্দোলন দাবিয়ে রেখেছি। আমরা তো সভা-মিছিল করতে দেই না। আমরা তো ধর্মঘট চিরকালের জন্য নিষিদ্ধ করে রেখেছি। কাউকে কোথাও সরকারবিরোধী আলোচনা করতে দেই না। কাউকে কোন গণতন্ত্র অনুশীলন করতে দেই না। আমাদের সরকারি পেটোয়া বাহিনীকে সবাই ভয় করে। আমরা ভোট দেবই না। ভোটের নামে মাঝেমধ্যে প্রহসন করব। মাঝেমধ্যে ভোট ভোট খেলবো। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়বো না। বলবো ভোট চেয়ো না গো, উন্নয়ন নাও।

আজ ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে বার্মায় কোন জা্বলাও পোড়াও আন্দোলন হয়নি। অং সান সু চিকে অনেক আগে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু তারপরেও সু চি শান্তিপূর্ণ ও নীরব আন্দোলনের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। অত্যন্ত ধীরগতিতে অত্যন্ত অসহিংস উপায়ে একনায়কের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন। গতকাল তিনি তার ফল পেয়েছেন।

২৫ বছর পরে হলেও মিয়ানমারে প্রথম অবাধ সাধারণ নির্বাচনে কার্যত ধরাশায়ী হয়েছে শাসক দল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ বা ইউএসডিপি। হার স্বীকার করে নিয়ে শাসক দলের নেতা হতে উ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘‘ভাবিনি, এই ভাবে আমরা হেরে যাবো। আমরা মানুষের জন্য অনেক কিছু করেছিলাম। তবে জনগণের রায় আমরা মেনে নিচ্ছি। পরাজয়ের কারণ এখন আমাদের ভাল করে খতিয়ে দেখতে হবে।’’

উল্লেখ্য, নির্বাচন পার্লামেন্টের ৭৫ শতাংশ আসনের প্রতিনিধি চূড়ান্ত করবে। বাকি ২৫ শতাংশ আসন অনির্বাচিত সামরিক প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য এনএলডিকে ৬৭ শতাংশ আসনে জয়ী হতে হবে। তবে ঢাকায় একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, সব হিসাব পাল্টে যেতে পারে।

সু চি যদি ভূমিধস বিজয়ের দিকে যান তাহলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একনায়কের গোপন সমঝোতা ভেস্তে যেতে পারে। এমনকি সু চিকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে সংবিধান যে বাধা তৈরি করেছে তাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে যেতে পারে। কারণ জনস্রোত তৈরি হলে জেনারেলরা জননেত্রীর সঙ্গেই শামিল হবেন। সংবিধানে পরিবর্তন আনা কঠিন হবে না। নির্বাচনের আগেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বলেছেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, সরকার ও সেনাবাহিনী তা মেনে নেবে।

দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হতে উ ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘কোন ধরনের আপত্তি ছাড়াই আমরা ফলাফল মেনে নেব। আমরা এখনও চূড়ান্ত ফল জানি না।’

এটা লক্ষণীয় যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় আগে থেকেই ছিল। এমনকি কাঠামোগত অনেক ত্রুটি রয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বর্মী অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

জন কেরি নির্দিষ্টভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটের বাইরে রাখার কথাও গতকাল তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন।
রোহিঙ্গা মুসলিম সমপ্রদায় সহ লাখো মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সংখ্যালঘু কারেন জনগোষ্ঠীর একজন ভোট দিতে না পেরে নিজের আঙুল কেটে ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দাপট আর সংখ্যালঘু মুসলিম সমপ্রদায়ের প্রতি হুমকি-ধামকির কারণেও নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে সেনাপ্রধান মিন অং লাইং রাজধানী নেপিডো’য় গতকাল বলেন, এবার ১৯৯০ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে না। জনগণ এনএলডিকে পছন্দ করলে সেনাবাহিনীর সেটা মেনে না নেয়ার কোন কারণ নেই।

১৯৯০ সালের নির্বাচন অবাধ হয়েছিল এবং সু চি বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই ফলাফল উপেক্ষা করেছিল। পরবর্তী ২০ বছরের বেশির ভাগ সময় গৃহবন্দি রাখা হয় সু চিকে। ২০১০ সালে তিনি মুক্তি পান। ইউএসডিপি সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মিয়ানমারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার কাজ শুরু করে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। তবে উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ তারা পাবে না। নির্বাচনে জয়ী হলে সু চিকে একটি শক্তিশালী জোট গড়ার জন্য সঙ্গী খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মিয়ানমারে অন্তত ১০০টি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যারা দেশটির জনগণের প্রায় ৩০ শতাংশ। এসব রাজনৈতিক দল কোন জোটে যোগ দিয়ে নিজ নিজ সমপ্রদায়ের সুবিধা পেতে চাইবে।

সার্বিক বিচারে বাড়ির পাশের ভোট উৎসব যেখানে সব দল অংশ নিয়েছিল এবং বড় ধরনের কোন জাল-জালিয়াতি ও মাস্তানির খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের মদতে কোথাও সরকার সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করারও খবর মেলেনি। বাংলাদেশের মানুষ তাই অব্যাহতভাবে টিভি পর্দার দিকে নজর রাখছে। তাদের চোখ যেন সরছেই না।

পরাজয় মেনে নিলেন স্পিকার
পার্লামেন্টের বর্তমান স্পিকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ইউ শ মান নিজ আসনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন। ফেসবুকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরাজয় মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন। অং সান সু চি’র দল এনএলডির প্রার্থী ইউ থান নিউন্তের কাছে তিনি পরাজয় বরণ করেন। ফেসবুকে দেয়া বার্তায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মিয়ানমারের বাগো এলাকার ফিউ আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন।

সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের হতাশা নেই
দ্য মিয়ানমার টাইমস বলেছে, মিয়ানমারের সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে কোন হতাশা নেই। তারা বলেছেন, অভিনন্দন জানিয়ে ফল মেনে নেবেন। এ কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে কমান্ডার ইন চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লায়িং-এর কণ্ঠে। তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন তারা নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করবেন না। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে এনএলডি ভূমিধস বিজয়ের পরে তখনকার সেনাবাহিনী তাতমাদাও ওই ফল প্রত্যাখ্যান করেছিল।

রাজধানী শহরের ছয়টি এলাকায় ইউএসডিপি, এনএলডি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফোর্স পার্টি, ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি ও স্বতন্ত্র ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এসব আসনে কি ঘটবে তার পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। তবে ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে প্রাথমিক যে ফল পাওয়া যাচ্ছে তাতে এগিয়ে রয়েছে এনএলডি। দেক্ষিণাথিরির ১৫টি ভোট কেন্দ্রে ১০টিতে জিতেছে এনএলডি, তিনটিতে হেরেছে। বাকিগুলোতে গণনা চলছিল। সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মিন অং হ্লায়িংকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যদি এনএলডি বিজয়ী হয় তাহলে তিনি তা মেনে নেবেন কিনা। জবাবে তিনি বলেন, মেনে না নেয়ার তো কোন কারণ নেই। জনগণের পছন্দ আমরা মেনে নেব।
লালে লাল চারদিক

আনন্দ ধরছে না সু চির শিবিরে। লাল ব্যানার, লাল শার্ট পরে রাজপথে নেমে পড়েছেন তার সমর্থকরা। যেখানেই জায়ান্ট স্ক্রিনে নির্বাচনের ফল দেখানো হচ্ছে সেখানেই এই লালের সমুদ্র। তাতে যোগ দেয় ৩৬ বছর বয়সী কো সি থু। তিনি বলেন, সরকারি কোন কর্মকর্তা নয়। বিজয়ী হবেন এনএলডির প্রার্থী। তাদের বিজয় শতভাগ নিশ্চিত। যখনই কোন আসনের ফল ঘোষণা হচ্ছে তখনই সেই জনস্রোত সাগরের ঢেউয়ের মতো নেচে উঠছিল। এনএলডির ৩০ বছর বয়সী সমর্থক কো মিন থু। তিনি বলেন, কোন সংশয় নেই। আমরা সব সময়ই জানি বিজয় আমাদের। ঘুমহীন কাটছে তাদের সময়। কেউ বা ফেসবুক খুলে তাতে দৃষ্টি ছুড়ে বসে আছেন।



« (পূর্বের সংবাদ)