মেইন ম্যেনু

পাহাড় আর রহস্যে ঘেরা ভালবাসার ইচ্ছা পূরণের গ্রাম

তিনটে সবুজ গ্রাম– মানখিম, রামধুরা আর ইচ্ছেগাঁও৷ এই তিন গাঁয়েই যেন প্রকৃতি রং ছড়িয়ে দিয়েছে৷ শিলিগুড়ি থেকে যখন বোলেরো গাড়িতে উঠলাম, বুঝতেই পারিনি জীবনের এত বাঁক লুকিয়ে রয়েছে চলার পথে৷ পাহাড়ের রহস্যই যেন জীবনে ঘেরা৷ পূর্ব সিকিমের সুখের দেশে পা রাখলাম বাংলা পার হতেই৷

তখনই যেন সমস্ত প্রকৃতি উজাড় করে দিল রূপের ডালি৷ গাড়ি পূর্ব সিকিমে ঢুকতেই অজস্র ফুলের অভ্যর্থনা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ পপি, ঘন্টি, দূরে নীল পাহাড়ের গায়ে রডোডেনড্রনের ছড়াছড়ি৷ কোনও পাহাড়ের মাথায় আবার হিরের টোপর৷ ড্রাইভার চেতন বললেন, কাল রাতে এখানে বৃষ্টি হয়েছিল, তাই বরফ এখন ভাসছে দূর পাহাড়ের মাথার ওপর টোপর হয়ে৷

আমাদের গাড়ি প্রথমে পৌঁছল সোজা আড়িতার৷ ওখানে লেকের ওপরেই মানখিম৷ মেঘ ঘিরে রেখেছে আড়িতার লেককে৷ কোথাও কোথাও দমকা বাতাসের ধাক্কায় সরে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে জাপানিকো ইন্ডিকা গাছের সবুজ সারি৷ লেকের জল স্থির৷ কখনও বাতাসে আঁকা হালকা কাঁপানো ঢেউ৷ দশ-বিশটা মরাল খেলছে লেকের জলে৷ লেকের জলে বোটিং করার সুবন্দোবস্ত আছে৷

আড়িতার থেকে গাড়ি পৌঁছাল মানখিমে৷ মানখিমের চারপাশ সবুজের চাদরে মোড়া৷ চারিদিকে এলাচের গন্ধ্যা আপনি মাতোয়ারা হয়ে যাবেন৷ এখানেই থাকার জায়গা হল রবিনভাই-এর হেভেন্স ভ্যালি হোম স্টে-তে৷ সুন্দর, সাজানো-গোছানো কটেজ৷ সামনে পাথর কাটা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলে একটি ছাতা লাগানো বাঁধানো জায়গা৷ সেখানে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখর দেখা যায়৷

এরপরের গন্তব্য রামধুরা৷ মানখিম থেকে দূরত্ব ৪৫ কিমি৷ এখানে প্রকৃতিকে ফুলের জলসাঘর বলা যায়৷ বলা যায় ধর্মের সহাবস্থানও৷ এখানেই শিবের শ্বেতশুভ্র মন্দিরে জল দিতে যান পাহাড়ি মেয়েরা নিচের তিস্তা থেকে৷ মনস্কামনা পূরণের জন্য প্রতি সোমবার উৎসবের দিন লেগে থাকে৷ দুপুরে বের হলাম বৌ মনাস্ট্রি, শংকরের মন্দির দর্শনে৷ শিবের মন্দির যেতে রামধুরা থেকে বিস্তর পাহাড়ি চক্কর ভেঙে পৌঁছতে হয় অনেক উঁচুতে৷

রামধুরা সিঙ্কোনা চাষের ভূমি৷ হিমালি পার্কও দ্রষ্টব্যস্থান৷ রামধুরায় দেখলাম নদী ও পাহাড়ের আশ্চর্য সখ্য৷ ওয়াচটাওয়ার থেকে নিচে তাকালে দেখা যাবে আঁকাবাঁকা প্রবহমান তিস্তা, ওপরে রোদ্দুরে ঝিকমিক সোনালি পাহাড়৷ রাতে এখানে আলোর খেলায় পেলিং, দার্জিলিং, রংপো তিন শহরই দৃশ্যমান৷

রামধুরায় থেকে যাওয়ার বাসনা অধুরা করেই চলেছি ইচ্ছেগাঁওয়ের দিকে৷ রামধুরা থেকে ইচ্ছেগাঁও ৫-৬ কিমি৷ ইচ্ছেগাঁওয়ের আকাশে মেঘের বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছে৷ আমাদের গাড়ি পৌঁছল নির্মলা হোম স্টে-তে৷ নেমেই ছুট দিলাম পাইন বনভূমির দিকে৷ এ এক অপরূপ দৃশ্য৷ সঙ্গে এই হোম স্টে-র মালিকের ছোট্ট মেয়ে করিনা৷ এখানে আমলকী, হরীতকী, বহেড়া ছাড়াও পুদিনা, চিরতার জঙ্গল রয়েছে৷ তিয়ারপাতি গাছও রয়েছে, যা নাকি জীবনদায়ী ওষুধ৷ এখানের জঙ্গলে কিংফিশার, ব়্যাবিট, বাদুড়, ভালুক, শজারু, খেঁকশিয়ালের অবাধ রাজ৷ ইচ্ছেগাঁওয়ের নির্মলা হোম স্টে-র মারসিনা, শান্তি ও করিনা-র আতিথেয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবেই! আসলে ভালবাসতে শেখায় এই ইচ্ছেগাঁও৷

এক বুক ভালবাসা নিয়ে এই হরিৎক্ষেত্র অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। এবার আপনি শুধু একটু সময় বের করতে পারলেই হয়!

কীভাবে যাবেন:
আগে কলকাতায় যেতে হবে। কলকাতা থেকে এনজেপিগামী যে কোনও ট্রেন, সেখান থেকে গাড়িতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার রাস্তা মানখিম (আড়িতার লেকের ঠিক ওপরে)৷ ওখান থেকে গাড়িতে রামধুরা গ্রাম ৪৫ কিমি৷ সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা৷ আর রামধুরা থেকে ইচ্ছেগাঁও মাত্র ৬ কিমি৷ লাগবে ৩০ মিনিট৷

কখন যাবেন:
জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস ভরা বর্ষা৷ এই সময়টা বাদ দিয়ে সারা বছরই যাওয়া যেতে পারে৷ সেরা সময় ডিসেম্বর (যদিও খুব ঠান্ডা হবে) থেকে এপ্রিল মাস৷

কী খাবেন:
নুডলস, থুকপা, মোমো, পাহাড়ি দুধ ও ঘি৷

কোথায় থাকবেন:
হেভেন্স ভ্যালি হোম স্টে (মানখিম), সত্যম হোম স্টে (রামধুরা গ্রাম) মেরিগোল্ড হোম স্টে ও নির্মলা হোম স্টে (ইচ্ছেগাঁও)