মেইন ম্যেনু

পিরিয়ড নিয়ে যা লিখলেন ঢাবি ছাত্রী

আচ্ছা মাথা ব্যাথা আর পিরিয়ড দুইটা বিষয়ের মধ্যে কোনটা স্বাভাবিক? অবশ্যই পিরিয়ড। তাহলে যেটা অতি স্বাভাবিক সেটা কেন লজ্জার হবে?

আমার তো মনে হয় একটা মেয়ের জীবনে সবচেয়ে সম্মান জনক ঘটনা হচ্ছে প্রথমবার “মা” হওয়া। আর পিরিয়ড হচ্ছে মা হওয়ার ক্ষমতা লাভ করা । তাহলে এটা কেন লজ্জার হবে? আর ভাইয়া কিংবা বন্ধুগণ, যখন বুঝতেই পারছেন যে মেয়েটা কেন সহজ হতে পারছে না তখন কেন শুধু শুধু তাকে খোচাচ্ছেন বলুন তো? আপনিও জানেন সমস্যাটা কোথায়, সেও জানে। আপনি শুধু জানেন না যে কি পরিমান যন্ত্রণা একটা মেয়েকে সহ্য করতে হয় পিরিয়ড চলাকালীন আর মেয়েটা জানেনা যে তার এই লুকোচুরিই যত কমপ্লেক্সের মূল।

আপনি যদি বুঝতেন একটা মেয়ে পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে কতটা কষ্ট ভোগ করে তাহলে আপনার মুখ দিয়ে আর কথা বের হত না। আর এটা বোঝার জন্য শুধু বিবেক থাকা লাগে বোধ বুদ্ধি না।

আমার কোন এক সুশিক্ষিত আধুনিক বড় ভাই একদিন বলেছিল যে “হযরত হাওয়া গন্ধব ফল খেয়ে যে পাপ করেছিল তার শাস্তিই হচ্ছে পিরিয়ড যা পুরো নারীসমাজ কে ভোগ করতে হচ্ছে”

আমার তাকে ছাগলে তৃতীয় বাচ্ছা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নি। সে জানেনা মাতৃগর্ভে তার ভ্রুন টা মাংশপিন্ডে পরিণত হয় পিরিয়ডের জন্যেই।

পিরিয়ড চলাকালীনসময়ে একটা মেয়ে পুরো দুনিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। হয়ত তাকে বাইরের দুনিয়ায় আসা লাগে কিন্তু তার মন দুনিয়ার বাইরেই থাকে। মনের উপর শরীরের উপর প্রচন্ড রকমের একটা চাপ তৈরী হয়, মেজাজ প্রচন্ড রকমের খিটখীটে হয়ে যায়। ঐ সময় আপনার ভাল ভাল কথাও তার কাছে অসহ্য লাগে। এটা তো গেল মানসিক অবস্থা, শারিরীক অবস্থা টা আরো খারাপ।

কারো কারো পেট সহ সারা শরীরে প্রচন্ড রকমের ব্যাথা হয়। আমার একজন রুমমেট আছে যে তার প্রতি পিরিয়ডেই অসহ্য পেটে ব্যাথায় চিৎকার করে কাঁদে। আপনি ভাবতে পারেন একটা মেয়ে কতটুকু যন্ত্রণা পেলে চিৎকার করে কাঁদতে পারে?

ক্লাস এইটের শেষের দিকে আমার প্রথম পিরিয়ড হয়। ওই সময় আমি প্রচন্ড রকমের চঞ্চল ছিলাম। আম্মুর কাছে প্রতিদিন বকা শুনতাম বাইরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য, খেলাধুলা করার জন্য। আমার স্পষ্ট মনে আছে সাতটা দিন আমি ঘরের বাইরে আসি নি। আমাকে আসতে দেওয়া হয় নি। আমি বাড়ির বাইরে বলছি না। বলছি ঘরের বাইরে। এমন কি বারান্দাতেও না।

ছেলে মানুষ তো দূরের কথা, আমাকে আমার আপন ভাই, আমার বাবার কাছেও আসতে দেয়া হয় নি। বলাবাহুল্য যে আমার পরিবার যথেষ্ট আধুনিক এবং শিক্ষিত। কিন্তু তারপরেও আমাকে এগুলো মানতে হয়েছে কারণ আমার নানী দাদীর বক্তব্য অগ্রাহ্য করার সাধ্য আমার মায়ের ছিল না।

আমার ডানা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য এই সাতদিন যথেষ্ট ছিল। এরপর আমি আর কোনদিন উড়তে পারিনি, ওড়ার ইচ্ছেটাও হয় নি।

আমার মনে আছে । এই সাতদিনের পর আমি আর কখনো মাঠে খেলতে যায় নি। আমি সারাদিন ঘরের ভিতর বসে কাঁদতাম। আম্মু যখন খাবার দিতে আসত তখন প্রথম দুদিন খুব চিল্লাপাল্লা করেছিলাম। যখন দেখালাম আমার চিল্লাপাল্লায় কিছু আসবে যাবে না তখন মেনে নিয়েছিলাম।

এই ব্যাপারটায় আমাদের এত সংকোচ কেন জানেন? কারন সেই বাচ্চা বয়সে আমাদের মায়েরা , গুরুজনেরা আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে এটা একটা নিষিদ্ধ ব্যাপার। এটা কোনো ছেলের সাথে আলোচনা করা অশোভন। আচ্ছা যেটা অবসম্ভাভী এবং স্বাভাবিক সেটা অশোভন কেন হবে বলুন তো?

বন্ধুর “কি হইছে তোর” প্রশ্নের জবাবে আমি যদি সরাসরি বলতে পারতাম যে “দোস্ত, “i am having my period” তাহলে আমার বন্ধুটি আমাকে বিব্রত করার সুযোগ পেত না। কিন্তু একটা সত্যি ঢাকতে আমি যখন মিথ্যে বলছি তখনই সমস্যাটার উৎপত্তি।

আপনার পাশের মেয়েটা যে হতে পারে আপনার প্রেমিকা, বোন, বন্ধু বা সহকর্মী। তার উপর সহানুভূতিশীল হন। যখন আপনার প্রেমিকা আপনার উপর অকারণ রাগ করছে তখন উলটা রাগ না দেখিয়ে তাকে সময় দিন। আপনার বোনটা যখন মুখ গোমড়া করে ঘরে দরজা দিয়ে বসে থাকে তার মানে এই না যে সে প্রেমে পড়ছে বা something like that , তাকে সময় দিন।

যতই আধুনিকতার বুলি কপচায় কোন ছেলের সাথে খোলাখুলি পিরিয়ড নিয়ে আলোচনা করব এখনো এত আধুনিক হই নাই। এটা আমাদেরই দোষ। আপনার একটু সহানুভূতি আমাদের এই জটিল সময়টা কে সহজ করে দিতে পারে।

লেখিকা: রিমানা সেতু (ঢাবি শিক্ষার্থী)