মেইন ম্যেনু

পুলিশের গাড়ি থেকে আসামি ছিনিয়ে নিল ছাত্রলীগ

রাঙামাটি শহরে বিরল এক ঘটনার জন্ম দিলেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল জব্বার সুজন, রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বাপ্পা ও তাঁদের সহযোগীরা।

গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দুই আসামিকে নিয়ে যখন পুলিশ থানায় যাচ্ছিল, তখন পেছন থেকে একটি প্রাইভেটকারে এসে পুলিশের গাড়িতে হামলা করে আসামিদের ছিনিয়ে নেন ছাত্রলীগের ওই নেতাকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জমিরউদ্দিনের ছেলে কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহউদ্দীনের মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই আসামি কলিম ও এরশাদকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের সঙ্গে থাকা আসিফ নামের আরো একজনকে আটক করা হয়। আটক ওই তিনজনকে নিয়ে থানায় যাওয়ার সময় পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ে পুলিশের গাড়ির গতিরোধ করেন সুজন ও বাপ্পা। যে প্রাইভেটকারটিতে করে পুলিশের গাড়ি আটক করা হয়, সেটির নম্বর চট্ট মেট্রো-গ-১২০২২৯।

পুলিশের গাড়ির গতিরোধ করে প্রাইভেটকার থেকে নেমে আসেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বাপ্পা ও জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল জব্বার সুজন। তাঁরা পুলিশকে গালাগাল করতে থাকেন এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফোন করে ঘটনাস্থলে আসতে বলেন। একই সঙ্গে আরো কিছু ছাত্রলীগ কর্মীকে ফোনে ডেকে এনে জড়ো করেন ওই দুজন। পরে পুলিশের পিকআপভ্যান থেকে তিন আসামিকে নামিয়ে নিয়ে চলে যান তাঁরা। এ সময় পিকআপে থাকা পুলিশ ও উপপরিদর্শক (এসআই) প্রিয়তোষ নির্বাক হয়ে পড়েন এবং কোনো বাধাই দেননি বলে অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

কোতোয়ালি থানার এসআই প্রিয়তোষ বলেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ওরা আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা নজিরবিহীন। আমরা চাকরি জীবনে এমন ঘটনা কমই দেখেছি।’

আসামি ছিনতাইয়ের পরপরই ঘটনাস্থলে যায় পুলিশের আরো কয়েকটি পুলিশভ্যান। এ সময় সেখানে ছিলেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. শহীদুল্লাহ, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) চিত্তরঞ্জন পাল, ওসি মুহম্মদ রশিদ। এ সময় ঘটনাস্থলে আসা পৌর আওয়ামী লীগের নেতা নাসিরের সহায়তায় ছাত্রলীগ নেতাদের ঘটনাস্থলে ডেকে আনে পুলিশ।

তবে ঘটনাস্থলে গিয়েও সুজন, বাপ্পা, মামুন, মিজান পুলিশের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় বক্তব্য দিতে থাকেন। পুলিশ বারবার আসামিদের ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তাতে কোনো পাত্তাই দেননি তাঁরা। পরে ‘হতাশ’, ‘ক্ষুব্ধ’ হয়ে ফিরে যান পুলিশ কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘এ ঘটনা নজিরবিহীন। এটা পুলিশের মর্যাদার প্রশ্ন। এভাবে আসামি ছিনিয়ে নিয়ে তারা যে অপরাধ করেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা কোনো অনুরোধই শোনেনি। এখন আমরা আইনগত পদক্ষেপ নেব।’

পুলিশ সুপার (এসপি) সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, সরকারি কাজে বাধাদান এবং গাড়ি থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া অনেক বড় অপরাধ। এর সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

ঘটনাস্থলে ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুল জব্বার সুজন চিৎকার করে পুলিশকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর ভঙ্গি ও ভাষায় বক্তব্য দিতে থাকেন। আসামিদের তাঁরা ছিনিয়ে নেননি, বরং পুলিশই গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করতে থাকেন তিনি।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জমীরউদ্দিন বলেন, ‘আমার এবং আমার এক প্রতিবেশী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার দুটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় ২৬ এপ্রিল আমরা মামলা করেছি থানায়। পুলিশ তদন্ত করে সন্দেহভাজন হিসেবে ওদের আটক করেছে। এখন ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি পুলিশের গাড়ি থেকে আসামি ছিনিয়ে নেয়, এটা দুঃখজনক, নজিরবিহীন এবং লজ্জাজনক। ছাত্রলীগের নামে কেউ এমন অপকর্ম করলে এ দায় আওয়ামী লীগ নেবে না।’

জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমাদের কেউ যদি আটক হয় এবং সে যদি নিরপরাধ হয়, সেটা আমরা আইনগতভাবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারতাম। কিন্তু পুলিশের গাড়িতে হামলা করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া আমাদের জন্যই লজ্জার। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, সুজন বা বাপ্পা মানেই ছাত্রলীগ নয়, এটা ওদের ব্যক্তিগত বিষয়। এর সঙ্গে কোনোভাবেই ছাত্রলীগকে জড়ানো যাবে না।’

ক্ষুব্ধ-হতাশ-স্তব্ধ পুলিশ

গাড়ি থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার আকস্মিকতায় যেন নির্বাক হয়ে পড়ে পুরো পুলিশ বিভাগ। ঘটনার পর সেখানে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও কেউ কারো সঙ্গেই কথা বলছিলেন না। সবার চোখে-মুখেই ক্ষোভ, হতাশার চিহ্ন ছিল স্পষ্ট। বেশ কয়েকজন কনস্টেবল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন। তাঁরা সিনিয়র কর্মকর্তাদের কাছে পিটুনির অনুমতি চাইছিলেন। স্তব্ধ হয়ে পড়েন উপস্থিত বেশ কয়েকজন এসআই এবং ডিবি-এসবির কর্মীরা। তাঁরা বিষয়টি পুরো পুলিশ বিভাগের জন্যই ‘অপমানকর’ এবং ‘অবমাননাকর’ বলেও মন্তব্য করছিলেন। কেউ কেউ পুলিশের অসহায়ত্বের কথাও বলছিলেন। পুলিশের গাড়িতে হামলা, আসামি ছিনতাই, পুলিশকে গালাগালির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তাঁরা।

সর্বশেষ

এদিকে, রাত ১২টার দিকে ছিনিয়ে নেওয়া দুই আসামি কলিম ও এরশাদকে আবারও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। রাতে বারবার অনুরোধেও আসামি ফিরিয়ে না দেওয়ার পরও এ নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ এবং বেশ কিছু সাংবাদিক উপস্থিত হন। পুরো ঘটনা মুহূর্তেই শহরে ছড়িয়ে পড়লে এবং পুলিশ অফিসার ও কনস্টেবলরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন টের পেয়ে তৎপর হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তাঁরা ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামাল উদ্দীনকে পাঠালে রাত আনুমানিক ১২টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে ছিনিয়ে নেওয়া আসামিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহম্মদ রশীদ আসামি ফেরত দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে কোনো শর্ত সাপেক্ষে ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না, তা স্বীকার করেননি তিনি। আটক দুজনই থানাহাজতে আছে বলেও জানান তিনি।