মেইন ম্যেনু

পে স্কেল নিয়ে আন্দোলন করে কার কি লাভ হল?

বাঙালি একের ভাল অপরে দেখতে পারে না। একে অপরকে ল্যাঙ মারা বা অন্যের ভাল দেখতে না পারার ব্যাপারে অনেক কৌতুক রয়েছে। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে আড্ডা হচ্ছে। আলোচনার বিষয়: অপর প্রতিবেশীর ছেলে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাল ফলাফল নিয়ে পাস করে চাকুরী পেয়েছে।

গল্পের নমুনা এমন: আরে তার ছেলে চাকরি পেয়েছে তো কি হয়েছে? বেতন পাবে না, দেখবেন। বললেন অপরজন। যিনি তথ্যটি দিয়েছেন, তিনি বললেন আরে না ভাই। চাকুরীও হয়েছে, বেতনও পাচ্ছে।

শুনে আগের প্রতিবেশী বললেন, ও তাই নাকি? তাহলে নির্ঘাত কম বেতন দিচ্ছে। নিজেই চলতে পারবেনা, বিয়ে-শাদী করে বৌ-বাচ্চাকে কি খাওয়াবে?

শুনে প্রথম ভদ্রলোক বললেন, না ভাই। ছেলেটা চাকরিও পেয়েছে, বৌ-বাচ্চা নিয়ে সুখে আছে।

এবার সেই ভদ্রলোক বললেন, তাই না কি? বিয়ে করেছে? তাহলে দেখবেন তাঁর বৌ-বাচ্চাও বেশী দিন টিকবে না।

এই হল বাঙালি চরিত্র। আড্ডায় বিষয়ের অভাব নেই। অপরের দোষ-ত্রুটি বা অমঙ্গল কামনারও শেষ নেই। বাংলা ভাষায় একাধিক প্রবাদ-প্রবচনও আছে এ বিষয় নিয়ে। ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ’ করাতে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। একই ধরণের আরেকটি প্রবাদ আছে: ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা’। অন্য কোন ভাষায় বা অন্য কোন জাতির জাতীয় চরিত্রে এ বিষয়টি এমন স্পষ্ট আছে কি না সন্দেহ রয়েছে।

সরকার ঘোষিত ৮ম জাতীয় বেতন-স্কেল নিয়ে গত কিছুদিন ধরেই চলছে নানা মুনির নানা মত। ২৬ ক্যাডার সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারিবৃন্দ, কলেজের শিক্ষকগণ, এবং সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সবাই আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। যেহেতু এই বাংলার মাটিতে আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া কোনও কিছু সরকারের কাছ থেকে আদায় করা যায় না, সেহেতু ডাক্তার, আইনজীবি, শিক্ষক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিডিআর, আনসার-ভিডিপি সবাই বেতন সম্মান রক্ষা বা বাড়ানোর আন্দোলনে নেমেছেন। সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন সরকারকে যে সুপারিশ দিয়েছিল সে সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে এন্ট্রি বেতনের মধ্যে একটি স্কেল তারতম্য রাখার সুপারিশ করে। এ সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের চাকরিতে প্রবেশের সময় ৮ম স্কেলে নির্ধারণ করে। অপরদিকে নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর অন্যান্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য ৯ম স্কেল নির্ধারণ করা হয়।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে এখন সর্ব মোট ২৯টি ক্যাডার রয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ শিল্প গবেষণাগার, আনবিক শক্তি কমিশনসহ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণীর নন-ক্যাডার কর্মকর্তাগণ রয়েছেন।

৮ম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার আগে ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তাগণ ৯ম গ্রেডে চাকরিতে প্রবেশ করতেন। কিন্তু নতুন বেতন স্কেলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের ৮ম গ্রেডে উন্নতি ও নন-ক্যাডারদের ৯ম গ্রেডে বহাল রাখা হয়। সরকারের এই আদেশ জারী হওয়ার পর থেকে এ ব্যবস্থা বাতিলের দাবীতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাগণ আন্দোলনে নামেন। এ আন্দোলনে প্রশাসন, পুলিশ, ও পররাষ্ট্র ক্যাডার ছাড়া চলমান ২৬ ক্যাডার সমন্বয় পরিষদও যোগ দেয়। যদিও ক্যাডার কর্মকর্তাদের এন্ট্রি লেভেল ৮ম গ্রেডে করা হয়েছিল। চলমান দাবীর প্রেক্ষিতে সরকার ১০ মার্চ, ২০১৬ তারিখে ঘোষণা দিয়েছে ক্যাডার কর্মকর্তাদের ৮ম গ্রেডে প্রবেশের

অংশটুকু বাতিল করে আগের মত ৯ম গ্রেডে নন-ক্যাডারদের মত প্রবেশ করতে হবে।

সরকারের এ সিদ্ধান্তে এখন ২৬ ক্যাডারের ডাক্তারসহ কয়েকটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা আত্নসমালোচনা করে বলছেন যে এ আন্দোলনের ফলে নন-ক্যাডাররা সুবিধা পেল, কিন্তু তাঁরা কিছুই পাননি। এ নিয়ে প্রশাসন বিরোধী চলমান ২৬ ক্যাডার আন্দোলনের ফেসবুক মুখপাত্র ‘ক্যাডার ইক্যুয়িটি মিরর’ বা ‘ক্যাডার সমতা দর্পণ’ এ অনেক আন্দোলনকারী প্রকৃচি কর্মী নেতাদের ভূমিকা ও তাঁদের প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

একজন নবীন বিসিএস ডাক্তার ‘ক্যাডার সমতা দর্পণ’ নামের ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, “আমার উপজেলায় আন্দোলনে আমি যথেষ্ট সক্রিয় ছিলাম, কিন্তু দিনশেষে বুঝতে পারলাম যে, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছি। সব দোষ খালি এডমিন ক্যাডারকে দিয়ে লাভ নেই। অন্য অনেক ক্যাডারেই দেখি মাস চলতে বেতন লাগে না। ৫ বছর চাকরি করে কোন ইউএনওকে ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমি কিনতে দেখি নাই, অন্য ক্যাডারকে দেখেছি। তাই তারা বেতন বৃদ্ধি চাই না বলার দুঃসাহস দেখাতে পারেন। আমি নবীন চিকিৎসক, বাড়তি ইনকাম নাই, বেতন কমলে আমার ক্ষতি হবে এটাই ফ্যাক্ট। যার কিছু আসে যাবে না তার কোন ক্ষতি নাই।”

আরেকজন লিখেছেন, “হা হা হা…… আন্দোলন সফল হল। অবশ্য ক্যাডারের (আমাদের) লোকেরাই দাবি করেছিল ক্যাডার-নন, ক্যাডার সমতার জন্য।” তাঁর এ স্ট্যাটাসে আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “গ্রেড অবনমনের খবরটি মূলত প্রকৃচি’র আন্দোলনের ফসল। খুব তাজ্জব হতে হয় যখন দেখি ক্যাডারদের পে স্কেল আন্দোলনের মধ্যে নন-ক্যাডারদের গ্রেড অবনমনের দাবিটি প্রথম দিকে রাখা হয়।” আরেকজন হতাশ হয়ে লিখেছেন, “এ বিশাল অর্জনে আসুন ঢাকায় সমাবেশ করি।”

একজন লিখেছেন, “পে-স্কেলকে লক্ষ্যবস্তু করে দুর্বার আন্দোলনের সুবাদে সরকার আমাদের বেতন কমাতে এবং গ্রেড অবনমনে বাধ্য হয়েছে। চলেন আন্দোলনের বিজয়ে সবাই মিষ্টিমুখ করি। গুরুতর সমস্যা ছিল অন্য অনেক কিছুই, কিন্তু অনেকেই লাগলেন পে-স্কেলের পেছনেই। এবার কেমন হলো? আমাদের সমস্যা হলো আমরা বড় বেশি অদূরদর্শী। ৯ম গ্রেডে পুনঃস্বাগতম।” এই স্ট্যাটাসের জবাবে আরেকজন কমেন্ট করেছেন “ঠিকই বলছিস। সরকার পে-স্কেল দিয়া নাকি সব সম্মান কেড়ে নিয়েছিলো। লও এইবার, সব সম্মান আবার ভরে দিয়েছে……ঝুলিতে…।”

একজন ‘ক্যাডার সমতা দর্পণ’-এ লিখেছেন, “অবশেষে cadre non-cadre দের বৈষম্য এর অবসান ঘটিল। কারণ ইহাই ছিল আন্দলন এর মুল উদ্দেশ্য। চলেন আমরা মিস্টি বিতরণ করি। cadreরা আসলে কত উদার non-cadreদের জন্য তারা নিচে নেমে এল। প্রয়োজনে আর নিচে নামা হবে। এখন দাবি একটাই non-cadreদের উপরের গ্রেড দিতে হবে। cadre ভাইরা আসেন আমরা আন্দোলন এ ঝাঁপিয়ে পরি।”

সবচেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে একজন স্ট্যাটাস দিয়েছেন, “প্রকৃচি, ২৬ ক্যাডার, নন-ক্যাডার আন্দোলনের দৃশ্যমান সফলতা একটাই তা হল ক্যাডার কর্মকর্তাদের জুতাপেটা করা অর্থাৎ ক্যাডার কর্মকর্তাদের ৮ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে নামিয়ে আনা, যেখানে দুটো পদের (ক্যাডার, নন-ক্যাডার) নাম আলাদা, জন্ম আলাদা, নিয়োগ পদ্ধতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতায় রয়েছে বিশাল ব্যবধান, সেখানে দুজনের গ্রেড কিভাবে এক হয় আমার বুঝে আসে না, বিশ্বের কোথাও এত উদার আছে কিনা যারা নিজেদের দিগম্বর করে মান-সম্মান, ইজ্জত এভাবে বিকিয়ে দেয়???? নন-ক্যাডারা আন্দোলন করে ৮ম গ্রেডে আসতে পারল না???? আমাদেরকে টেনে নামানো কি তাদের ফরয ছিল? যদি নন-ক্যাডারা এতটাই যোগ্য হয়, ক্যাডারা যেভাবে সুযোগ-সুবিধা পায় সে রকম তাদের ও পাওয়ার খায়েশ হয় তাহলে তারা ক্যাডার হয় নাই কেন????”

কার্যত প্রশাসন বিরোধী ২৬ ক্যাডারের বেতন-বৈষম্য দূরীকরণ সম্পর্কিত আন্দোলন মাঠে মারা গেছে। ২৬ ক্যাডারের আন্দোলনে শরীক হওয়া অনেক নবীন কর্মকর্তা এই আন্দোলনের ফলে নিজেদের সম্মানহানী হয়েছে মর্মে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অনেকে এই ব্যর্থতার জন্য প্রকৃচি’র কয়েকজন নেতাকে দায়ী করছেন। নবীন ডাক্তারদের আন্দোলনে নামিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশান (বিএমএ) এর কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে খুলনা বিএমএ’র মহাসচিব ডা: বাহারুল আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে আন্দোলনের অযুহাতে তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাগানোর চেষ্টা করেছেন। একই রকমভাবে প্রকৌশলীদের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা আইইবি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য আন্দোলনকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অপরদিকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠনও এ আন্দোলন থেকে কিছু পায়নি বলে পিছিয়ে এসেছে।



« (পূর্বের সংবাদ)