মেইন ম্যেনু

প্রতিবন্ধীদের স্বপ্নের সঙ্গী কাজিপুরবাসীর স্বপন

জাহিদুল হাসান। ডাকনাম স্বপন। নামের সঙ্গে তাঁর কাজেরও মিল অনেক। সিরাজগঞ্জের নাটুয়ারপাড়া চরের প্রতিবন্ধী মানুষের স্বপ্ন সত্যি করার জন্য তিনি লড়াই করছেন প্রায় চার বছর ধরে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায় ও সচেতনতার জন্য এলাকার সবার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠা এই তরুণ এবং সেখানকার প্রতিবন্ধীদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এবারের মূল রচনা।

জন্ম থেকেই দুটি পা বাঁকা; সেই বাঁকা পা নিয়ে হাতের ওপর ভর করে চলাচল করেন আয়নাছা খাতুন। চলাফেরার গণ্ডিটা নিজের বাড়ির সীমানাতেই আবদ্ধ। বাড়ির খুব কাছে যমুনা নদী। নদীর কোল ঘেঁষে নাটুয়ারপাড়া চর। সেই চরেই বাস প্রতিবন্ধী আয়নাছা ও তাঁর পরিবারের। প্রতিবন্ধী বলে আলাদা করে কোনো সহযোগিতা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি কখনো। উপজেলা সদর থেকে দু-তিন ঘণ্টার নৌকাযাত্রা শেষে কে যাবে আয়নাছা খাতুনের কাছে সহযোগিতা নিয়ে!

তবে একদিন ঠিকই আয়নাছার খোঁজ নিতে যান এক অপরিচিত তরুণ। কেমন করে দিন কাটে, শরীর ভালো কি না, কী করলে মোটামুটি ভালো থাকবেন—এসবই জানতে চান ওই তরুণ। তাঁর কাছে স্বপ্নের হুইলচেয়ারের কথা বলেন আয়নাছা। এটুকু হলেই তিনি খুশি। আয়নাছার হয়ে নদী পাড়ি দিয়ে উপজেলা শহরে যান তরুণ। ধরনা দেন সরকারি সমাজসেবা অফিসে। কথা বলেন বড়কর্তাদের সঙ্গে। চরের প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধি হয়ে তাঁদের শোনান আয়নাছার মতো অনেকেরই গল্প। তাঁর জন্য সত্যি সত্যি একদিন একটা স্বপ্নের হুইলচেয়ারও জোগাড় হয়ে যায়! সরকারি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে সেই তরুণ হুইলচেয়ার তুলে দেন আয়নাছার হাতে। সঙ্গে নিয়মিত ভাতা পাওয়ার একটা কার্ড। সেদিন আয়নাছা কোনো কথা বলতে পারেননি। হুইলচেয়ারে বসিয়ে দেওয়ার পর চোখ দিয়ে শুধু পানি গড়িয়ে পড়ছিল। পা অকেজো, চোখ তো অকেজো নয়!

চার বছর আগের ওই কথাগুলো মনে করে আবার চোখ মোছেন নাটুয়ারপাড়া চরের আয়নাছা, ‘আমার জন্য কেউ এত কষ্ট কইরা শহর থাইক্যা চিয়ার আনব, কুনু দিন ভাবিনি।’ তিনি যখন কথা বলছিলেন, পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই ‘তরুণ’। নাম তাঁর স্বপন। পুরো নাম জাহিদুল হাসান, চরের অনেক প্রতিবন্ধী মানুষের ভালো থাকার স্বপ্নগুলোর জন্য যিনি যুদ্ধ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।

স্বপনের স্বপ্ন
স্বপনরা তিন ভাই, ছয় বোন। এর মধ্যে এক ভাই ও এক বোন প্রতিবন্ধী। শুধু স্বপনদের পরিবারে নয়, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া চরে বেশির ভাগ পরিবারেই প্রতিবন্ধীর খোঁজ মেলে! অভাবের কারণে অনেক পরিবারের কাছেই প্রতিবন্ধী সদস্য যেন বোঝা। ছোটবেলা থেকে স্বপন সেই কষ্ট উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে। তাই তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জীবনে প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু একটা করবেন। সাধ আর ইচ্ছার সঙ্গে সামর্থ্যও থাকতে হয়। স্বপনদের সেটা নেই। একসময় বাবা ফজলুল হক ৫০ বিঘা জমি চাষ করতেন। এখন যমুনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সবেধন নীলমণি হয়ে টিকে আছে বিঘা দশেক জমি। কিন্তু ইচ্ছার কাছে সবকিছুই হার মানে। প্রতিবন্ধীদের জন্য স্বপনের বিষয় হয় ‘সহযোগিতা’। শুরুতে চরের প্রতিবন্ধীদের নাম তালিকাভুক্তি করা, সেগুলো নিয়ে উপজেলা শহরে দৌড়াদৌড়ি। প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার ব্যবস্থা করা, তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করাসহ নানান বিষয় হয়ে যায় স্বপনের প্রতিদিনের রুটিন। সেই সঙ্গে শীতকালে শীতবস্ত্র, ঈদ কিংবা অন্য কোনো উৎসবে আর্থিক সহযোগিতা তো আছেই। মূল কথা, একজন প্রতিবন্ধীর মুখে হাসি ফোটানোতেই স্বপনের শান্তি। প্রায় চার বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। স্বপনের এই দাতব্য কাজের আর্থিক উৎস সমাজকল্যাণ অফিস ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা।

ফেব্রুয়ারি মাসে স্বপনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল যমুনা নদীর পারে বসে। চরের বালুর মতোই চিকচিক করছিল তাঁর চোখ, ‘প্রতিবন্ধীরা কিন্তু সমাজের বোঝা নয়। তাদের যদি আপনি সহযোগিতা করেন, তাহলে সম্পদ হয়ে উঠবেই।’ নিজের কাজ নিয়ে মানুষের ‘বলাবলি’ সম্পর্কে বলতে বলতে হাসেন তিনি, ‘প্রতিবন্ধীদের সহযোগিতা করি বলে অনেকেই আমাকে পাগল বলে। আমি কিন্তু দমে যাইনি। আমার টাকাপয়সা নেই, কিন্তু ওদের হয়ে সহযোগিতা আদায় করে নেওয়ার সামর্থ্য আছে। সেটাই চার বছর ধরে করে আসছি।’

নাটুয়ারপাড়া চরে ছয়টি ইউনিয়ন। তেকানী, মনসুরনগর, চরগিরিশ, খাসরাজবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর ও নাটুয়ারপাড়া। প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা কম নয়। প্রায় সবার কাছেই স্বপন আপনজন। কারও বাড়ির দরজায় তাঁর পা রাখা মানে তাঁদের জন্য সুখবর। আর কিছু না হোক হাসিমুখে কথা বলার একজন মানুষ তো পান প্রতিবন্ধীরা!

স্বপন–কথা
২০১১ সালে এইচএসসি পাস করেছেন স্বপন। তারপর আর পড়াশোনা এগোয়নি। গৃহশিক্ষকতা করেছেন একসময়। সেই টাকা এনে ব্যয় করেছেন প্রতিবন্ধীদের জন্য। বাবা এবং ঢাকায় কর্মরত ভাইয়ের কাছ থেকেও নেন সহযোগিতা। স্বপন বললেন, ‘আমার ইচ্ছা চরের সব প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম বানানোর। যাতে তাঁরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন। এ জন্য যত দিন লাগে, আমি চেষ্টা করে যাব।’ সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি